তিনি বলেছেন, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশী কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অনেক বেশি। অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের কারণে জমিজমা বিক্রি করে প্রবাসীদের ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করে বিদেশে আসতে হয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ খরচ কমিয়ে ৩ লাখ টাকার মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। অন্যদিকে কীভাবে আরো বেশি দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানো যায় সে বিষয়েও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সিঙ্গাপুরে গতকাল ‘দ্বিতীয় বাংলাদেশ রেমিটার্স সম্মাননা ২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। গত বছরের ধারাবাহিকতায় বণিক বার্তার ডিজাইনে দ্বিতীয়বারের মতো সম্মাননা জানানো হয় ১৫ প্রবাসী ব্যক্তি ও চার প্রতিষ্ঠানকে। বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখায় গতকাল প্লাম সিঙ্গাপুরে তাদের এ সম্মাননা দেয়া হয়। এ আয়োজনে সহযোগী অংশীদার ছিল প্রযুক্তি খাতের কোম্পানি থাকরাল গ্রুপ, সিঙ্গাপুর। স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ছিল প্রাইম ব্যাংক পিএলসি, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে সাড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন দেড় বিলিয়ন (দেড়শ কোটি) ডলারের বেশি। দুই বছর আগেও (২০২৩-২৪ অর্থবছর) সিঙ্গাপুর থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ৬৩ কোটি ডলার। অনুষ্ঠানে গতকাল বক্তারা বলেন, সিঙ্গাপুর প্রবাসীদের বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোয় উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে বণিক বার্তা আয়োজিত রেমিটার্স সম্মাননার ভূমিকা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭) সিঙ্গাপুর থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেন তারা।
বণিক বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে থাকরাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গুরমুখ সিং থাকরাল, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, ওয়ান ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান এএসএম শহীদুল্লাহ্ খান, ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ড. মেলিতা মেহজাবিন, প্রাইম ব্যাংক পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল রহমান, বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার সিঙ্গাপুরের সভাপতি মো. সাহিদুজ্জামানসহ সিঙ্গাপুরে অবস্থিত বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউজ, সিঙ্গাপুর সরকারের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তা, প্রবাসী বাংলাদেশীসহ দেড় শতাধিক অতিথি অংশ নেন।
বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘শুধু ইংরেজি ভাষা নয়, থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ যেমন চাইনিজ, জাপানিজ বা অন্য যে ভাষা শিখলে বিদেশে গিয়ে আমাদের নাগরিকরা কাজ করতে পারবেন সেই জায়গায় সরকার মনোযোগী হচ্ছে।’
এজন্য সরকার শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সরকার শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রেখেছে। বিশেষ করে ভোকেশনাল ট্রেনিংকে আরো উন্নত ও সময় উপযোগী করা, কারিগরি শিক্ষা ও থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ শিক্ষায়ও জোর দিচ্ছে সরকার।’
অনুষ্ঠানে অভিবাসীদের জন্য সার্বিক সেবা নিশ্চিত করা ও সমস্যা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি ডেডিকেটেড ‘মাইগ্রেশন উইং’ চালু করা হয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘প্রবাসীদের সমস্যা সমাধান ও সেবার মানোন্নয়নে একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে এ উইং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ হিসেবে কাজ করছে।’
সিঙ্গাপুর প্রবাসী ও দেশটির ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘গত ১৭-১৮ বছরে দেশের অর্থনীতির ওপর দিয়ে অনেক ঝড়ঝাপ্টা গেছে। বর্তমান সরকার দেশে একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও “ওয়ান স্টপ সার্ভিস”যুক্ত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করছে। আপনারা যারা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তারা কেবল রেমিট্যান্স প্রেরক না হয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা হিসেবে ভূমিকা রাখুন। প্রবাসীদের বিনিয়োগ দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখবে।’
অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুরে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্দেশে পাঁচটি বিশেষ অনুরোধ জানান শামা ওবায়েদ। হুন্ডি পরিহার করে সর্বদা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো; সিঙ্গাপুরের আইন, বিধিবিধান ও কর্মসংস্কৃতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীল হওয়া ও যেকোনো উগ্রবাদ বা বিদ্বেষমূলক প্রচারণা থেকে বিরত থাকা; ভিন্ন ভাষা ও ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং নতুন প্রযুক্তি, কারিগরি বিদ্যা ও ভাষা দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিয়ত দক্ষ করে তোলার অনুরোধ করেন প্রতিমন্ত্রী।
অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে সম্মাননা পেয়েছেন পাঁচ গ্রাহক
বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সিঙ্গাপুরে সম্প্রতি দেউলিয়া হওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠানের ২০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশী কর্মীর মধ্যে ১২৫ জনকে দ্রুততম সময়ে পুনর্বাসিত করায় সিঙ্গাপুরের মিনিস্ট্রি অব ম্যানপাওয়ারকে ধন্যবাদ জানান। এছাড়া বৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সুদৃঢ় করার জন্য সিঙ্গাপুর প্রবাসী সব রেমিট্যান্স যোদ্ধার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
গত বছর অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ রেমিটার্স সম্মাননা ২০২৫ সিঙ্গাপুর’-এর সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এ বছরের সংস্করণটিতেও বৈধ বা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সম্মানিত করা হয়। একটি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও মেধাভিত্তিক নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পুরো নির্বাচন ও আমন্ত্রণ প্রক্রিয়াটি যৌথভাবে সমন্বয় ও চূড়ান্ত করেন অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজ পিটিই লিমিটেডের সিইও ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মোস্তাফিজুর রহমান, প্রাইম এক্সচেঞ্জ কোং পিটিই লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও সিইও মোহাম্মদ সামিউল্লাহ এবং এনবিএল মানি ট্রান্সফার পিটিই লিমিটেডের সিইও ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম।
রেমিট্যান্স প্রেরকদের সম্মাননার পাশাপাশি সিঙ্গাপুরে কমিউনিটি উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দ্বিপক্ষীয় সৌহার্দ্য বৃদ্ধিতে রূপান্তরমূলক অবদানের জন্য চারটি সংস্থা এবং একজন সিআইপিকে সম্মানিত করা হয়। সম্মাননা পাওয়া সংস্থাগুলো হলো বাণিজ্য সংগঠন বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুর, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটি, মাইগ্রেন্ট মিউচুয়াল এইড ও দ্য ওয়ান্ডারিং ডার্বিশেস। সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটির পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি আলতাফ হোসাইন, বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুরের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মো. সাহিদুজ্জামান, মাইগ্রেন্ট মিউচুয়াল এইডের সভাপতি সুদেস্না রয় চৌধুরীর পক্ষে অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজ প্রাইভেট লিমিটেড ও দ্য ওয়ান্ডারিং ডার্বিশেসের পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন সংগঠনটির সভাপতি ড. মুনতাসীর মান্নান চৌধুরী। সিআইপি হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুরের সভাপতি মো. সাহিদুজ্জামান।
ব্যক্তি শ্রেণীতে ন্যাশনাল ব্যাংক এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রেরক বা ‘বাই ভলিউম’ ক্যাটাগরিতে সম্মাননা গ্রহণ করেন মো. রেজাউল করিম, নাজমুল আরেফিন ও মো. ওমর ফারুক সবুজ। আর একই প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বাধিকবার রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য ‘বাই ফ্রিকোয়েন্সি’ ক্যাটাগরিতে সম্মাননা গ্রহণ করেন মোহাম্মদ বাবুল ও মোহাম্মদ জামিউল ইসলাম।
অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজের হয়ে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রেরক (বাই ভলিউম) হিসেবে পুরস্কার গ্রহণ করেন আব্দুস ছাত্তার ও মোহাম্মদ ফেরদৌস হোসেন। অন্যদিকে সর্বাধিকবার রেমিট্যান্স প্রেরক (বাই ফ্রিকোয়েন্সি) ক্যাটাগরিতে সম্মাননা গ্রহণ করেন আকরাম হোসেন, এসএম আরিফুর রহমান ও একমাত্র নারী বিজয়ী সাইমা আক্তার।
প্রাইম এক্সচেঞ্জ হাউজের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য (বাই ভলিউম) সম্মাননা গ্রহণ করেন মোহাম্মদ রাশেদুর রহমান, শহিদুল ইসলাম ও খোরশেদ আলম চৌধুরী। এছাড়া সর্বাধিক ফ্রিকোয়েন্সিতে রেমিট্যান্স পাঠানোর স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার গ্রহণ করেন মো. সালেহ জোহা ও রিয়াদ সরকার।
অনুষ্ঠান সফল করতে সহযোগিতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার এবং অন্য প্রতিনিধিদের মধ্যে ক্রেস্ট ও সম্মাননা গ্রহণ করেন অগ্রণী এক্সচেঞ্জের সিইও মোস্তাফিজুর রহমান, প্রাইম এক্সচেঞ্জের সিইও মোহাম্মদ সামিউল্লাহ, এনবিএল মানি ট্রান্সফার প্রাইভেট লিমিটেডের সিইও মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম। তাদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামসহ উপস্থিত অতিথিরা।
অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুর প্রবাসী বাংলাদেশীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে থাকরাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গুরমুখ সিং থাকরাল বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব ১৯৭২ সাল থেকে। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের অংশ হয়ে রয়েছি। প্রথম দিন থেকেই আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছি। আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে বাংলাদেশীদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। সিঙ্গাপুর প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য আয়োজিত এ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের অংশীজন হতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ।’ অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেমস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক বাসব বাগচী।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের জাতির অর্থনৈতিক অগ্রগতির নেপথ্যের নায়ক উল্লেখ করে অনুষ্ঠানের সম্মানিত অতিথি ও অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ‘দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং টেকসই জাতীয় উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সিঙ্গাপুরে আমাদের এক্সচেঞ্জ হাউজ (অগ্রণী) শক্তিশালী বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে তাদের প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকারে অবিচল।’
সম্মাননা পাওয়া ন্যাশনাল ব্যাংক এক্সচেঞ্জ হাউজের পাঁচ রেমিটার
সম্মানিত অতিথি হিসেবে আরো বক্তব্য রাখেন ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ও আইবিএর অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবিন। তিনি বলেন, ‘প্রবাসী বাংলাদেশী, যারা ১ ডলারও দেশে পাঠাচ্ছেন, তারা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এ রেমিট্যান্সের বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এ অর্থ হয়তো একটি শিশুর শিক্ষার কাজে ব্যবহার হচ্ছে, নতুবা কোনো একটি পরিবারের চিকিৎসার কাজে ব্যয় হচ্ছে, যার ফলে হয়তো কেউ নতুন জীবন ফিরে পাচ্ছে। প্রবাসে অবস্থান করে দেশ ও মানুষের প্রতি রেমিটারদের দায়িত্ববোধ কতটা প্রবল, তা আমি নিজের চোখে দেখেছি। রেমিট্যান্সের গুরুত্ব কী, তা গত দুই বছরে আমরা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি।’
রেমিট্যান্স সম্মাননা অনুষ্ঠানের সম্মানিত অতিথি হিসেবে ওয়ান ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান এএসএম শহীদুল্লাহ্ খান প্রবাসীদের জন্য ওয়েজ আর্নার্স কার্ডের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘রেমিট্যান্সকে জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করতে প্রবাসীদের জন্য “ওয়েজ আর্নার্স কার্ড” করা যেতে পারে। কারণ এটার মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরকদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য নিবন্ধনের সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত করে কার্ডটি দেয়া যেতে পারে। বিদ্যমান সিআইপি কর্মসূচির পাশাপাশি কার্ডটি বিস্তৃত স্বীকৃতি কাঠামো হতে পারে। এর মাধ্যমে সরকারি সেবা, বিমানবন্দর, স্বাস্থ্যসেবা ও বীমা সুবিধা দেয়া যেতে পারে।’
সম্মানিত অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রাইম ব্যাংক পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল রহমান। রেমিটারদের জীবন সংগ্রাম, দেশের প্রতি ভালোবাসা ও অর্থনীতিতে তাদের পাঠানো অর্থের গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘রেমিট্যান্স নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই কেবল পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিই। তবে প্রতিটি লেনদেনের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকে আত্মত্যাগের গল্প, দীর্ঘ পরিশ্রম, প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকার কষ্ট। একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতি অবিচল অঙ্গীকার নিয়ে প্রবাসীরা তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোয় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে কর্মে নিয়োজিত থাকেন।’
বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ ও বিনিয়োগে গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরে থাকরাল ইনফরমেশন সিস্টেমস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক বাসব বাগচী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেকের মূল লক্ষ্য থাকে ব্যবসার লাভ-ক্ষতি বা “বটম লাইন”। কিন্তু বিদেশী কোম্পানি হিসেবে তার (থাকরালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক) দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই ছিল একটু ভিন্ন। তিনি বলতেন, “ভালো থাকো, সুস্থ থাকো এবং পরিবর্তনের সময়েও তোমরা নিজেদের জায়গায় দৃঢ়ভাবে থাকো।” এমনকি বাংলাদেশে রেজিম চেঞ্জের (সরকার পরিবর্তন) সময়ও তিনি আমাদের সম্পত্তিতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার জন্য সবসময় উৎসাহ দিতেন। তিনি বারবার বলতেন, “এটাই সেই সময়, যখন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। বিনিয়োগ চালিয়ে যাও, তোমাদের টিম বড় করো এবং ব্যবসা সম্প্রসারণ করো। এ প্রতিষ্ঠান একদিন বাংলাদেশের অন্যতম বড় কোম্পানিতে পরিণত হবে।”’
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সিঙ্গাপুর থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজ পিটিই লিমিটেডের সিইও ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সিঙ্গাপুর থেকে একটি একক ডলার যখন বাংলাদেশে যায়, তখন সেটা প্রায় ৯৯ টাকায় রূপান্তর হয়। যখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ৯৯ টাকা যোগ হয়, তখন এর অর্থনৈতিক মূল্য ১০০ গুণ বেড়ে যায়। এখানকার ডলার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। ফলে দেশের বেকারত্ব কমছে, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নতি হচ্ছে, মার্কেট ভ্যালু বাড়ছে ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করছে।’
প্রাইম এক্সচেঞ্জ কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের সিইও মোহাম্মাদ সামিউল্লাহ বলেন, ‘প্রবাসীদের নিষ্ঠার কারণেই বাংলাদেশে লাখ লাখ পরিবার তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করতে পারছে। নতুন নতুন ব্যবসা শুরু হচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিতে বড় অবদান রাখছে। এখানে উপস্থিত প্রত্যেক রেমিট্যান্স যোদ্ধা বাংলাদেশের গর্ব এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির নীরব নায়ক। রেমিট্যান্স শুধু সংখ্যার (অর্থ) স্থানান্তর নয়; এটি ভালোবাসা, আশা, মূল্যবান মুহূর্ত, আনন্দ ও দায়িত্বেরও স্থানান্তর। এ বিশ্বাসকে ধারণ করে প্রাইম ব্যাংক ও প্রাইম এক্সচেঞ্জ উভয়েই আপনাদের কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে, দক্ষতার সঙ্গে প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
নির্মাণ শিল্পে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশী শ্রমিকদের অবদানের কথা তুলে ধরে আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডমিনিয়ন এলএলসির অ্যাডভোকেট অ্যান্ড সলিসিটর জোসেফ ইয়ং বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে এমন নির্মাণাধীন স্থাপনা খুব কমই দেখা যাবে, যেখানে কোনো না কোনো বাংলাদেশী শ্রমিকের হাতের ছোঁয়া লাগেনি। একই সঙ্গে এটাও দুঃখজনক যে যেকোনো নির্মাণকাজেই এসব শ্রমিকের হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটার অনিবার্য আশঙ্কা থাকে। ডমিনিয়ন এলএলসি এ ধরনের অনেক শ্রমিকের হয়ে কাজ করে। আমরা এসব শ্রমিকের ক্ষতিপূরণের অর্থ নিরাপদে এবং সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছাতে কাজ করছি।’
সবসময় প্রবাসীদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সারা বিশ্বের যেখানেই বাংলাদেশী প্রবাসীরা থাকুন না কেন, কোনো বাংলাদেশী সংগঠন তাদের সম্মাননা দিলে ইউএস-বাংলা সবসময় তাদের পাশে থাকবে। এ প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। রেমিট্যান্স নিয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের বিষয়টি যখন শুনেছি, কোনো প্রশ্ন ছাড়াই এতে অংশগ্রহণের সম্মতি দিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। গত বছরও এ ধরনের আয়োজনে ইউএস-বাংলা পাশে থাকার চেষ্টা করেছে।’
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক দেওয়ান হোসনে আইয়ুব; বাংলাদেশ হাইকমিশন, সিঙ্গাপুরের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স লুৎফুন নাহার; সিঙ্গাপুর হাইকমিশন ও বাংলাদেশের মনোনীত চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ফিলিপ ওং। এছাড়া বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তা ও প্রবাসী বাংলাদেশীরা সম্মাননা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।