নাগরিক প্লাটফর্মের সংলাপ

শিক্ষকদের সক্ষমতা ও বাজেট বৃদ্ধি এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত শিক্ষার দাবি

দেশের শিক্ষা খাতের সংকট নিরসনে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিক ও বিশেষজ্ঞরা।

এ সময় তারা শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার জোর দাবি জানান। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘সরকারের অগ্রাধিকার ও শিক্ষা খাত: বাজেট ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সংলাপে এসব দাবি উত্থাপন করা হয়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নাগরিক প্লাটফর্ম আয়োজিত এ সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘‌গত কয়েক বছরে শিক্ষা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সরকার সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কাজ করছে।’

তিনি জানান, বেসরকারি স্কুলগুলোর তদারকির জন্য একটি নিয়ন্ত্রক পর্ষদ গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ১৪ মে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হবে।

ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘‌দেশের ৩০-৪০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। কিছু ভবন এতটাই জরাজীর্ণ যে সেগুলো নতুন করে নির্মাণ করা ছাড়া উপায় নেই।’

শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে অর্থনীতিবিদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দিক দিয়ে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের মধ্যে তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ায়ও তলানির দিকে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বললেই সরকারের টাকা থাকে না। অন্যান্য দেশ শিক্ষা খাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দ দিতে পারলে, বাংলাদেশ কেন পারবে না? এটা একবারে ঠিক হবে না। কিন্তু এক বছর পরিকল্পনা নিয়ে করতে হবে।’

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‌প্রজেক্ট অনুযায়ী অর্থায়নে শিক্ষা খাত চলতে পারে না। ট্যাব কেনার মতো সিদ্ধান্ত, কারিকুলাম পরিবর্তন, সৃজনশীল আসা হঠাৎ করে এসবের উদয় হওয়ার কারণ কমপ্রিহেনসিভ শিক্ষা কমিশন নেই। মান ঠিক রাখতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, যোগ্যদের শিক্ষকতায় আনার মতো বেতন কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস নিশ্চিত করতে হবে।’

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুলের ম্যানেজমেন্ট কমিটি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ পর্যন্ত সর্বত্র রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘‌রাষ্ট্রের সামগ্রিক পচনের প্রভাব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি—সবখানেই পড়ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে ‘‘নো কম্প্রোমাইজ’’। এমপিদের সন্তানদের নিজ এলাকার স্কুলে পড়াতে হবে। তাদের এলাকায় চিকিৎসা নিতে হবে। এটি হলে এমপি হওয়ার জন্য যারা শত শত কোটি টাকা নিয়ে ঘুরছে, তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। রুমিন ফারহানার মতে, দেশে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। কারণ শিক্ষকতা এখন আর সম্মানজনক ও আর্থিকভাবে নিরাপদ পেশা হিসেবে বিবেচিত হয় না।

স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও নাগরিক প্লাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘‌কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে আমি একাই হাইকোর্টে রিট করব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শিক্ষার পরিবেশ ও জবাবদিহিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে, সে বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন।’

রাশেদা কে চৌধুরী আরো বলেন, ‘‌বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে যেন শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত না হয়। সে লক্ষ্যে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।’

দেশে বর্তমানে ১৩ ধরনের শিক্ষা ধারা চালু থাকায় জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য ও সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি বলেছেন, সরকার বদলায়, কমিশন বদলায়, কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার মূল কাঠামো বদলায় না। এভাবে চলতে থাকলে জাতীয় ঐকমত্য সম্ভব নয়। দেশে প্রাথমিক শিক্ষা, সাধারণ স্কুল, মাদরাসা, ইংরেজি মাধ্যম ও কওমিসহ প্রায় ১৩ ধরনের শিক্ষা ধারা রয়েছে। একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এতগুলো ধারায় পরিচালিত হওয়ার পরও জাতীয় ঐক্য আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য এনসিপি নেত্রী মাহমুদা মিতু অতীতে শিক্ষা খাতে হওয়া দুর্নীতির তদন্ত দাবি করেন।

জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, ‘‌স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া উচিত। প্রত্যেক স্কুলে নতুন বিল্ডিংয়ের আগে পুরনো বিল্ডিংয়ের অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, ইউনেস্কো বাংলাদেশের হেড অব এডুকেশন নোরিহিদে ফুরুকাওয়া, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিঞা মো. নূরুল হক, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক-উজ-জামান, ইয়ুথ পলিসি ফোরামের নির্বাহী পরিচালক আমের মোস্তাক আহমেদ প্রমুখ।

আরও