তীব্র শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন। তবে বাংলাদেশে এরচেয়েও বেশি শীত পড়ার রেকর্ড রয়েছে। একাধিকবার দেশের তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নীচে নেমেছিল।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৪ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলের তাপমাত্রা ছিল সর্বনিম্ন, তিন দশমিক তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। চার বছরের মাথায় শ্রীমঙ্গলের তাপমাত্রার পারদ আরো নীচে নামে। ১৯৬৮ সালের চৌঠা ফেব্রুয়ারি সেখানকার তাপমাত্রা রেকর্ড হয় দুই দশমিক আট ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এর ঠিক ৫০ বছর পর, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসের শীত সব রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়। সে বছর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় দুই দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস। ইতিহাসে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম তাপমাত্রা।
ওই একই বছর রংপুর বিভাগের সৈয়দপুরের তাপমাত্রাও রেকর্ড ভেঙ্গেছিল, এটি গিয়ে ঠেকেছিল দুই দশমিক নয় ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ২০১৮ সালে উত্তরাঞ্চলের জেলা নীলফামারীর ডিমলা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও দিনাজপুরের তাপমাত্রা ছিল তিনের ঘরে। সেগুলো হলো যথাক্রমে– তিন, তিন দশমিক এক ও তিন দশমিক দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এর আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। সেসময় রংপুর, দিনাজপুর ও সৈয়দপুরের তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে তিন দশমিক পাঁচ, তিন দশমিক দুই ও তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। তালিকায় আছে রাজশাহীও। ২০০৩ সালে সেখানকার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় তিন দশমিক চার ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া সর্বনিম্ন তাপমাত্রার মাঝে অন্যতম।
উত্তরাঞ্চলেই কেন বেশি শীত?
সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড বলছে, শীতকালে উত্তরাঞ্চলের তাপমাত্রাই সবসময় সবচেয়ে কম থাকে। এর কারণ, শৈত্যপ্রবাহ বা তাপদাহের প্রবেশদ্বার হলো বাংলাদেশের এ অঞ্চল।
শীতকালে উত্তর ভারতের দিল্লি-কাশ্মীর অঞ্চল খুব ঠান্ডা থাকে। আর পৃথিবীর স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহের নিয়ম অনুযায়ী বাতাস পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে যায়। অর্থাৎ, ভারতের দিল্লি, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া বেল্ট ধরে তা বাংলাদেশে ঢোকে।
আর এই বাতাসের পথে উত্তরাঞ্চল প্রথম পড়ে বলেই সেখানে এত বেশি ঠান্ডা লাগে।
পাশাপাশি, উত্তরাঞ্চলে ঘন কুয়াশা বেশি হয়, যা সূর্যের আলোকে ভূপৃষ্ঠে ঢুকতে দেয় না। ফলে দিনের বেলাতেও সেখানকার তাপমাত্রা কম থাকে। আবার, উত্তরাঞ্চলে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ থাকায় রাতে তাপ দ্রুত বের হয়ে যায়, তাই সেখানে তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হয়।
ওই বছরগুলোয় তাপমাত্রা সর্বনিম্ন হওয়ার কারণ
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, ওই বছরগুলোয় শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। যেমন, টানা কয়েক দিনের কুয়াশা, শক্তিশালী শৈত্যপ্রবাহ, দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কিংবা রাতের পরিষ্কার আকাশ।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ জানান, অনেকসময় বাতাসের স্তর বদলে উপরে থাকা জেট উইন্ড বা শক্তিশালী বাতাস নীচে নেমে আসে বা কুয়াশা কেটে যায়। যেখানে এটি ঘটে, সে জায়গার কুয়াশা সরে যায় ও (ভূমির তাপ দ্রুত ওপরে উঠে) তাপমাত্রা কমে। তবে এটা ব্যতিক্রম। ওই বছরগুলোতেও হয়তো এমন কিছু হয়েছিল।
তীব্র শীতের অনুভূতির মূল কারণ কুয়াশা?
বাংলাদেশে শীতের তীব্র অনুভূতির জন্য মূলত ভারী কুয়াশাকেই দায়ী করছেন আবহাওয়াবিদরা। কারণ কুয়াশা যখন দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকে, তখন সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছায় না, ফলে মাটি গরম হতে পারে না। এ কারণে শীত বেশি অনুভূত হয়।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম বলেন, কুয়াশা কেটে গেলে ঠান্ডার অনুভূতি কমে। আর কুয়াশা কাটার প্রধান উপায় হলো বৃষ্টি হওয়া এবং বাতাসের গতিবেগ বাড়া। বাতাসের গতি ঘণ্টায় আট থেকে ১৫ কিলোমিটারের বেশি হলে কুয়াশা কেটে যায়।
তবে বাতাসের গতিবেগ বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য বঙ্গোপসাগরে একটি উচ্চচাপ বলয় তৈরি হওয়া এবং সেইসাথে লোকালাইজড ওয়েস্টার্লি ডিসটার্বেন্সের বর্ধিতাংশ থাকা দরকার বলেও জানান তিনি।
শীত বেশি লাগার আরেকটি কারণ হলো দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়া। আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থা প্রচুর বেড়েছে। আগে এরকম ছিল না। গত ২৯শে ডিসেম্বর দিন রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য এক দশমিক সাত ছিল, আমি গত ২০ বছরেও এমনটা দেখিনি। আর এই ঘটনা শুধু এবার না, প্রতিবছর হচ্ছে।