তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড

রাষ্ট্রায়ত্ত ও কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথও ট্রাক কাভার্ড ভ্যানের দখলে

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্যান্য বাণিজ্যিক যানবাহনের মতো আমাদের গাড়ি রাখার নির্ধারিত জায়গা হলো ট্রাক টার্মিনাল। কিন্তু টার্মিনালের ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেক সময় রাস্তায় গাড়ি রাখতে হয়, যা মোটেও ইচ্ছাকৃত নয়।’

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সংযোগপথগুলো আবারো চলে গেছে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের দখলে। সাতরাস্তা থেকে কারওয়ান বাজার রেলগেট পর্যন্ত মেয়র আনিসুল হক সড়কের বড় অংশজুড়ে চলছে ভারী যানবাহনের পার্কিং। আশপাশের অলিগলির পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। এতে যানজট ও জনদুর্ভোগের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ ঘেঁষেই চলছে অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং ও গাড়ি মেরামতের কাজ।

তেজগাঁও শিল্প এলাকার এ অংশে রয়েছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কার্যালয়, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), কেপিআইভুক্ত এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তর, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর এবং কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগার (সিএসডি)। এছাড়া ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৩০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সরজমিনে দেখা গেছে, তেজগাঁও লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার পর সড়কের দুই পাশে সারি করে রাখা হয়েছে ট্রাক, পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যান। প্রায় ১০০ ফুট প্রশস্ত সড়কের বড় অংশ পার্কিংয়ে চলে যাওয়ায় যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল করতে হচ্ছে সংকুচিত অংশ দিয়ে। সংযোগ সড়ক ও অলিগলিতেও পাশাপাশি একাধিক ভারী যান দাঁড় করিয়ে রাখায় অনেক জায়গায় একসঙ্গে দুইদিকের গাড়ি চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যস্ত সময়ে এতে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।

সড়কের দখল শুধু পার্কিংয়েই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন স্থানে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান রেখেই চলছে ইঞ্জিন মেরামত, বডি ঝালাই, ডেন্টিং-পেইন্টিং ও চাকা খোলার কাজ। রাস্তার ওপর ছড়িয়ে রাখা হয়েছে গাড়ির যন্ত্রাংশ ও মেরামতের সরঞ্জাম। ফলে যান চলাচলের জায়গা আরো কমার পাশাপাশি পথচারীদেরও বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে।

বিশেষ করে সরকারি ও কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ ঘেঁষে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং ও মেরামত কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব সড়ক দিয়ে সরকারি যানবাহন ও জরুরি সেবার গাড়িকেও ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ পরিস্থিতি তাই শুধু নগরীর যানজটের সমস্যা নয়; গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা ও জরুরি চলাচলের সক্ষমতার বিষয়টিও সামনে আনছে।

মেয়র আনিসুল হক সড়কটি সাতরাস্তা হয়ে কারওয়ান বাজার, তেজতুরী বাজার, ফার্মগেট, মহাখালী, বনানী, গুলশান, নিকেতন, হাতিরঝিল ও রামপুরার সঙ্গে যুক্ত। ফার্মগেট-তেজগাঁও এলাকায় রয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ সড়ক দিয়ে জাতীয় নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউট, সংবাদপত্র ভবন, ছাপাখানা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও সাধারণ মানুষ চলাচল করে।

এ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামনেও অনেক সময় ট্রাক ও পণ্যবাহী যান পার্ক করে রাখা হয়। অন্যদিকে ফুটপাতের বড় অংশ বিভিন্ন হোটেল ও হকারের দখলে থাকায় পথচারীদের সড়কেই নামতে হচ্ছে। ভারী যানবাহনের সারি ও ফুটপাত দখলের মাঝখানে সরু জায়গা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকতে হচ্ছে তাদের।

এ পথে নিয়মিত চলাচলকারী শিক্ষার্থী তানজিলা হাসান বলেন, ‘বেশির ভাগ সময়ই এ রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু রাস্তায় হাঁটার যেন কোনো উপায় নেই। চারপাশে পণ্য পরিবহনকারী যানবাহন, ফুটপাতও দখলে। এ রাস্তায় চলতে গেলে সবসময়ই ভয় আর আতঙ্কে থাকতে হয়।’

তেজগাঁওয়ের সড়কে ট্রাক পার্কিং নতুন কোনো সমস্যা নয়। শিল্পাঞ্চল ও কারওয়ান বাজারের কাছাকাছি হওয়ায় কয়েক দশক ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাভার্ড ভ্যান, কার্গো ট্রাক ও পিকআপ এ এলাকায় আসছে। এসব যান রাখার জন্য নির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত টার্মিনাল না থাকায় কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে সাতরাস্তা, বেগুনবাড়ী ও আশপাশের সড়কে পার্কিং শুরু হয়।

পরিবহনসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক ও পিকআপ এ এলাকায় প্রবেশ করে। লেগুনা, রিকশা স্ট্যান্ডসহ অন্যান্য যানবাহন মিলিয়ে প্রতিদিন পাঁচ-ছয় হাজার যানবাহন এ সড়ক দিয়ে চলাচল করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সড়কের ওপর চাপ অনেক বেশি।

নবীন ট্রান্সপোর্টের চালক জাহাঙ্গীর বলেন, ‘মূল ট্রাক স্ট্যান্ডে জায়গা না থাকায় রাস্তায় গাড়ি পার্ক করতে হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ এ বিষয়ে কিছু বলে না। টার্মিনাল করার কথা রয়েছে। টার্মিনাল হলেই আমরা সেখানে চলে যাব। রাস্তায় পার্কিং করব না।’

তবে সড়ক দখল করে গাড়ি রাখার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এছাড়া কোনো উপায় নেই।’

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্যান্য বাণিজ্যিক যানবাহনের মতো আমাদের গাড়ি রাখার নির্ধারিত জায়গা হলো ট্রাক টার্মিনাল। কিন্তু টার্মিনালের ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেক সময় রাস্তায় গাড়ি রাখতে হয়, যা মোটেও ইচ্ছাকৃত নয়।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনিসুল হকের সময়ে আমাদের কিছুটা সুবিধা দেয়া হলেও পরে সময়ের সঙ্গে গাড়ির সংখ্যা অনেক বেড়েছে। শহরের অন্যান্য বাস টার্মিনালের মতো চাহিদা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতার আধুনিক টার্মিনাল তৈরি করে দেয়া হলে আমাদের আর রাস্তায় গাড়ি রাখার কোনো প্রয়োজন পড়বে না।’

তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের সড়ক দখল নতুন নয়। কয়েকবার উচ্ছেদ করেও সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান হয়নি। ২০১৫ সালের নভেম্বরে শ্রমিকদের বাধার মুখেও তৎকালীন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের সড়ক থেকে ট্রাক সরিয়ে দেয়া হয়। আশপাশের সংযোগ সড়কও দখলমুক্ত করা হয়। সাতরাস্তা থেকে তেজগাঁও লেভেল ক্রসিং পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালেও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগ অভিযান চালিয়ে সাতরাস্তা-রেলগেট সড়ক থেকে ট্রাক-ভ্যানের অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ করে। কিন্তু পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে আবারো মূল সড়ক ও সংযোগ সড়কে ফিরে এসেছে ভারী যানবাহন। ফলে যে রাস্তা একসময় দখলমুক্ত করে পার্কিংমুক্ত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, সেটিই এখন আবার পার্কিং এলাকায় পরিণত হয়েছে।

তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় বসবাসকারী আড়াই-তিন কোটি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় মালপত্র সারা দেশ থেকে ট্রাকে করেই আসে। তবে যানজট এড়াতে দিনের বেলায় চলাচল নিষেধ থাকায় রাতের বেলায় শহরে গাড়ি প্রবেশ করে এবং পণ্য খালাস করতে করতে ভোর হয়ে যায়। পরে ট্রানজিট সুবিধা না থাকায় এবং দিনের বেলায় পুনরায় চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় এসব গাড়ি শহর থেকে বের হতে না পেরে বাধ্য হয়েই তেজগাঁও এলাকায় জমা হয়ে থাকে।’

স্থায়ী সমাধানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখানে পরিবহন শ্রমিকদের সংবেদনশীল বিষয় জড়িত থাকায় শুধু কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ, মামলা দায়ের বা রেকার দিয়ে গাড়ি সরিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আমরা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে এখানে একটি বহুতলবিশিষ্ট আধুনিক ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ এবং এক্সপ্রেসওয়ে বা বাইপাস সড়কের মাধ্যমে গাড়ি চলাচলের ট্রানজিট সুবিধার প্রস্তাব করেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাস্তাঘাট সচল রাখতে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে পার্কিং স্পেস তৈরি করা এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমেই কেবল সরকার উচ্চ পর্যায় থেকে এর স্থায়ী সমাধান দিতে পারে।’

এ বিষয়ে জানতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

আরও