কলাপাড়ায় ম্যানগ্রোভ উজাড়, প্রশ্নের মুখে বন বিভাগের নজরদারি

নদীপথে ট্রলারে করে গাছ যাচ্ছে করাতকলে, সেখানে চেরাই করে তৈরি হচ্ছে তক্তা। কোথাও আবার বনাঞ্চলের ভেতরেই কেটে ফেলা হচ্ছে গাছ ও ডালপালা।

নদী-সাগরের বুকে জেগে ওঠা চরে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কেওড়া, বাইন, গেওয়া ও গোলপাতার ম্যানগ্রোভ উপকূলকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আঘাত থেকে রক্ষা করে। সেই প্রাকৃতিক ঢালই এখন কেটে নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নদীপথে ট্রলারে করে গাছ যাচ্ছে করাতকলে, সেখানে চেরাই করে তৈরি হচ্ছে তক্তা। কোথাও আবার বনাঞ্চলের ভেতরেই কেটে ফেলা হচ্ছে গাছ ও ডালপালা। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের হাজিপুর ও আশপাশ চরাঞ্চলে সরজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর হাজিপুর এলাকার একটি করাতকলে প্রায় দুই টন ওজনের বিশাল একটি কেওড়া গাছ চেরাই করে তক্তা বানাতে দেখা যায়। পাশে পড়ে ছিল আরো কয়েকটি গাছ। স্থানীয়দের দাবি, এসব গাছ নীলগঞ্জের নদী ও চরাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই ওই করাতকলে বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা গাছ চেরাই করে তক্তা তৈরি করা হচ্ছে। পরে সেগুলো গৃহস্থালি ও আসবাব তৈরির কাজে ব্যবহারের জন্য স্থানীয় বাজারসহ দূরবর্তী এলাকায় পাঠানো হয়।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, গাছগুলো বৈধভাবে সংগ্রহ করা হলে সেগুলোর উৎস কী, কে অনুমতি দিয়েছে এবং নদীপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে সরকারি কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কিনা। আর গাছগুলো অবৈধভাবে কাটা হলে নদীপথে পরিবহন করে করাতকল পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত বন বিভাগের নজরদারি কোথায় ছিল?

শুধু করাতকলেই নয়, বনাঞ্চলের ভেতরেও গাছ কাটার চিহ্ন মিলেছে। বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকতে দেখা গেছে সদ্য কাটা গাছের কাণ্ড। একটি স্থানে কয়েকটি কেওড়া গাছ কাটা অবস্থায় পড়ে ছিল। অন্য একটি কেওড়া গাছে উঠে এক ব্যক্তিকে ডাল কাটতেও দেখা যায়।

বনাঞ্চলের ভেতরের আরেকটি চিত্রও উদ্বেগ তৈরি করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ থেকে সোনাতলা নদী পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মিটার প্রশস্ত বনাঞ্চলের মধ্যে স্থানীয়দের বসতি ও মাছের ঘের রয়েছে। ঘেরের চারপাশে ও পানিতে ঝাউ দেয়ার কাজে ম্যানগ্রোভ গাছের ডাল ব্যবহারের চিত্রও দেখা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলীয় বন উজাড়ে একটি চক্র সক্রিয়। প্রথমে নতুন চর বা বনভূমিতে দখল তৈরি করা হয়। এরপর গাছ কেটে জায়গা পরিষ্কার করে সেখানে বসতি বা মাছের ঘের গড়ে তোলা হয়। শ্রমিক ও পরিবহনকারীদের মাধ্যমে কাঠ পৌঁছে যায় করাতকলে। পরে মধ্যস্বত্বভোগী ও কাঠ ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে তা স্থানীয় ও দূরবর্তী বাজারে বিক্রি করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের আওতাধীন কলাপাড়া উপজেলায় বিজ্ঞাপিত ও সংরক্ষিত বনভূমির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ২১৬ একর বা ২ হাজার ১১১ হেক্টর। কলাপাড়া ও কুয়াকাটার উপকূলীয় এলাকা রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পর্যটন এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে এসব বন গুরুত্বপূর্ণ। নতুন জেগে ওঠা চরগুলোয় সামাজিক বনায়ন ও ম্যানগ্রোভের চারা রোপণের ফলে বনভূমির পরিধিও বাড়ছে।

এর বিপরীতে পুরনো ও বড় গাছ কেটে বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠছে। এতে বন ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কলাপাড়া ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার (অতিরিক্ত) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বনে কোনো গাছের ডাল কাটলেও বন বিভাগের নজরে আসে। কেউ অপরাধ করলে তাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।’

করাতকলে পাওয়া কেওড়া গাছের তক্তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মো. আবু কাওসার বলেন, তিনি সম্প্রতি যোগদান করায় এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে বন উজাড়ের সঙ্গে বন বিভাগের কোনো কর্মী বা বাইরের কেউ জড়িত থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরও