কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৪) ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে (৩৮) চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত ছাত্রীর ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেফতার করা হয়।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১১টায় কুমিল্লা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পংকজ বড়ুয়া।
পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশ থেকে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের খবর পায় তারা। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ আসা ফোনকলের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে নিহতের বাবা এসে মরদেহ শনাক্ত করেন। নিহতের নাম জান্নাতুল তাজমিন। এ ঘটনায় লালমাই থানায় হত্যা মামলা হয়। এরপর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও থানা পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য সূত্রের সহায়তায় সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযুক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে (৩৮) চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সুমনের অটোরিকশা ভাড়া করেন তাজমিন। ভাড়া ঠিক হয় ৩০০ টাকা। পথে চালককে ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনেন তিনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসায় পৌঁছে দেয়ার কথা বলে সুমন অটোরিকশাটি নির্ধারিত পথ থেকে সরিয়ে নেন। চাঁদপুরগামী সড়ক দিয়ে বিজরা বাজার হয়ে লালমাইয়ের একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যান তাজমিনকে। সেখানে অটোরিকশা থামালে জায়গাটি অপরিচিত মনে হয় তার। এ সময় আতঙ্কিত হয়ে তাজমিন গাড়ি থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সুমন তাকে বাধা দেন।
পুলিশ জানায়, তাজমিন চিৎকার করলে সুমন তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাজমিন দুর্বল হয়ে পড়েন। তখন তাকে ধানক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন সুমন। পরে ধানক্ষেতের মাটিতে মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধে তাজমিনের মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন সুমন মিয়া।
হত্যার পর তাজমিনের হাতব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে দেন সুমন। এরপর ঘটনাস্থলে নিজের অটোরিকশা ফেলে কাচিকাটা মসজিদের সামনে একটি পুকুরে গোসল করেন। পরে ভাড়ায় চালিত অন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাখরাবাদ এলাকায় যান। সেখানে একটি পুকুরপাড়ের ঝোপে আইফোনটি লুকিয়ে রেখে সুমন চট্টগ্রামে চলে যান।
গত শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে সিএনজিচালক সুমনকে গ্রেফতারের পর তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাখরাবাদ এলাকার ওই পুকুরপাড়ের ঝোপ থেকে তাজমিনের আইফোন উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। তার বাবা রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাজমিন কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, চার দিন আগে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। পরে তার কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নামেন। এরপর বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশা ভাড়া করতে গিয়ে এ ঘটনার শিকার হন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পংকজ বড়ুয়া বলেন, তাজমিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সাধারণ ডায়েরি করা হয়নি। তিনি কেন বা কার সঙ্গে কক্সবাজার গিয়েছিলেন, তা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানা যাবে। এ ঘটনায় আরো কেউ জড়িত কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।