জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে স্বজনতোষণ প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। রেন্ট সিকিং বা কারসাজি করে সম্পদ বাড়ানো সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে, দুর্নীতি সর্বব্যাপক। এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিপক্ব পুঁজিবাদের উপযোগী ব্যাংক নৈতিকতা কার্যকর হবে—এমন চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়।’
শনিবার রাতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতা’ শীর্ষক ২৩তম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। রাজধানীর বিআইবিএম মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম।
বাংলাদেশে পরিপক্ব পুঁজিবাদ গড়ে ওঠেনি উল্লেখ করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘দেশে পুঁজিবাদের যে স্তর বিদ্যমান, সেখানে নৈতিকতাবর্জিত কর্মকাণ্ডই প্রাধান্য পাচ্ছে। আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন সম্ভব হলেই কেবল ব্যাংক নৈতিকতার ধারণাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান সে ধরনের একটি সুযোগ এনে দিয়েছিল। তবে তা কতটুকু কাজে লাগানো গেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘দেশের ব্যাংক খাতে কিছু মৌলিক কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের দিকে চলে গেছে। এ কাঠামোগত সমস্যা দূর করার চেষ্টা চলছে।’
দুটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সংকটে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও পুঁজিবাজারের লোকসহ তাদের নিয়ে বসা হয়েছে। তাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অংশ পর্যায়ক্রমে পুঁজিবাজারে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’
গভর্নর আরো বলেন, ‘অনেকের ধারণা গণ-অভ্যুত্থানে পরে লোক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু কার্যক্রম আগের মতোই থাকবে। শুধু লোক পরিবর্তন হলে হবে না, কাজেরও পরিবর্তন আনতে হবে—এ বার্তাও দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে এক্সিট পলিসিও নতুন করে দেয়া হয়েছে।’
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ১৮ মাসের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে জানিয়ে মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘এনপিএল কমানোর জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির দিকে যাওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে পারস্পরিকভাবে নিষ্পত্তির মাধ্যমে এনপিএল কমানো হবে। এছাড়া ডিস্ট্রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন করা হচ্ছে এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করা হচ্ছে, যাতে ছয় মাসের মধ্যেই আদালত থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে। এ দুটি আইন আগামী বছর থেকে প্রয়োগ করা যাবে।’
ঋণের অর্থ যাতে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত না হয়, সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান গভর্নর। তিনি বলেন, ‘ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেয়া বন্ধ করতে ঋণ ইউটিলাইজেশন অডিটের কথা চিন্তা করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি ঋণের ক্ষেত্রে অডিট করা হবে।’
দেশে বেশকিছু স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও এগুলোর ব্যবহার হচ্ছে না বলেও জানান মোস্তাকুর রহমান। এর প্রধান কারণ যাদের এসব সুবিধা পাওয়া উচিত, তারা এ ধরনের প্যাকেজ রয়েছে—এ তথ্যই জানেন না।
স্বাগত বক্তব্যে বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংকিং ব্যবসা অন্য অনেক ব্যবসার তুলনায় ভিন্ন। কারণ ব্যাংক জনগণের আমানতের অর্থ ব্যবস্থাপনা করে এবং সেই অর্থ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রবাহিত করে। তাই একজন ব্যাংকারের সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু একটি ব্যাংক বা একজন গ্রাহকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে।’
তিনি আরো বলেন, ‘নৈতিকতার ঘাটতি থেকেই অনেক সময় অনিয়ম, ঋণ অব্যবস্থাপনা, স্বার্থের সংঘাত ও দুর্বল সুশাসনের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ব্যাংক খাতে নৈতিকতা কোনো আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; এটি ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া প্রয়োজন।’ এছাড়া পরিবর্তিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে নৈতিকতা, তথ্যের গোপনীয়তা, গ্রাহকের অধিকার ও জবাবদিহিতার বিষয়গুলোও তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলেও মন্তব্য করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক।