কক্সবাজারে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আবাসন ফ্ল্যাটে চলছে হোটেল ব্যবসা

৪৬৯ ফ্ল্যাটের ৫২ শতাংশই সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও সংরক্ষিত কোটায় বরাদ্দ

কক্সবাজারে স্থানীয়দের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন সুবিধা দিতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) ২০২০ সালে ৪৬৯টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করে।

কক্সবাজারে স্থানীয়দের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন সুবিধা দিতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) ২০২০ সালে ৪৬৯টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষকে নিরাপদ ও টেকসই আবাসন সুবিধা দেয়া। তবে নির্মিত ফ্ল্যাটগুলোর ৫২ শতাংশই সরকারি কর্মকর্তা, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মচারী এবং সংরক্ষিত কোটায় বরাদ্দ দেয়া হয়। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত এসব ফ্ল্যাটের বড় অংশই এখন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিজেরা বসবাস না করে পর্যটকদের জন্য সেগুলো উচ্চমূল্যে ভাড়া দিচ্ছেন বরাদ্দপ্রাপ্তরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি অর্থে গৃহায়নের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেটি এখন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হওয়া গুরুতর অনিয়ম। একদিকে আবাসন সংকটে সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে সরকারি ফ্ল্যাটগুলো পরিণত হয়েছে ‘লাভজনক রেন্টাল ব্যবসায়’। তাই পর্যটন এলাকায় এ ধরনের প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন।

জানা গেছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কক্সবাজারে প্রায় ৩৮ একর জমিতে ২২৬টি প্লট উন্নয়নের কাজ করা হয়। সেখানে কক্সবাজারের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ফ্ল্যাট নির্মাণের একটি প্রকল্প নেয়া হয় ২০১২ সালে। ১৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আটতলাবিশিষ্ট ১০টি ভবনে ৪৬৯টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়। আবাসিক এসব ফ্ল্যাটে বসবাস না করে বেশির ভাগই বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করছেন বরাদ্দপ্রাপ্তরা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাগৃকের ১০টি ভবনের মধ্যে নয়টিই বাণিজ্যিক বা আবাসিক হোটেল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ১২০ ফ্ল্যাট মালিকের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা ওই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, নিজেরা বসবাস না করে ফ্ল্যাটগুলো আবাসিক হোটেল হিসেবে ভাড়া দিচ্ছেন বলে তাদের ১১৩ জন জানিয়েছেন। এর মধ্যে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকায় ভাড়া দিচ্ছেন ৩৭ জন, ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা ভাড়া পাচ্ছেন ৬৫ জন এবং ৩১ হাজার টাকার অধিক নিচ্ছেন ১১ জন ফ্ল্যাট মালিক।

বাস্তবে যদিও এসব ফ্ল্যাট থেকে আরো বেশি আয় আসছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাগৃকের ফ্ল্যাটগুলো বরাদ্দপ্রাপ্তদের থেকে হোটেল ব্যবসায়ীরা লিজ নিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এসব ফ্ল্যাটে একেক রাতের জন্য পর্যটকদের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হয় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। সে হিসাবে মাসে আয় হয় এক-দেড় লাখ টাকা।

কক্সবাজারের মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে এ ধরনের প্রকল্প যথাযথ নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যেসব প্রকল্প নেয়া হয় তার টার্গেট গ্রুপ সব সময় সঠিক থাকে না। পূর্বাচলে সরকার যাদের জমি বরাদ্দ দিয়েছে তারা সঠিক টার্গেট গ্রুপ ছিল না বলেই পূর্বাচলে এখনো বসতি গড়ে ওঠেনি। একইভাবে কক্সবাজারে যাদের ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তারা সঠিক টার্গেট গ্রুপ না।’

কক্সবাজারের মতো পর্যটন এলাকায় প্রতিযোগিতামূলক হারে হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসা চলমান। সেখানে সরকারি খরচে গড়া আবাসিক প্রকল্পের বাণিজ্যিক ব্যবহার নৈতিক ও প্রশাসনিক—দুইদিক থেকেই অগ্রহণযোগ্য। এমনটা উল্লেখ করে ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘কক্সবাজারের মতো পর্যটন এলাকায় জাগৃকের এ ধরনের আবাসন নির্মাণ করাটাও ফিজিবল ছিল না। কেননা এখানে যিনিই ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাবেন তিনি বাজারের কারণেই এটাকে উচ্চমূল্যে ভাড়া দিয়ে নিজে দূরে কোথাও গিয়ে থাকবেন। যেমন কেউ এখানে ফ্ল্যাট পাওয়ার পর দেখল এটা দৈনিক ৩ থেকে ৫ হাজার টাকায় ভাড়া দেয়া যাচ্ছে। তিনি এটাকে ভাড়া দিয়ে অন্য কোথাও মাসে ১০ হাজার টাকায় ভাড়া বাসায় থাকবেন। তার মানে এখানে এ প্রকল্প নেয়াই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রীয় অপচয়ও বটে। এ প্রকল্পের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল সবাইকে দুর্নীতির দায়ে শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।’

জাগৃক সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের আওতায় ৪৯০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে করা হয় ৪৬৯টি। এর মধ্যে ৫৫৯ বর্গফুট আয়তনের ৮৪টি, ৬০৫ বর্গফুট আয়তনের ১৪টি, ৬৭০ বর্গফুটের ১৪টি, ৯২০ বর্গফুট আয়তনের ৭৭টি, ৯৪৪ বর্গফুট আয়তনের ৯৮টি, ৯৫০ বর্গফুট আয়তনের ৬৩টি, ৯৭০ বর্গফুট আয়তনের ১৪টি, ১০২১ বর্গফুট আয়তনের ৪২টি, ১ হাজার ৩০ বর্গফুট আয়তনের ২৮টি, ১ হাজার ৫৫ বর্গফুটের ১৪টি ও ১ হাজার ৫৬ বর্গফুটের ২১টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।

আবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্থানীয় বসবাসকারীদের গুরুত্ব দেয়ার কথা। কিন্তু জাগৃকের ৪৬৯টি ফ্ল্যাটের মধ্যে কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে কেবল ৫৪ জন বরাদ্দ পেয়েছেন। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাওয়াদের মধ্যে আছেন চট্টগ্রামের ১১৯ জন, ঢাকার ৬৬ জন ও পাবনার ১৪৮ জন। এভাবে ৫০টি জেলার নাগরিক ফ্ল্যাটগুলো বরাদ্দ পেয়েছেন। যদিও এখন প্রায় সবই বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে বলে জানা গেছে।

কক্সবাজারে নির্মিত ৪৬৯টি ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ৫২ শতাংশই দেয়া হয়েছে বিভিন্ন কোটায়। এসব কোটার মধ্যে ১৮ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। তবে সবচেয়ে বেশি ২০ শতাংশ কোটা রাখা হয় সংরক্ষিত হিসেবে। এতে কারো আবেদনের সুযোগ নেই, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এ কোটায় বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়া আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৮ শতাংশ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিরতদের জন্য ৮, প্রবাসীদের জন্য ৭, মুক্তিযোদ্ধা ৪, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী ৮, মন্ত্রণালয় ও জাগৃকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৬, বিশেষ পেশা ৪ এবং অন্যান্য কোটায় ৮ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কোটা রাখা হয় একেবারেই নগণ্য, মাত্র ৪ শতাংশ। যদিও প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্তরা সে বরাদ্দ পায়নি বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

জাগৃকের আবাসিক ফ্ল্যাটে এভাবে বাণিজ্যিক ব্যবহার নতুন চিত্র নয় উল্লেখ করে স্থপতি ইকবাল হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভাসানটেকে নিম্নবিত্তদের পুনর্বাসনের কথা বলে ফ্ল্যাট নির্মাণের মাধ্যমে এ ধরনের দুর্বৃত্তায়ন শুরু হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সে ফ্ল্যাটগুলো ধনীরা বাগিয়ে নেন। দেশে সবচেয়ে বেশি আবাসন সংকট ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে। সেখানে এখন পর্যন্ত জাগৃক কোনো ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। সরকারি এ সংস্থার মূল কাজ হলো নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের আবাসনের সমস্যা নিয়ে কাজ করা। কিন্তু তারা ফ্ল্যাট বানাচ্ছে হাজার কিলোমিটার দূরে। এগুলো রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি এবং জনগণের সঙ্গে স্রেফ প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা এ ধরনের জনবিরোধী অর্থের অপচয় করা প্রকল্পগুলো ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে এর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের শাস্তি দাবি করি। পাশাপাশি যারা ফ্ল্যাট নিয়ে ব্যবসা করছেন, তাদের বরাদ্দ বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।’

ফ্ল্যাটের মূল্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫৫৯ বর্গফুটের প্রতি ফ্ল্যাটের মূল্য ধরা হয় ৩৫ লাখ টাকা, ৬০৫ বর্গফুটের ৩৮ লাখ, ৬৭০ বর্গফুটের ৪২ লাখ, ৯২০ বর্গফুটের ৫৮ লাখ, ৯৪৪ বর্গফুটের ৫৯ লাখ, ৯৫০ বর্গফুটের ৬০ লাখ, ৯৭০ বর্গফুটের ৬১ লাখ টাকা। আর ১ হাজার ২১ বর্গফুটের ৬৪ লাখ, ১ হাজার ৩০ বর্গফুটের ৬৫ লাখ, ১ হাজার ৫৫ বর্গফুটের ৬৬ লাখ ও ১ হাজার ৫৬ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের মূল্য ৬৬ লাখ টাকা ধরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে জাগৃকের সচিব মনদীপ ঘরাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি উপপরিচালক বশির গাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে বশির গাজীকে ফোন দিলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি আপনার মাধ্যমে জেনেছি। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) আমার ঊর্ধ্বতনকে জানানো হবে। তাছাড়া আমাদের ফ্ল্যাট কেউ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহার করে সেক্ষেত্রে তাকে নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করতে হয়। সেখানে ফ্ল্যাটপ্রাপ্তরা ফি পরিশোধ করেছে কিনা সেটাও যাচাই করা হবে।’

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার কক্সবাজার প্রতিনিধি

আরও