ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার আজিজুর রহমান স্ত্রী নাসরিন বেগম ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন রাজধানীর মগবাজারে। রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন তা দিয়ে গাড়ির জমা, বাসা ভাড়া ও সংসারের অন্যান্য খরচ মেটাতে হয়। চার বছর বয়সী ছেলের পছন্দ ব্রয়লার মুরগি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে সে খাবারও পরিবারের নিয়মিত তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। মাছ, ডিম ও মাংসের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারও এখন তাদের নাগালের বাইরে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গতকাল বিকালে বাজার করতে এসেছিলেন আজিজুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ভাড়ায় রিকশা চালাই। দিন শেষে গাড়ির জমার টাকা দিতে হয়। বাসা ভাড়াও আছে। কিছুদিন ধরে বিভিন্ন সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা পুলিশ ধরছে। এতে আয় কমেছে। অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। আগে তিনবেলার মধ্যে অন্তত একবেলা মাছ বা ডিম থাকতই। এখন সেসব খাবারের অভ্যাস বদলাতে হচ্ছে। বাচ্চাদের খাওয়াতে গিয়ে আমরা স্বামী-স্ত্রী মাছ, মাংস ও ডিম খাওয়া কমিয়েছি, বলা যায় বাদই দিয়েছি। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছি না।’
আজিজুরের মতো নিম্ন আয়ের বহু পরিবারের খাদ্যতালিকায়ও একই ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় তুলনামূলক সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় পাঙাশ, তেলাপিয়া, ব্রয়লার মুরগি ও ফার্মের ডিম ছিল নিম্ন আয়ের মানুষের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস। এখন এসব পণ্যের দামও তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে সংসারের ব্যয় সামলাতে অনেক পরিবার মাছ, ডিম ও মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাশাপাশি গতকাল আরো বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, ফার্মের লাল ডিম প্রতি ডজন ১৪৫-১৫০ ও খুচরা দোকানে প্রতি হালি ৫০-৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৯০-২১০, তেলাপিয়া ২২০-৩০০, ছোট পাঙাশ ২০০-২৪০ ও বড় পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩৫০ টাকা পর্যন্ত।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবেও এসব পণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে গতকাল তেলাপিয়ার কেজি ১৯০-২৫০ টাকা, ফার্মের লাল ডিমের হালি ৪৮-৫০, ছোট পাঙাশ ১৯০-২১০ ও ব্রয়লার মুরগি ১৮০-১৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
অধিদপ্তরের জাতীয় বাজারদরের তালিকা বিশ্লেষণেও দেখা যায়, আগস্টে সারা দেশে ছোট পাঙাশের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৮৩ ও বড় পাঙাশ ২৫১ টাকা। জুলাইয়ে ছোট পাঙাশের গড় দাম ছিল ১৮১ ও বড় পাঙাশ ২৫০ টাকা। জুনে এ দুটি মাছের গড় দাম ছিল যথাক্রমে ১৭৮ ও ২৪৭ টাকা।
ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রেও আগস্টে জাতীয় গড় দাম দাঁড়িয়েছে কেজিপ্রতি ১৮৪ টাকা, যা জুলাইয়ে ছিল ১৭৫ টাকা। সে তুলনায় কেজিতে দাম বেড়েছে ৯ টাকা। জুনে এর গড় দাম ছিল ১৬৭ টাকা। ফার্মের লাল ডিমের আগস্টের জাতীয় গড় দাম ছিল প্রতি হালি ৪৮ টাকা, যা জুলাইয়ের তুলনায় ৫ টাকা বেশি। জুনে এর গড় দাম ছিল ৪২ টাকা।
তেলাপিয়ার দামও সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। আগস্টে সারা দেশে এর গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ২০৬ টাকা, জুলাইয়ে ২০২ এবং জুন ও মে মাসে ১৯৯ টাকা। একইভাবে সিলভার কার্পের গড় দাম আগস্টে ২১০ টাকা, জুলাইয়ে ২০৮ ও জুনে ২০৫ টাকা ছিল।
ভাটারা বাজারে বাজার করতে আসা আকতার হোসেন বলেন, ‘মাছ, মুরগি, ডিম—সবই নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আগে ছোট মাছ ও তেলাপিয়া-পাঙাশের ওপর ভরসা করা যেত। এখন সেগুলোর দামও বাড়ছে। একটি ফার্মের ডিম কিনতেই ১৩ টাকা লাগে। গরু-খাসি কেনা সম্ভব নয়, তাই ব্রয়লার দিয়ে মাংসের চাহিদা মেটাতাম। এখন সেটিও ২০০ টাকার ওপরে কিনতে হচ্ছে।’
নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্রব্যমূল্য বাড়লেও তাদের আয় একই হারে বাড়েনি। ফলে খাদ্য ব্যয় কমাতে গিয়ে অনেকে মাছ, ডিম ও মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। এতে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন পুষ্টিবিদরা।
পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিকস বিভাগের প্রধান ডা. নিশাত শারমিন নিশি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাঙাশ বা যেকোনো মাছ প্রোটিনের বড় উৎস। প্রোটিন শরীরের বৃদ্ধি ও গঠনে সহায়তা করে, ক্ষত সারায়, পেশি শক্তিশালী রাখে, হরমোন তৈরি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। পাঙাশের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এতে ফসফরাস ও পটাশিয়ামও রয়েছে। ফলে এ মাছের দাম বেড়ে গেলে মানুষের প্রোটিন গ্রহণ কমে যেতে পারে, যা স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।’