চলতি অর্থবছরের ১০ মাস

এফডিআই নিট প্রবাহ কমেছে ২৮.৭ শতাংশ, মূলধনি যন্ত্রের আমদানি হ্রাস ২৫.৫৬%

চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস, জুলাই থেকে এপ্রিল সময়কালে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) নিট প্রবাহ কমেছে ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস, জুলাই থেকে এপ্রিল সময়কালে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) নিট প্রবাহ কমেছে ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রের আমদানি কমেছে ২৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস জুলাই থেকে এপ্রিলে এফডিআইয়ের নিট প্রবাহ ছিল ৯১ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল ১২৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এ হিসাবে চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে এফডিআইয়ের নিট প্রবাহ কমেছে ২৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উইকলি সিলেকটেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস জুলাই থেকে এপ্রিলে মূলধনি যন্ত্র আমদানির লক্ষ্যে খোলা ঋণপত্রের অর্থমূল্য ছিল ১৪১ কোটি ৯১ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে খোলা ঋণপত্রের অর্থমূল্য ছিল ১৯৫ কোটি ৬২ লাখ ডলার। অর্থাৎ মূলধনি যন্ত্র আমদানির লক্ষ্যে ঋণপত্র খোলা কমেছে ২৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মূলধনি যন্ত্র আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি বা আমদানি বাবদ অর্থ পরিশোধ হয়েছে ১৭০ কোটি ৭২ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের (২০২৩-২৪) একই সময়ে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছিল ২১৩ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্র আমদানি কমেছে ২৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

বিদেশী বিনিয়োগের নিম্নমুখিতা নিয়ে সরকারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছিল। ফলে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে এফডিআই নিট প্রবাহে বড় ধরনের পতন ঘটে। এ তিন মাসে বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহে বড় পতনের প্রভাব হিসেবেই ১০ মাসের নেতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে। তবে অক্টোবর থেকেই বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ আগ্রহ প্রকাশ করতে শুরু করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এফডিআই নিট প্রবাহের প্রান্তিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল ১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে তা অনেকটা বেড়ে পৌঁছায় ৪৯ কোটি ৪ লাখ ডলারে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের তুলনায় যা ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমে চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে হয়েছে ২৬ কোটি ৬২ লাখ ডলার।

দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, যেকোনো শিল্প স্থাপনের মূলে থাকে মূলধনি যন্ত্রপাতি। বাংলাদেশের শিল্প খাতের মূলধনি যন্ত্রপাতির বড় অংশই আমদানিনির্ভর। যন্ত্রপাতি আমদানি করে উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। কিন্তু গত ১০ মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমছে। তার মানে দেশে নতুন শিল্প স্থাপন বা কর্মসংস্থান তৈরির পথ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। আর স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা, সক্রিয়তা দেখে কোনো দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আসে। যেহেতু দেশের চলমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, ফলে বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও বিনিয়োগে এগিয়ে না আসা স্বাভাবিক। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও স্থানীয় বিনিয়োগ আগ্রহে ভাটার প্রতিফলন রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি) দেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে বিদেশীরা তখনই বিনিয়োগ করে, যখন স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসেন। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা এখন নানা কারণে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছেন না। আমরা যদি না করি, তাহলে বিদেশীরাও আগ্রহী হবে না।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) গত ২৭ মে এক যৌথ প্রেস বিবৃতির মাধ্যমে নয় মাসে বিডা-বেজা-বেপজায় প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে বলে জানায়। বিবৃতি অনুযায়ী, অক্টোবর ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত মোট ৭৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারের (৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা) নিট বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে। বিগত নয় মাসে বিডা মোট ৭৩৯টি শিল্প প্রকল্প নিবন্ধিত করেছে। এর মধ্যে শতভাগ বিদেশী প্রকল্প রয়েছে ৬৬টি এবং যৌথ বিনিয়োগ রয়েছে ৬১টি।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ১৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জমি ইজারা চুক্তি সম্পাদন করেছে। এর মধ্যে শতভাগ বিদেশী প্রকল্প রয়েছে ছয়টি এবং যৌথ বিনিয়োগ রয়েছে তিনটি। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) মোট ৩১টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইজারা চুক্তি করেছে। সব মিলিয়ে মোট প্রস্তাবিত বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১২ হাজার ২২০ কোটি টাকা)।

বিবৃতিতে বলা হয়, বিডার মূল দায়িত্ব নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দেশী-বিদেশী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থবহ সংযোগ সৃষ্টি করে একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ পাইপলাইন গঠন করা। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২৫-এ নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক সেশনের মাধ্যমে বিটুবি নেটওয়ার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়, যা ব্যবসায়ী চেম্বার, ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের অন্য অংশীদারদের সক্রিয় সহযোগিতায় আয়োজিত হয়।

৬ জুন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিডার ১০ মাসের কার্যক্রম নিয়ে আমলনামা শীর্ষক পোস্ট করেছে সংস্থাটির প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। সেখানে তিনি বলেছেন, আমাদের কাজ মূলত তিনটা এরিয়ায়। ক. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে পলিসি ও এক্সিকিউশনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া। খ. যারা দেশে অলরেডি বিনিয়োগ করেছেন, তাদের কেস বাই কেস ইস্যু সমাধানের মাধ্যমে অ্যাম্বাসেডর তৈরি করা। গ. দেশের ইমেজ ইমপ্রুভ করার পাশাপাশি একটা সলিড ইনভেস্টমেন্ট পাইপলাইন গঠন করা।

পোস্টের শেষাংশে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, ‘আমরা আগেও বলেছি, বিলিয়ন ডলার ইনভেস্টমেন্ট একদিনে আসে না। সামিটে এসে ইমোশনাল হয়ে কেউ হুট করে ১০০ কোটি টাকার চেক লিখে ফেলে না। যারা এ ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেন তারা জানেন। তারপরও সৌভাগ্যক্রমে তিনটি একদম নতুন বিনিয়োগ অলরেডি কনফার্ম করেছে। একটি গার্মেন্টস, একটি এয়ারলাইনসের অ্যামেনিটি কিট ও একটি ঘড়ি ম্যানুফ্যাকচারার। সব মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে ফ্যাক্টরিগুলো চালু হলে। আরো প্রায় ১৫টি প্রজেক্ট আছে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ফাইনাল হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা একটা সলিড পাইপলাইন তৈরি হলো। আগামীতে যারা বিডা চালাবেন তাদের শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না।’

পোস্টের শেষে একটি পুনশ্চে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, অক্টোবর থেকে এপ্রিলের বিনিয়োগের পরিমাণ আর গত বছরের একই সময়ের নম্বরটা প্রায় একই। কিন্তু এতে বিডার কোনো ক্রেডিট বা ফেইলিউর নেই। এত বড় অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পর এত তাড়াতাড়ি বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ আগের জায়গায় ফিরে গেছে তা আশার কথা। কিন্তু এর পেছনে মূল শক্তি অর্থনৈতিক টার্ন অ্যারাউন্ড: রিজার্ভ বৃদ্ধি, এক্সচেঞ্জ রেট স্থিতি ইত্যাদি।

আরও