চার মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ স্থিতি কমেছে ১৪৯ কোটি ডলার

দেশে ডলার প্রবাহ অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিদেশী হিসাবে (নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট) ডলার স্থিতি কমেছে। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকগুলোর বিদেশী হিসাবে স্থিতির পরিমাণ ছিল

দেশে ডলার প্রবাহ অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিদেশী হিসাবে (নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট) ডলার স্থিতি কমেছে। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকগুলোর বিদেশী হিসাবে স্থিতির পরিমাণ ছিল ৬১০ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। ধারাবাহিকভাবে কমে অক্টোবর শেষে এ স্থিতি ৪৬১ কোটি ৫৯ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। সে হিসাবে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে ১৪৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার বা ২৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারল্য সংকটের কারণে নাজুক পরিস্থিতিতে পড়া দেশের প্রায় এক ডজন ব্যাংক ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছে না। আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য বিদেশী ব্যাংকগুলো তাদের অনুমোদিত ঋণসীমা কমিয়ে এনেছে। ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের বিনিয়োগ স্থিতিও কমছে। এসবের প্রভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডলার রিজার্ভ কমে গেছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, ‘ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে বিদেশ থেকে নতুন ঋণ আসছে খুবই কম। বিপরীতে আগে আসা ঋণই বেশি পরিশোধ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের সুদহারও এখন বেশ চড়া। আগে দেশের উদ্যোক্তারা বিদেশী প্রতিষ্ঠান থেকে বায়ার্স ক্রেডিট নিতেন। কিন্তু সুদহার বেশি হওয়ার পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হারে অস্থিরতার কারণে এখন বায়ার্স ক্রেডিট নেয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আমদানির ক্ষেত্রে বিদেশী ব্যাংকগুলো ক্রেডিট লিমিটও কমিয়ে দিয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ স্থিতি কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে এসবের প্রভাব রয়েছে।’

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেয়ার পর বিদেশী ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বকেয়া এলসি দায় পরিশোধের নির্দেশনা দিয়েছেন। এরই মধ্যে অনেক মেয়াদোত্তীর্ণ এলসি দায় পরিশোধ করা হয়েছে। আর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও স্থিতিশীল হয়ে আসছে। আশা করছি, বিদেশী ব্যাংকগুলোও তাদের ক্রেডিট লিমিট স্বাভাবিক করে আনবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ সালের জুলাইয়ে দেশের ব্যাংকগুলোর বিদেশী হিসাবে থাকা ডলারের রিজার্ভ ছিল ৬০০ কোটি বা ৬ বিলিয়ন ডলার। এর পর থেকে দেশে ডলারের সংকট বাড়তে থাকে। ফলে ব্যাংকগুলোর নস্ট্রো হিসাবে ডলার স্থিতির পরিমাণও কমে যায়। ২০২২ সালের জুন শেষে এ স্থিতির পরিমাণ ছিল ৫২০ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। ২০২৩ সালের জুনে এ স্থিতি কিছুটা বেড়ে ৫৫৩ কোটি ২ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। দুই বছর আগের তুলনায় চলতি বছরের শুরু থেকে ডলার সংকট কিছুটা কমতে শুরু করে। এতে গত জুন শেষে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়ে ৬১০ কোটি ৩৩ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। তবে জুলাই থেকেই এ স্থিতি আবারো কমতে শুরু করে। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর ডলার স্থিতি ৪৯৮ কোটি ১০ লাখ ডলারে নেমে যায়। আর অক্টোবর শেষে এ স্থিতি ৪৬১ কোটি ৫৯ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। ব্যাংকগুলো মূলত আমদানির এলসি দায় ও বিদেশী ঋণ পরিশোধের জন্য বিদেশী হিসাব বা নস্ট্রো অ্যাকাউন্টে ডলার সংরক্ষণ করে।

চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতের স্বল্পমেয়াদি বিদেশী ঋণ ছিল ১ হাজার ১৪০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৭৬ কোটি ৬৮ লাখ ডলার ছিল ডেফার্ড পেমেন্ট বা বিলম্বিত দায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, এক বছর আগে বিলম্বিত এ দায় ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছিল। গত তিন মাসে ডেফার্ড পেমেন্টের পরিমাণ জুনের চেয়েও অনেক কমেছে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি গত চার মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ১৮৪ কোটি বা ১ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার কমেছে। গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ১৬৮ কোটি বা ২১ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। অক্টোবর শেষে এ রিজার্ভ ১৯ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। সর্বশেষ গত ১৩ নভেম্বর রিজার্ভের পরিমাণ আরো কমে ১৮ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

তবে তিন বছর ধরে যে হারে রিজার্ভের ক্ষয় হয়েছে, সেটি এখন কমে এসেছে। ২০২১ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রস রিজার্ভ (কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবায়ন অনুযায়ী) ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে রিজার্ভে ক্ষয় হয়েছে। এ সময়ে প্রতি মাসে রিজার্ভ থেকে এক-দেড় বিলিয়ন ডলার বিক্রি করতে হয়েছে। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেয়ার পর রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।

আরও