বন্যায় দুর্ভোগ

দুর্গম ফারুয়ায় ধ্বংসের চিহ্ন

টানা ভারি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের পর রাঙ্গামাটিতে মানুষ আশ্রয় কেন্দ্র ছেড়ে নিজ বাড়িতে ফিরলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি।

তাদের সামনে অপেক্ষা করছে নতুন বাস্তবতা। জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ভেসে উঠছে ধ্বংসের চিহ্ন। কোথাও ধসে পড়েছে বসতঘর, কোথাও কাদায় ভরে গেছে ঘরের ভেতর। নষ্ট হয়েছে ফসল, মাছের ঘের, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সংকটে এখনো মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে হাজারো মানুষ।

বিলাইছড়ি উপজেলার দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, বন্যায় বিধ্বস্ত কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও দোকানপাট নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় মেরামত ও পুনর্নির্মাণের কাজ চলমান। কিছু দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো কাদামাটি জমে আছে। ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের হিসাবে, ইউনিয়নের প্রায় ১৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ৫০০টি ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৮৬টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১১টি পাড়া কেন্দ্র, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এছাড়া আরো তিনটি কমিউনিটি সেন্টার ও ২০টি গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফারুয়া বাজারের ১৪৪টি দোকানও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

রবিন তঞ্চঙ্গ্যা নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘রাইংখ্যং নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতি বছর আমাদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। ৫-১০ কেজি ত্রাণ দিয়ে এ ক্ষতি কোনোভাবেই পুষিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। আমরা সরকারের কাছে বিশেষ নজর দেয়ার অনুরোধ জানাই।’

তক্তানালা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যতন তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘বিদ্যালয়ে বুকসমান কাদা জমেছে। শ্রেণীকক্ষের টেবিল-বেঞ্চ কাদায় ঢেকে গেছে। ফলে বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ রয়েছে।’

এদিকে, ফারুয়া ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাইংখ্যং নদীর পাশেই ফারুয়া বাজারের অবস্থান। সাম্প্রতিক বন্যায় বাজারের ১৪৪টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

নয় বছর ধরে ফারুয়া বাজারে চা-নাশতার দোকান চালাচ্ছেন মো. নূর হোসেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় তার প্রায় ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডার, চুলা, নগদ টাকাসহ দোকানের কোনো কিছুই তিনি রক্ষা করতে পারেননি। দোকানের ভেতরে হাঁটুসমান কাদা জমে গিয়েছিল। পানি নেমে যাওয়ার পর এখন তিনি মেরামতের কাজ করছেন। তবে ব্যবসা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারবেন কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। এ দোকানই ছিল তার জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।

তক্তানালা গ্রামের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী পুখপুরি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘আমার চায়ের দোকানে পানি ঢুকে পড়ে। ভেতরের সব মালপত্র ভেসে যায়। আমি কিছুই বাঁচাতে পারিনি।’

ফারুয়া বাজার কমিটির সভাপতি মো. হারুন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বাজারটি উঁচু স্থানে স্থানান্তরের জন্য প্রশাসন ও সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’

ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘রাইংখ্যং নদীতে পলি জমে যাওয়ায় নদীর গভীরতা কমেছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই চর ও আশপাশ এলাকায় পানি উঠে যায়। বন্যার প্রবণতা কমাতে হলে রাইংখ্যং খনন করা অত্যন্ত প্রয়োজন।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইউনিয়নের বাজারসহ নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে উঁচু স্থানে স্থানান্তরের মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ফারুয়া ইউনিয়নের পুরো এলাকা সংরক্ষিত বন (রিজার্ভ ফরেস্ট) হওয়ায় বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া কোনো উন্নয়নকাজ করা যায় না। এ বিষয়ে বন বিভাগের সঙ্গে আলোচনা হলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।’

বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ফারুয়া ইউনিয়নে ১১ টন ত্রাণ বিতরণ করেছি। কার্যক্রম এখনো চলমান।’

ফারুয়া বাজার স্থানান্তরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাঙ্গামাটি আসনের সংসদ সদস্যকে জানানো হয়েছে। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।’

আরও