কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণার ষষ্ঠ দিন আজ। এবার এ নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৪৭ প্রার্থী। তাদের প্রচার-প্রচারণায় নগরজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রার্থী ও তাদের নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাস-আনন্দে মুখরিত পুরো নগরী। পথসভা, উঠান বৈঠক, পাড়া-মহল্লায় গণসংযোগ, খণ্ড খণ্ড মিছিল আর মাইকিংয়ে ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনী উত্তাপ। নিজের প্রচার চালানোর পাশাপাশি একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রার্থীরা ছুড়ছেন নানা অভিযোগের তীর। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রত্যেক প্রার্থীই নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর প্রতিটি পাড়ায়-মহল্লায় কোনো না কোনো প্রার্থীর পদচারণা রয়েছে। প্রার্থীর গুণের বয়ানে আর স্লোগানে মাইকিং চলছে অলিগলিতে। তবে মেয়র ও কাউন্সিলর পদের প্রার্থীরা একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতেও কুণ্ঠাবোধ করছেন না।
প্রার্থীদের প্রচারণা ও গণসংযোগে ভিন্ন আমেজ যোগ করেছে ডিজিটাল পদ্ধতির প্রচারণা। ফেসবুক, ইউটিউবসহ নানা মাধ্যমে প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন। অন্যদিকে নগরীর বিভিন্ন সড়কে মিছিল, মাইকিং, লিফলেট বিলির মাধ্যমে ভোটের মাঠ মুখর হয়ে উঠেছে।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত। তিনি নগরবাসীর কাছে ১১ দফা অঙ্গীকার করেছেন। তার কর্মী-সমর্থক মাধ্যমে এসব অঙ্গীকারসংবলিত প্রচারপত্র পৌঁছে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন ওয়ার্ডের ভোটারদের কাছে। রিফাত যেসব অঙ্গীকার করেছেন তার মধ্যে রয়েছে সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত করা, সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ, করের টাকা সততা-নিষ্ঠার সঙ্গে উন্নয়নকাজে ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি। এছাড়া মেয়র নির্বাচিত হলে ভবনের নকশা অনুমোদনে সরকারি ফির বাইরে তাকে ১ টাকাও বাড়তি দিতে হবে না বলে লিফলেটে উল্লেখ করেছেন এ প্রার্থী। সেই সঙ্গে সিটি করপোরেশনকে দলীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার না করতেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তিনি। নগরীর জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসন, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সব পর্যায়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন বলেও উল্লেখ করেছেন। মেয়র নির্বাচিত হলে তার দরজা স্থানীয়দের জন্য সবসময় খোলা থাকবে জানিয়ে রিফাত বলেন, কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নসহ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকমুক্ত কুমিল্লা গড়তে সব ধরনের কাজ করবেন তিনি।
গতকাল নগরীর বাদুড়তলা, ঝাউতলা, কাপ্তানবাজার, মোগলটুলি, গাংচর, শ্রীভল্লবপুর ও কোটবাড়ি এলাকায় গণসংযোগ করেন আরফানুল হক রিফাত। নিজের অঙ্গীকারের বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতে নগর ভবনে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। আমি সেগুলো দূর করতে চাই। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ ১১ দফা অঙ্গীকার ভোটারদের কাছে তুলে ধরেছি। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী ইশতেহারে নগরীর উন্নয়নের আরো বিষয় যুক্ত করা হবে। ভোটাররা তাকে নির্বাচিত করবেন! এ বিষয়ে নিজের আশাবাদের কথাও জানান তিনি।
অন্যদিকে সদ্য সাবেক মেয়র ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মনিরুল হক সাক্কু নিজের বিজয়ের বিষয়ে বেশ আশাবাদী। টেবিল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া এ নেতা বলেন, এ সিটির প্রথম ও দ্বিতীয় নির্বাচনে জনগণ আমাকে বিপুল ভোটে জয়ী করেছিল। বিরোধী দলে থেকে আমি নির্বাচিত হয়েছি। গত ১০ বছর বিরোধী দলের হয়েও এ সিটির অনেক উন্নয়ন করেছি, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনেও পদক্ষেপ নিয়েছি নগরবাসী তা দেখেছেন। সরকার নগরীকে আধুনিকায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। আমার অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য আশা করি এ নির্বাচনেও নগরবাসী আমার কাজের মূল্যায়ন করবেন।
নির্বাচিত হলে অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করাসহ এ সিটিকে উন্নত সিটিতে রূপান্তর করবেন বলে জানান মনিরুল হক। গতকাল নগরীর কান্দিরপাড়, রাজগঞ্জ, চকবাজার, সিটি মার্কেট, নজরুল এভিনিউ, লাকসাম রোড এলাকায় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে গণসংযোগ করেন।
তার বিরুদ্ধে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর করা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন সাক্কু। তিনি বলেন, ভোটের মাঠ গরম করার জন্যই এসব কথা বলা হচ্ছে। এমনকি এসব অভিযোগ নগরবাসীও নেতিবাচকভাবে নিচ্ছে, বলেই মনে করেন তিনি।
প্রার্থীদের মধ্যে বয়সের দিক থেকে সর্বকনিষ্ঠ স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার। ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে তিনি বেশ তত্পর। গত রোববার জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সিইসির সঙ্গে প্রার্থীদের মতবিনিময় সভায় ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট নিয়ে নানা অনিয়মের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন তিনি। এতে সভাস্থলে তুমুল হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। তার এ বক্তব্য নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করে।
কায়সারও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়ে পথসভা ও গণসংযোগ করছেন। তিনি গতকাল কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে নগরীর রাজগঞ্জ, চকবাজার, শুভপুর, চৌয়ারা বাজার ও আশপাশ এলাকায় গণসংযোগ ও পথসভা করেন। গণসংযোগকালে তিনি নির্বাচিত হলে জলাবদ্ধতা, যানজট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ নগরীকে আধুনিক মানের করে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন।
মাঠ পর্যায়ে গণসংযোগ করার সময় কোনো প্রার্থী নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন কিনা, সেদিকে কঠোর নজরদারি করছে নির্বাচন কমিশন। নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে গঠন করা টিম প্রার্থীদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার মো. শাহেদুন্নবী চৌধুরী জানান, আশা করি এ নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু, সুন্দর ও উৎসবমুখর হবে। সিটি নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে কমিশনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালাতে আহ্বান জানান তিনি।