যদিও বাংলাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সরকারের বিভিন্ন হিসাবকে এখনো একক কাঠামোর অধীনে আনা সম্ভব হয়নি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, টিএসএ কাঠামোর বাইরে এখনো সরকারের প্রায় ১৯ হাজার হিসাব রয়ে গেছে। প্রত্যক্ষ নজরদারির বাইরে থাকার কারণে এসব হিসাবের মাধ্যমে লেনদেনের স্বচ্ছতা ও অর্থ অপচয়ের বিষয়টি তদারক করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত কেন্দ্রীয় ‘ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট (টিএসএ)’ ব্যবস্থাটি প্রযুক্তিগতভাবে বেশ উন্নত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং পেনশন এখন ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) প্রযুক্তির মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি এ-চালান পদ্ধতির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক প্লাটফর্ম আইবাস প্লাস প্লাস-এ রিয়েল টাইমে যুক্ত হচ্ছে। এ অটোমেশনের ফলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ দৈনিক লেনদেন সমন্বয় এবং তারল্য কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছে।
তবে এ ডিজিটালাইজেশনের বাইরে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বড় ধরনের এক বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতার চিত্রও উঠে এসেছে এডিবির প্রতিবেদনে। একদিকে সরকারি লেনদেনকে স্বয়ংক্রিয় করতে ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ বা ‘এ-চালান’-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, অন্যদিকে ১৯ হাজার ব্যাংক অ্যাকাউন্টকে কেন্দ্রীয় নজরদারির বাইরে রেখে এক সমান্তরাল ও অনিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা না গেলে আর্থিক খাতের এ সমন্বয়হীনতা দূর করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বিশ্বজুড়ে আর্থিক সুশাসন ও দক্ষ নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সুপারিশে অনেক দেশ ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে। ইউরোপ-এশিয়ার সংযোগস্থলে জর্জিয়া ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক প্রতিযোগী দেশ তুরস্ক তাদের স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি ফান্ডের নগদ অর্থকে আইনি ডিক্রির মাধ্যমে একক হিসাবের আওতায় নিয়ে এসেছে। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকোসহ পৃথিবীর বহু দেশ কয়েক দশক আগেই নিজস্ব আর্থিক আইনের মাধ্যমে টিএসএ ব্যবস্থার সফল প্রবর্তন করেছে। আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া ও তানজানিয়া বাণিজ্যিক ব্যাংকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সব হিসাব বন্ধ করে বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে এনেছে। এছাড়া যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি পোশাক খাত ও বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়াতেও এই একক ট্রেজারি হিসাব কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী। এসব দেশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সরকারি অ্যাকাউন্টগুলোকে একক ছাতার নিচে নিয়ে আসায় অলস টাকা ব্যাংকে রেখে বাইরে থেকে চড়া সুদে ঋণ নেয়ার মতো আর্থিক রক্তক্ষরণ থেকে মুক্ত। যা দেশগুলোর সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় সুবিধা দিচ্ছে। ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকেও সরকারের সব হিসাবকে টিএসএ কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসতে বলেছে আইএমএফ। যদিও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা এখনো সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশে টিএসএ কাঠামোর বাইরে থাকা ১৯ হাজার ব্যাংক হিসাবের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে, যারা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার বাইরে স্বাধীনভাবে আলাদা বাণিজ্যিক ব্যাংকিং সুবিধা ব্যবহার করছে। এর মধ্যে দাতা-সংস্থার অর্থায়িত অ্যাকাউন্টও রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তাছাড়া স্থানীয় সরকার পর্যায়ের সংস্থাগুলোর অনেক ব্যাংক হিসাবও সরকারের কেন্দ্রীয় তদারকির বাইরে রয়ে গেছে। এ প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতার পরিণতি বেশ সুদূরপ্রসারী। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ অ্যাকাউন্টগুলো বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে আর্থিক দৃশ্যমানতা এবং নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি” তৈরি হচ্ছে। যেহেতু এ বাহ্যিক লেনদেন নির্ধারিত অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বাইরে চলে যায়, তাই অগ্রিম অ্যাকাউন্ট থেকে হওয়া খরচগুলো আইবাস প্লাস প্লাস সিস্টেমে সঠিকভাবে শ্রেণীবদ্ধ বা ট্র্যাক করা সম্ভব হচ্ছে না।
আর্থিক সুশাসনের তাগিদ দিলেও বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দাতা সংস্থাগুলোর নিজস্ব দ্বিমুখী নীতি এ সংকটকে আরো দীর্ঘায়িত করেছে। ঐতিহাসিকভাবেই বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা আইডিবির মতো সংস্থাগুলো ঋণের অর্থ ছাড়ের জন্য মূল ট্রেজারির বাইরে আলাদা ‘স্পেশাল অ্যাকাউন্ট’ খোলার শর্ত জুড়ে দেয়, যা প্রকারান্তরে সরকারের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে তোলে।
সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি দেখা যাচ্ছে স্থানীয় সরকার বা সাবন্যাশনাল এনটিটিগুলোর ক্ষেত্রে। একদিকে পৌরসভা কিংবা উপজেলার মতো শত শত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বছরের পর বছর ধরে বিপুল অংকের টাকা অলস পড়ে থাকছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে তারল্য সংকট দেখা দেয়ায় সরকারকে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। এতে প্রতি বছর রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা সুদের পেছনেই খরচ হচ্ছে, যা সাধারণ করদাতার ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে চেপে বসছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিএজি কার্যালয়ের মাধ্যমে কিছুটা নজরদারি বজায় রাখা সম্ভব হলেও একটি সমন্বিত বা ইউনিফর্ম প্লাটফর্ম না থাকায় সরকারি সব অ্যাকাউন্টের ওপর রিয়েল টাইম মনিটরিং সম্ভব হচ্ছে না। করদাতার অর্থ কিংবা বিদেশী ঋণের টাকা ঠিক কোথায়, কীভাবে এবং কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত প্লাটফর্মে রূপান্তর করা অপরিহার্য।’
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন, ‘তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে টিএসএ কিংবা আইবাস প্লাস প্লাস-এর মতো ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে ট্র্যাকিং করাটা মূলত ‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিং’ বা আর্থিক লেনদেনের হিসাব রাখা মাত্র। খরচের বিপরীতে ‘ভ্যালু ফর মানি’ বা অর্থের প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আর এটি তখনই সম্ভব যখন কেন্দ্রীয় এ আর্থিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থাকে মাঠ পর্যায়ের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে মেলানো বা ব্লেন্ডিং করা যাবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার এবং মাঠ পর্যায়ের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। যখন কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার এ মেলবন্ধন ঘটানো সম্ভব হবে, তখনই কেবল প্রকৃত রিয়েল টাইম ডেটা পাওয়া যাবে এবং সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে খরচের যেকোনো বিচ্যুতিতে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।’
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, টিএসএ কাঠামোর বাইরে থাকা অ্যাকাউন্টগুলোর সঙ্গে সরকারের কেন্দ্রীয় ট্রেজারি কাঠামোর প্রত্যক্ষ সংযোগ না থাকলেও এক ধরনের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যেমন এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে যখন সরকার ঋণ দিচ্ছে তখন সেই ঋণের বিষয়টি সরকারের ট্রেজারি কাঠামোর অধীনে চলে আসছে। আবার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের লভ্যাংশ বা মুনাফার অংশ যখন সরকারকে দিচ্ছে তখন সেটিও চলে আসছে ট্রেজারির কাঠামোয়। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ দেয়া অর্থ কীভাবে খরচ করা হচ্ছে সেটি সরাসরি নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। যদিও বছর শেষে প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছে ব্যয়ের হিসাব দিচ্ছে কিন্তু এ অর্থ যথাযথভাবে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় করা হয়েছে কিনা সেটি তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করাটা দুরূহ। এই ফাঁকফোকরে অর্থের অপচয় ও তছরুপের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
সংবিধান অনুসারে, সরকারের সব রাজস্ব ও প্রাপ্তি ‘সংযুক্ত তহবিল’ বা ‘প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাব’-এ জমা হওয়া বাধ্যতামূলক। ট্রেজারি রুলস অনুযায়ী, এ অর্থ কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে। এর বাইরে অন্য কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে পৃথক হিসাব খুলে সরকারি অর্থ লেনদেন করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। যদিও অনেক সরকারি দপ্তর ও অধীন অফিস আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেদের নামে বাণিজ্যিক ব্যাংকে পৃথক অ্যাকাউন্ট খুলে সরকারি অর্থ জমা রাখছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ৫৬ ডিজিটের অনলাইন ‘এ-চালান’ ব্যবস্থা চালু হলেও সরকারের কিছু দপ্তর এখনো পুরনো ম্যানুয়াল কোড ব্যবহার করে অর্থ জমা দিচ্ছে, যা রিয়েল টাইম ট্র্যাকিংকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে সরকার তার নিজস্ব নগদ অর্থের প্রকৃত স্থিতি বা ব্যালান্স জানতে পারছে না। ফলে একদিকে সরকারের বিপুল টাকা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে অলস পড়ে থাকছে, অন্যদিকে দৈনন্দিন ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে।
সাবেক অর্থ সচিব ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১৯ হাজার অ্যাকাউন্টের মধ্যে অনেক লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যবসায়িক স্বায়ত্তশাসন ও নিজস্ব বিনিয়োগের স্বাধীনতার স্বার্থে এসব লাভজনক প্রতিষ্ঠানের অর্থ সরাসরি ট্রেজারি অ্যাকাউন্টে নিয়ে আসার যৌক্তিকতা নেই। স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে আরো চার-পাঁচ বছর আগেই পাবলিক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যদিও এটি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারের উচিত বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এ সিস্টেমটিকে আরো জোরদার করা।’
সরকারি বিভিন্ন অ্যাকাউন্টকে একক ট্রেজারি হিসাবের আওতায় আনার গুরুত্ব প্রসঙ্গে সাবেক এ সিএজি বলেন, ‘দাতা সংস্থাগুলো ঐতিহাসিকভাবে প্রকল্পের জন্য আলাদা অ্যাকাউন্টে অর্থ দিয়ে আসছে। এ অর্থ ট্রেজারি অ্যাকাউন্টে না আসার পেছনে দাতা সংস্থাগুলোও দায়ী। তবে বর্তমানে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো দাতা সংস্থাগুলো সরাসরি বাজেট সহায়তার অর্থ সরকারের কেন্দ্রীয় ট্রেজারিতে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে দাতাদের অর্থায়নে প্রকল্পের জন্য আলাদা অ্যাকাউন্ট খোলার প্রথা দ্রুত বন্ধ করতে হবে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে বড় অংকের অর্থ অলস পড়ে থাকে অথচ মূল ট্রেজারিতে ঘাটতির কারণে সরকারকে বাইরে থেকে চড়া সুদে ঋণ করতে হয়। ফলে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা দুর্বল হচ্ছে। ধাপে ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানের লেনদেন একক ট্রেজারি হিসাবের আওতায় আনা গেলে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, নগদ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা—সব ক্ষেত্রেই উন্নতি করা সম্ভব হবে।’
সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার এ প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার গভীরতা তুলে ধরে ইনস্টটিউিট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)-এর প্রেসিডেন্ট এন কে এ মবিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন অবশ্যই সরকারের কেন্দ্রীয় নজরদারি বা ‘পাবলিক ভিউ’-র মধ্যে থাকা উচিত; এগুলো বাইরে থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এফআরসির সাম্প্রতিক উদ্যোগে দেখা গেছে,অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কোনো নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী-ই নেই, অথচ তারা বিপুল অঙ্কের লেনদেন করছে। বর্তমানে সিএজি অফিসের অধীনে তারা যে হিসাব রাখে, তা কেবল সরকারি বরাদ্দের বিপরীতে খরচের হিসাব। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সম্পদ ও দায়ের (যেমন জমি, গাড়ি, এফডিআর বা লোন) পূর্ণাঙ্গ চিত্র ব্যালান্স শিটে আসে না। তাই আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিকে বাধ্যতামূলকভাবে আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (আইএফআরএস) অনুযায়ী হিসাব প্রস্তুত করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক অডিটিং স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী তা অডিট করাতে হবে।’
একই সংকটের কথা জানিয়ে এবং আইবাস ট্র্যাকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টিএসএ বাংলাদেশে যথাযথভাবে কার্যকর হলে অর্থসচিব প্রতিদিন রিয়েল-টাইমে সরকারের আয়-ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব পাবেন। তবে এক্ষেত্রে বাধা হচ্ছে সরকারের সব লেনদেন আইবাস সিস্টেমের আওতায় না থাকা। সম্প্রতি এফআরসি যে ৩৯২টি রাষ্ট্রায়ত্ত বা এক্সট্রা-বাজেটারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করছে, সেগুলো এখনো আইবাসের বাইরে। ফলে সরকারি অর্থের এ বিশাল অংশ সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে প্রতিফলিত হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, দাতা সংস্থাগুলোর (যেমন এডিবি, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ) অর্থায়নে পরিচালিত কিছু প্রকল্প আইবাসে যুক্ত আছে, আবার কিছু প্রকল্প এর বাইরে। এতে অর্থসচিব সামগ্রিক অর্থনীতির একটি খণ্ডিত চিত্র দেখছেন। তাই দেশের অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে এ ৩৯২টি প্রতিষ্ঠান এবং সব বিদেশী প্রকল্পকে অবিলম্বে আইবাসের আওতায় বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ে আসা জরুরি।’
এ অবস্থায় সরকারি অর্থ খরচে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণের সুদ ব্যয় কমাতে গত মে মাসে অর্থ বিভাগ থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এতে সব সরকারি দপ্তরকে বাণিজ্যিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা পুরো অর্থ আবশ্যিকভাবে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কোড ব্যবহার করে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ‘টিএসএ’ অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতে বলা হয়েছে। তাছাড়া আগামী ১ জুলাই থেকে সনাতন বা ম্যানুয়াল চালান পদ্ধতি সম্পূর্ণ বন্ধ এবং বাতিল করে সরকারি রাজস্ব ও প্রাপ্তি আদায়ের ক্ষেত্রে শতভাগ ‘এ-চালান’ ব্যবস্থা কার্যকরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে দাতা সংস্থার অর্থায়ন করা প্রকল্পগুলোর আলাদা ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থ টিএসএ কাঠামোতে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে উঠে এসেছে যে এসব অ্যাকাউন্টে বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়ে থাকে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থের পরিমাণও বেশ বড়। সব মিলিয়ে বড় অংকের এ অর্থকে কেন্দ্রীয় ট্রেজারি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছে সরকার।
অর্থ বিভাগের সরকারি ঋণ ও আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ রাশেদুল আমীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কিছু অ্যাকাউন্ট এখনো একক ট্রেজারি হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে এটা ঠিক। তবে এ পুরো বিষয়টির পেছনে বেশকিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত দিক রয়েছে, যা ধাপে ধাপে সমাধান করা হচ্ছে। সরকারি নিজস্ব অফিসগুলো (মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও ফিল্ড অফিস) মূল ট্রেজারির অংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা স্থানীয় সরকার সরাসরি ট্রেজারির অংশ নয় এবং এদের অন্তর্ভুক্তিতে কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। তাই প্রথম ধাপে সরকারের নিজস্ব অফিসগুলোর অ্যাকাউন্টের ওপর ফোকাস করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে সরকারের কয়েক ধাপের উদ্যোগ প্রসঙ্গে যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ রাশেদুল আমীন বলেন, ‘সম্প্রতি অর্থ বিভাগ থেকে পরিপত্র জারি করে আগামী ১ জুলাই থেকে এ-চালানের মাধ্যমে অর্থ জমা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। সব অ্যাকাউন্টের ব্যালান্স ৩০ জুনের মধ্যে টিএসএতে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে এসব অ্যাকাউন্টের যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা যাচাই-বাছাই শেষে অপ্রয়োজনীয় অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করে দেয়া হবে। গত ১০-১৫ দিন আগে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে দাতা সংস্থাগুলোর প্রজেক্টভিত্তিক স্পেশাল অ্যাকাউন্টগুলোকে টিএসএতে আনতে হবে। এজন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) ঋণের নথিপত্রের শর্ত পরিবর্তনের জন্য দাতাদের সঙ্গে আলোচনা ও দরকষাকষির জন্য অনুরোধ জানানো হবে।’