সংসদে প্রধানমন্ত্রী

প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন

স্থানীয় প্রতিরক্ষা শিল্প নির্মাণের জন্য আলাদা ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

গতকাল জাতীয় সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরকার দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সশস্ত্র বাহিনীর চাহিদা পূরণে স্বনির্ভর ‘‘মেড ইন বাংলাদেশ’’ প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ার জন্য দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে শিল্পভিত্তিক স্বনির্ভরতার পথরেখা নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বর্তমানে চলমান আছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ভবিষ্যতে অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিকস এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান আছে। এক্ষেত্রে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলমান আছে।’

জামায়াতের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন চলমান অগ্রাধিকারমূলক প্রক্রিয়া। এ উদ্দেশ্যে তিন বছর এবং পরবর্তী সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’

বিমান বাহিনীর অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংযোজনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।’

রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ ও দ্রুততম সমাধানে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম রেজার তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে দ্বিপক্ষীয় ফ্রন্টে মিয়ানমারের মূল জান্তা সরকারের পাশাপাশি সব পক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ স্থাপন ও আলোচনার বিষয়টি আমাদের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। তাছাড়া মূলধারার কূটনীতির পাশাপাশি আস্থা বাড়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রক্রিয়া প্রয়োগের বিষয়টি আমাদের বিবেচনাধীন। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের মূল ভিত্তি হিসেবে রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাইকরণের কাজ নিয়মিতভাবে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসন বা প্রত্যাবাসনের কার্যক্রমও চলমান আছে।’

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক বিষয়। এর সমাধানের গতিপ্রকৃতি অনেকাংশেই নির্ভর করে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সর্বোপরি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ওপর। রাখাইন রাজ্যে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে একটি কার্যকর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপ জোরদার করেছি। রোহিঙ্গাদের স্থায়ী নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।’

টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আওয়ালের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বিরাজমান থাকায় এরই মধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগসহ থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। থাইল্যান্ডের সঙ্গে কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া থাইল্যান্ড সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে সে দেশের চাহিদা নিরূপণ-পূর্বক জনশক্তি রফতানি বাড়ার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা পাঠানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

সরকার দলীয় সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আমলে দেশের শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনের কারণ উদঘাটনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বিশেষজ্ঞ, বিনিয়োগকারী সংগঠন এবং বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।’

তিনি বলেন, ‘শেয়ার মার্কেটের ধারাবাহিক পতন ঘটিয়ে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব করার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করাসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের পরিকল্পনা আছে। এরই মধ্যে শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির অভিযোগ দুদক কর্তৃক অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা রয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে কতিপয় ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে মামলাসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির সঙ্গে আরো অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত কিনা উদঘাটনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

চট্টগ্রাম ও ঢাকা পুঁজিবাজারের বৈষম্য দূর করা হবে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা। পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। তিনি বলেন, ‘কয়েকজন বিশেষজ্ঞকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পাশাপাশি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকেও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হবে।’

বিভিন্ন বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক অফারে গ্রাহকের টাকা নেয়ার অভিযোগ নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বীমা কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ রয়েছে। সেখানে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের অনেক শিক্ষক সংসার চালাতে ক্লাস শেষে দ্বিতীয় কাজ বা কৃষিকাজে যেতে বাধ্য হন, এমন বাস্তবতা তুলে ধরে তাদের সম্মানী বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে নেয়ার লক্ষ্য রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আমাদের প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি শিক্ষকদের সঠিকভাবে ট্রেনিং দিতে না পারি, তাদের সম্মানী যদি বৃদ্ধি করতে না পারি, তাহলে অবশ্যই আমরা প্রত্যাশা করি না যে তারা ভালো কিছু করতে পারবেন।’

আরও