পাট উৎপাদনে দীর্ঘদিনের সুনাম রয়েছে রাজবাড়ীর। একসময় জেলার বিস্তীর্ণ জমিতে পাটের আবাদ হলেও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় মাঝে চাষীদের আগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়ে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভালো দাম পাওয়ায় আবারো পাট চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন তারা। চলতি বছর জেলায় গত বছরের তুলনায় ৫০৪ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। কৃষি উপকরণ, সার ও কীটনাশকের বাড়তি দামের মধ্যেও ভালো বাজারদরের আশায় পাট ঘিরে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে জেলার চাষীদের মধ্যে।
চাষীদের দাবি, অন্তত গত এক দশকে ভরা মৌসুমে পাটের এমন দাম পাননি তারা। উৎপাদন খরচ মিটিয়ে এবার লাভের মুখ দেখায় দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখছেন তারা। তবে ভালো দাম পাওয়ার এ স্বস্তির মধ্যেও তাদের শঙ্কা কাটেনি বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজবাড়ীর তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৯ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ করে উৎপাদন হয় ১ লাখ ৮ হাজার ৭৯৩ টন পাট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজবাড়ীতে ৪৬ হাজার ১৫৮ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ১০ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ২৭৬ হেক্টর জমিতে আবাদ করে উৎপাদন হয় ৯৯ হাজার ৫৪৪ টন। সর্বশেষ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলায় ৪৭ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৫০৭ টন। চলতি বছর জেলার দুই হাজার পাটচাষীকে প্রণোদনা হিসেবে জনপ্রতি এক কেজি পাটবীজ, পাঁচ কেজি ডিএপি ও পাঁচ কেজি এমওপি সার দেয়া হয়েছে।
রাজবাড়ীর খানখানাপুরের পাটের আড়ত ঘুরে দেখা যায়, ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। বাজারে পাটের রঙ, আঁশের মান ও আকারভেদে প্রতি মণ ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খানখানাপুর এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে এক বিঘা (৩৪ শতাংশ) জমিতে পাট চাষ করতে কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এক বিঘা জমিতে অন্তত ৭ মণ পাট উৎপাদন হয়। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী তা প্রায় ২৮ হাজার টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। সে হিসাবে পাট চাষে বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ লাভ হচ্ছে। এ কারণেই কৃষকরা আবার পাট চাষে ফিরছেন।’
কৃষক ইব্রাহিম মোল্লা জানান, এক বিঘা জমিতে পাট আবাদে প্রতি বছর ১২-১৩ হাজার টাকা খরচ হলেও এ বছর বাড়তি সেচ দিতে হয়েছে। এ কারণে খরচ বেড়ে বিঘাপ্রতি ১৫-১৬ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে বাজারে দাম ভালো থাকায় কৃষকরা লাভের মুখ দেখছেন।
কৃষক নিতাই চন্দ্র রায় বলেন, ‘রাজবাড়ীতে বর্তমানে প্রধানত তিন জাতের পাটের আবাদ হয়—বিজেআরআই-৯, বিজেআরআই-৮ ও জেআরও-৫২৪। এর মধ্যে বিজেআরআই-৯ জাতের পাটে কৃষকের লাভ বেশি। মাত্র ১১০ দিনের মধ্যে এ জাতের পাট কাটা সম্ভব। গাছ লম্বা ও পাটের রঙ সোনালি হওয়ায় এর চাহিদা ও দামও বেশি। অন্যদিকে বিজেআরআই-৮ জাতের পাট কাটতে অন্তত ১৩৪ দিন লাগে। এ জাতের পাট চাষ করলে রোপা আমন আবাদে পিছিয়ে যেতে হয়। আর জেআরও-৫২৪ ভারতীয় জাতের বীজ। এর উৎপাদন মোটামুটি হওয়ায় চাষীদের পছন্দের ক্ষেত্রে এটি তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজবাড়ীর উপপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেসব জেলায় রোদ ও বৃষ্টি দুটোই অনুকূলে থাকে, সেসব জেলায় পাটের ফলন ভালো হয়। রাজবাড়ীর মাটিও পাট চাষের উপযোগী।’
তিনি আরো বলেন, ‘পাটের আবাদ বাড়া-কমা অনেকটাই বাজারদরের ওপর নির্ভর করে। যে বছর দাম ভালো থাকে, পরের মৌসুমে কৃষকরা পাট চাষে বেশি আগ্রহী হন। রাজবাড়ীতে দুই বছর আগে পাটের আবাদ কমলেও ভালো দাম পাওয়ায় আবার বেড়েছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত কৃষকদের খোঁজখবর নিচ্ছেন।