পারিবারিক কলহ ও বেকারত্ব

গাজীপুরে দেড় বছরে আত্মহত্যায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় হাজার জন

২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ উপজেলায় আত্মহত্যার ঘটনা ছিল ২২৫টি ও মহানগরী এলাকায় ৩৯৬টি। প্রতি মাসে ৪৭টিরও বেশি আত্মহত্যার ঘটনায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে মানুষের মনে।

রাজধানীর পাশে গাজীপুরে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ২০ মাসে গাজীপুর জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন থানায় মোট ৯৫১টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ফলে মানুষের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সামাজিক অবক্ষয়, দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহ, বেকারত্ব, প্রেম-ভালোবাসা ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এসব আত্মহত্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক সহিংসতা কমিয়ে এনে মানসিক রোগের প্রতি সচেতন হলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমে আসবে।

গাজীপুরে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও আত্মহত্যার খবর পাওয়া যাচ্ছে। গলায় ফাঁস, বিষপান, রেললাইন ও নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নারী, পুরুষ বা তরুণ-তরুণীরা আত্মহত্যা করছেন।

গত ২০ মাসে জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় ৯৫১টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে জেলার পাঁচটি উপজেলায় আত্মহত্যার ঘটনায় মোট ২৫৯টি মামলা হয়েছে। অন্যদিকে গাজীপুর মহানগর এলাকায় ২৯৬টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট থানাগুলো।

২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ উপজেলায় আত্মহত্যার ঘটনা ছিল ২২৫টি ও মহানগরী এলাকায় ৩৯৬টি। প্রতি মাসে ৪৭টিরও বেশি আত্মহত্যার ঘটনায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে মানুষের মনে।

জেলার বিভিন্ন থানার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কাপাসিয়া উপজেলায় ২০২৫ সালে ৩৯টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ২৫টি আত্মহত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। শ্রীপুর উপজেলায় ২০২৫ সালে ৭১টি ও ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৮১টি, কালিগঞ্জ উপজেলায় ২০২৫ সালে ৫২টি ও ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩৯টি, সদর উপজেলায় (জয়দেবপুর থানা) ২০২৫ সালে ৩৯টি ও ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৩১টি এবং কালিয়াকৈর উপজেলায় ২০২৫ সালে ৫৮টি ও ২০২৬ সালে ৪৯টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাঁচ উপজেলায় মোট আত্মহত্যা করেছে ২৫৯ জন ও ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ২২৫ জন।

অন্যদিকে গাজীপুর মহানগরের দক্ষিণ ও উত্তর বিভাগে ২০২৫ সালে মোট আত্মহত্যার সংখ্যা ২৯৬ ও ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৭১। সব মিলিয়ে পুরো জেলায় গত ২০ মাসে মোট ৯৫১টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. বেলায়েত হোসেন জানান, এলাকায় আত্মহত্যা, বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর পেছনে পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, হতাশা, কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির মতো নানা কারণ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে গাজীপুরে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসকারী দম্পতিদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির অমিল পারিবারিক দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে দেয়। তিনি আরো জানান, আত্মহত্যার গভীর কারণ অনুসন্ধান করে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। গৃহস্থালি সহিংসতা বা যেকোনো ছোট সমস্যা শুরুতেই সমাধানের উদ্যোগ নিলে এ প্রবণতা রোধ করা সম্ভব।

অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার, পারিবারিক জটিলতা থেকে মানসিক চাপকেও আত্মহত্যার জন্য দায়ী করছেন চিকিৎসকরা। সামাজিক যোগাযোগের কারণে পরকীয়াও বাড়ছে দিন দিন। এটাও আত্মহত্যার অন্যতম কারণ।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের পরিচালক চিকিৎসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে প্রায় ১০ লাখ লোক আত্মহত্যা করে। গাজীপুরে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে, এখানে প্রচুর বহিরাগত মানুষ বাস করে। আত্মহত্যার প্রবণতা যাদের মধ্যে আছে, তাদের মধ্যে ইমিগ্র্যান্টের সংখ্যাই বেশি থাকে। কারণ তারা সামাজিকভাবে ও রকম সাপোর্ট পান না। তারা নিজেদের যেকোনো ক্রাইসিসে অসহায় বোধ করেন।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারীর চেয়ে পুরুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তিন-চার গুণ। কারণ পুরুষদের সংসার টানতে হয়, পারিবারিক দায়টা পুরুষকেই বহন করতে হয়।’

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু মানুষ আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো ভাবনাচিন্তা না করেই আত্মহত্যা করে ফেলতে পারে। আত্মহত্যার প্রবণতা বন্ধে পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় ও বেকারত্ব দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (ঢাকা) সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. জুবায়ের মিয়া (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) বলেন, ‘গাজীপুরে ইদানীং বা এ বছর আত্মহত্যার হার অনেক বেড়ে গেছে। আত্মহত্যা মানুষ কেন করে বা কোন পর্যায়ে গেলে করে, এ বিষয়ে সর্বজনীনভাবে আমরা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে জানি, একটা মানুষ হঠাৎ করেই আত্মহত্যা করে। অর্থাৎ আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো ভাবনাচিন্তা না করেই আত্মহত্যা করে ফেলতে পারে। আরেক ধরনের মানুষ আত্মহত্যা করে, যারা দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে প্ল্যান করে আত্মহত্যা করে।’

তিনি বলেন, ‘গাজীপুরে আত্মহত্যার যে ঘটনাগুলো ফরেনসিক রিপোর্ট ও তদন্তে উঠে এসেছে, তার মধ্যে পারিবারিক কলহ অন্যতম। এছাড়া যৌতুক, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সন্দেহ বা সহিংসতা, বেকারত্ব, হতাশাও রয়েছে।’

এটি কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়—প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী হওয়ার জন্য বেকারত্ব দূর করতে হবে। এটা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, ভালোবাসাকে বাড়িয়ে তুলতে হবে। আজকাল আমরা একজন আরেকজনের ভালো দিকটা দেখতে পাই না। কেউ যদি উন্নতি করে, আমরা তার প্রতি রাগান্বিত হই বা হিংসাত্মক মনোভাব প্রকাশ করি। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

আরও