উচ্চ লবণাক্ততাসহিষ্ণু ও পুষ্টিসমৃদ্ধ গমের নতুন জাত উদ্ভাবন

জিএইউ-১ নামে গমের নতুন একটি জাত উদ্ভাবন করেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি)।

জিএইউ-১ নামে গমের নতুন একটি জাত উদ্ভাবন করেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি)। উচ্চ লবণাক্ততা সহনশীলতার দিক থেকে দেশে এটিই প্রথম উদ্ভাবন বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ১২ ডিএস পর্যন্ত লবণাক্ততা সহনশীল এ জাতের গম। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জন্য অধিক কার্যকরী প্রিমিয়াম কোয়ালিটির নতুন জাতটি উচ্চ ফলনশীল ও অধিক প্রোটিনসমৃদ্ধ। নতুন জাতটি উদ্ভাবনের মাধ্যমে গাকৃবির মোট উদ্ভাবিত ফসলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯১।

বিশ্বদ্যিালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন, গাকৃবির গবেষণা মাঠে দীর্ঘদিন গবেষণা ও ফলন পরীক্ষার পর ২০২১-২৩ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কৃষকের মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে লবণসহিষ্ণু ও উচ্চ ফলনশীল হিসেবে প্রমাণিত হয়। পরে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ছয়টি স্থানে মাঠ মূল্যায়নে প্রস্তাবিত ফলন পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া যায়। জাতীয় বীজ বোর্ড ১৭ জুন জিএইউ-১ জাতের গমের ছাড়পত্র দেয়। এ গমে বিদ্যমান অধিক প্রোটিন শরীর গঠন ও মেরামত, শক্তি সরবরাহ, ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারিতা বাড়িয়ে রোগ প্রতিরোধে অধিক সহায়তা করে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্লুটেনিন থাকায় এটি উচ্চ প্রোটিন ও লো ফ্যাট হওয়ায় সহজে শরীরে শোষিত হতে পারে। ডিইউএসের ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যসংবলিত ল্যাব টেস্টে প্রমাণিত হয় যে এটি সাধারণ গম থেকে ভিন্ন গুণসম্পন্ন। জিএইউ-১-এর দানা তামাটে, চকচকে ও তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যে পরিপক্ব হয়। আমন মৌসুমে ধান কাটার পর বীজ বপন করলে ৯৫-১০০ দিনে ফলন পাওয়া যায়। গাছের আকার বড়, কাণ্ড মোটা ও গুটির সংখ্যা বেশি হওয়ায় এটি থেকে অধিক পরিমাণ খড় পাওয়া যায়। গবাদি পশুর খাদ্য চাহিদা পূরণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গবেষণার তথ্য বলছে, উৎকৃষ্ট মানের এ জাতের গম স্বাভাবিক মাটিতে প্রতি হেক্টরে ৪ দশমিক ৫ টন উৎপাদন হয়। লবণাক্ত মাটিতে ৩ দশমিক ৭৫ টন ফলন পাওয়া সম্ভব। উন্নত এ ইনব্রেড জাতটি বিভিন্ন রোগ যেমন ব্লাস্ট, রস্ট ইত্যাদির প্রতিরোধক সম্পন্ন হওয়ায় সাধারণ জাতের তুলনায় গড়ে ১০-১৫ শতাংশ বেশি ফলন দিতে সক্ষম, যা বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে এর উপযোগিতা অনেক। আবার এটি লবণ সহনশীল হওয়ায় মানব শরীরে সোডিয়াম ক্লোরাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে কার্যকরভাবে পানি ও পুষ্টি শোষণ করতে পারে। এছাড়া জলবায়ু সহনশীলতা ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা থাকায় এটি দেশের বৈচিত্র্যময় পরিবেশে চাষের জন্য উপযোগী ও লাভজনক।

প্রফেসর ড. এম ময়নুল হক ও প্রফেসর ড. মো. মসিউল ইসলামের নেতৃত্বে নতুন জাতটি উদ্ভাবিত হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে প্রফেসর মসিউল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন,”‘জিএইউ-১ উদ্ভাবন আমাদের দীর্ঘদিনের গবেষণার ফল। দেশের উপকূলীয় অঞ্চল ও লবণাক্ত এলাকায় ফসল উৎপাদনের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যেই আমরা গমের জাতটি উদ্ভাবনে কাজ শুরু করেছি। জাতটি লবণাক্ত পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে এবং তুলনামূলক অধিক ফলন দেয়, যা কৃষকের জন্য যেমন লাভজনক, তেমনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’

ড. মসিউল বলেন, ‘জিএইউ-১ দ্রুত মাঠ পর্যায়ে বিস্তার লাভ করবে এবং দেশের বিভিন্ন লবণাক্ত অঞ্চলে গম চাষে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করছি। আমরা এ অর্জনকে কৃষকের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দেখছি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অর্জনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে উপাচার্য প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নতুন জিএইউ গমের এ জাত উদ্ভাবন শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয় বরং বাংলাদেশের কৃষি খাতে একটি বড় অর্জন। উপকূলীয় অঞ্চল ও লবণাক্ত মাটিযুক্ত এলাকায় কৃষি উৎপাদন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের গবেষকরা নিরলস পরিশ্রম করে এমন একটি জাত উদ্ভাবন করেছেন, যা লবণাক্ত পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে এবং অধিক ফলন দিতে সক্ষম।’

আরও