নোয়াখালীতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বেশির ভাগ সড়কের অবস্থা বেহাল। খানাখন্দে পরিণত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব সড়ক। খানাখন্দে বৃষ্টির পানি জমে এসব সড়ক মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগ নিয়েই সড়কে যাতায়াত করছেন যানবাহন চালক ও পথচারীরা।
এসব সড়কের মধ্যে নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদী থেকে কালামিয়ার পোল পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার পুরোপুরি যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ সড়কে চলমান অবস্থায় যানবাহনের ঝাঁকুনিতে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে যাত্রী, আর বিকল হচ্ছে যানবাহন। কর্তৃপক্ষ বলছে, চলতি অর্থবছরে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর উন্নয়নে হাত দেয়া হবে।
সড়কটিতে যাতায়াতকারী ভুক্তভোগীরা বলছেন, চার বছরের বেশি সময় ধরে কালামিয়ার পোল পর্যন্ত এ সড়টিতে খানাখন্দ হয়ে আছে। মেরামত না করায় সৃষ্টি হওয়া বড় বড় গর্তে পানি জমে দুর্ভোগের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে নোয়াখালী সদরের পূর্বাঞ্চল, কবিরহাট, কোম্পানীগঞ্জ ও বেগমগঞ্জ উপজেলার লাখো মানুষের কষ্টের শেষ নেই।
শামিমা আর্জু নামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক জানান, পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি জেলা শহর মাইজদী থেকে নেয়াজপুর যাতায়াত করছেন। কিন্তু গত দুই বছরে তাকে অন্তত ১০ বারের বেশি সময় চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়েছে। এমনিতে তার অ্যাজমার সমস্য রয়েছে, তার ওপর প্রতিদিন যানবাহনের ঝাঁকুনিতে বুকে আঘাত লাগে। এতে তিনি প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন।
আদর্শ স্কুলসংলগ্ন দোকানি নজরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন সড়কটি বেহাল। মাঝে মাঝে এলজিইডি থেকে লোকজন এসে ভেঙে ফেলা ভবনের অংশ ফেলে যায়। কিন্তু দেখা যায় সেটা আরো বেশি সমস্যায় ফেলে যানবাহন ও যাত্রীদের। এসব গর্তে পড়ে অনেকে আহত হয়েছেন। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা প্রায়ই বিকল হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শুধু মাইজদী কালামিয়ার পোল সড়কটি নয়। প্রায় একই অবস্থা সুবর্ণচরের ভূঞারহাট-চরক্লার্ক সড়ক, মঞ্জু চেয়ারম্যান বাজার থেকে হাতিয়া ভূমিহীন বাজার ও টাংকির বাজার সড়কেরও। যানবাহন চালকরা বলছেন, এ সড়কগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় মানুষের যাতায়াত বেশি। ফলে যানবাহন প্রায়ই বিকল হলেও বাধ্য হয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে চালকদের।
ভূঞারহাট থেকে করিম বাজার পর্যন্ত সড়কটিতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে নিশান। তিনি জানান, গত তিন বছর পর্যন্ত এ সড়কটি ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। প্রতিদিন যা আয় করেন, মাঝে মাঝে তার থেকে বেশি চলে যায় অটোরিকশা মেরামত করতে। তার মতে, শুধু তার অটোরিকশাই বিকল হচ্ছে তা নয়, নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েন মাঝে মাঝে। এ সড়কের যানবাহনে চড়লে ঝাঁকুনিতে যাত্রীরাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেকে রিকশার ঝাঁকুনি থেকে বাঁচতে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার সড়ক হেঁটেও যাতায়াত করেন।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, তারা মাঝে মাঝে হাতিয়ার টাংকির ঘাট এলাকায় ঘুরতে আসেন। এখানে নদী ও আশপাশের প্রকৃতি তাদের ভালো লাগে। কিন্তু প্রধান সড়ক থেকে টাংকির ঘাট পর্যন্ত এত বেশি পরিমাণে গর্ত তৈরি হয়েছে, যেখানে ১৫ মিনিটে ঘাট এলাকায় পৌঁছার কথা সেখানে লাগছে দ্বিগুণেরও বেশি সময়। তাও কয়েকবার গাড়ি থেকে নেমে যেতে হয়। না হয় গর্তে পড়ে গাড়ির নিচের অংশ সড়কে লেগে যায়। সড়কটি সংস্কারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা।
এদিকে জেলার গ্রামীণ ও উপজেলাভিত্তিক প্রধান সড়কগুলোর অবস্থা আরো বেহাল। ভুক্তভোগীদের মতে, সড়ক নির্মাণকালীন নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রকৌশলীদের যথাযথ তদারকি না থাকার কারণে মনগড়া কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যে এসব সড়ক বেহাল হচ্ছে। এতে প্রতি বছর জলে যাচ্ছে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা। সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে টেকসই হচ্ছে না উন্নয়ন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি রোধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদারকি বাড়ানোর দাবি বিশিষ্টজনদের।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জেলার প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার পাকা সড়ক রয়েছে। যার মধ্যে আড়াই হাজার কিলোমিটারই সংস্কার উপযোগী। এসব সড়কের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নোয়াখালী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী একরামুল হক সড়কগুলোর বেহাল দশার কথা স্বীকার করে বলেন, শুধু নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের কারণে সড়ক নষ্ট হচ্ছে তা নয়, এসব সড়কে অতিরিক্ত পরিমাণে গাড়ি চলছে। যার কারণেও সড়ক নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া বৃষ্টির পানি জমে থাকার কারণে বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণেও অনেক জায়গায় সড়ক দ্রুত হচ্ছে। তিনি জানান, প্রত্যেকটি সড়ক সংস্কারে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ও আগামী অর্থবছরে জেলার বেশির ভাগ সড়কই মেরামত করা হবে।