নির্বাচন ঘিরে রেকর্ড দামে চায়ের নিলাম

দীর্ঘদিন ধরে দেশে চা খাতে মন্দা ভাব। উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রিমূল্য কম থাকায় লোকসান করে অনেক প্রতিষ্ঠান। তাই চলতি বছরের মাঝামাঝিতে ন্যূনতম নিলাম মূল্যস্তর সংশোধন করে কিছুটা বাড়িয়ে দেয় সরকার।

দীর্ঘদিন ধরে দেশে চা খাতে মন্দা ভাব। উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রিমূল্য কম থাকায় লোকসান করে অনেক প্রতিষ্ঠান। তাই চলতি বছরের মাঝামাঝিতে ন্যূনতম নিলাম মূল্যস্তর সংশোধন করে কিছুটা বাড়িয়ে দেয় সরকার। এতে চায়ের গড় দাম বাড়লেও বিক্রির হার ছিল আগের মতোই। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় চায়ের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সে কারণে নিলামে তৈরি হয়েছে নতুন রেকর্ড। সর্বশেষ তিনটি নিলামে সর্বোচ্চ দরেই চা বিক্রির হার পৌঁছেছে ৯০ শতাংশের ঘরে, যা গত কয়েক বছরে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, নির্বাচনী মৌসুমে চায়ের বাজারে এ অস্বাভাবিক চাঙ্গা ভাব স্বল্পমেয়াদে হলেও খাতটিকে লোকসানের ধাক্কা সামাল দিতে সহায়তা করবে। তবে স্থায়ী সমৃদ্ধির জন্য উৎপাদন ব্যয়, ভোক্তা বাজার এবং আন্তর্জাতিকমূল্য পরিস্থিতি বিবেচনায় আরো দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা জানান।

চাহিদার দিক দিয়ে দেশে চায়ের প্রধান মৌসুম শীতকাল। অপরদিকে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষাকালে উৎপাদনের ভরা মৌসুম। ফলে অক্টোবর পর্যন্ত নিলামে সরবরাহ হয় ভালোমানের চা। সাধারণত নভেম্বর থেকে বাজারে নিম্নমানের চা আসায় দাম ও বিক্রি কমে যায়। তবে চলতি বছরের চিত্রটা সম্পূর্ণই উল্টো—নিলাম মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে চায়ের দাম ও বিক্রির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শীতকালীন চাহিদা বৃদ্ধি এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলো নিলাম থেকে চা ক্রয় ও মজুদে ঝুঁকছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, উচ্চ চাহিদা ও সক্রিয় বাজার পরিস্থিতির কারণে পরবর্তী কয়েকটি নিলামেও চায়ের তেজি এ প্রবণতা বজায় থাকতে পারে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড ও দেশের শীর্ষস্থানীয় নিলামকারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্রোকার্সের একাধিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সর্বশেষ ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নিলামে প্রতি কেজি চা বিক্রি হয়েছে গড়ে ২৬৫ টাকা ৬ পয়সায়। আগের বছরের একই নিলামে ২১৮ টাকা ১৫ পয়সা কেজি বিক্রি হয়। অর্থাৎ ৩১তম নিলামে গড় দামের পার্থক্য প্রায় ৪৭ টাকা। একইভাবে ৩০তম নিলামে চায়ের বাড়তি গড় দাম ছিল ৪৫ টাকা ২৯ পয়সা, ২৯তম নিলামে ৪৩ টাকা ৪৯, ২৮তম নিলামে ৪০ টাকা ১৬ এবং ২৭তম নিলামে আগের বছরের চেয়ে ৪৩ টাকা ৫৫ পয়সা বেশিতে চা বিক্রি হয়েছে এবার।

বাগান মালিকরা বলছেন, দেশে আগের বছরের চেয়ে চায়ের উৎপাদন এবার কম হয়েছে। সে কারণে মূল্যবৃদ্ধির পরও নিলামে চা বিক্রির হার বেড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক নয়। কেননা নিলাম বর্ষের শেষদিকে বৃষ্টি না থাকায় চায়ের মান খারাপ থাকে। ফলে দাম ও বিক্রি দুটোই কমে যায়। কিন্তু এ বছর নিলামে ওঠা ৯০ শতাংশ চা-ই কিনে নেয়ার কারণে মৌসুমের শেষ দিকেও ভালো দাম পাচ্ছেন বাগান মালিকরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছর আগের সময়ের তুলনায় চায়ের উৎপাদন কম হয়েছে। এ কারণে দাম কিছুটা বেশি। এর সঙ্গে চলতি বছর বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় চায়ের বাজারে কিছুটা প্রভাব পড়েছে।’ বাজারে বাড়তি দাম পাওয়া গেলে বাগানগুলোও ভালোমানের চা উৎপাদনে এগিয়ে আসবে, যা দেশের চা খাতের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তন বলে মনে করেন তিনি।

গত বছরের তুলনায় এবার চা উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন বাগান মালিকরা। দেশের ১৭২টি বাগানে চলতি বছর ১০ কোটি ৩০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অক্টোবর পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ৭ কোটি ৫৫ লাখ ৩৮ হাজার কেজি। অথচ গত বছর ১০ কোটি ৮০ লাখ কেজি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছিল ৯ কোটি ৩০ লাখ ৪২ হাজার কেজি। দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ ১৮ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছিল ২০২৩ সালে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ কোটি ২০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের। তবে রেকর্ড হওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে কমছে উৎপাদন। খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে না পেরে অনেক বাগান মালিকই লোকসানে চা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। এতে এনটিসিসহ অনেক প্রতিষ্ঠিত বাগান শ্রমিক মজুরি দিতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তাই ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো নিলামে চা বিক্রির ক্ষেত্রে লিকার গ্রেড অনুযায়ী ন্যূনতম মূল্য বসানোর সিদ্ধান্ত নেয় চা বোর্ড।

চা বোর্ডসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচনে চায়ের বেচাকেনা ভালো হয়। তাই এ সময় বাজারও চাঙ্গা থাকে। তবে বিগত কয়েকটি নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে প্রচারণার ক্ষেত্রে সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি, তাদেরকে আকর্ষণ করার প্রবণতা ছিল কম। আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রধান দলগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি ভোটের লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে ব্যবসায়িক পলিসির অংশ হিসেবে দেশের প্রধান ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলো আগাম চা সংগ্রহে ব্যস্ত। অফ মৌসুমেও তাই চট্টগ্রামের নিলামে চা বিক্রি গত কয়েক বছরের মধ্যে রেকর্ড করেছে।

দেশের শীর্ষ চা বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে ইস্পাহানি, আবুল খায়ের, ইউনিলিভার, মেঘনা, পারটেক্স, সিটি, টিকে, ওরিয়ন অন্যতম। কয়েকটি কোম্পানির নিজস্ব বাগান থাকলেও চা বোর্ডের নিয়মের কারণে সবাইকে নিলাম থেকেই চা সংগ্রহ করতে হয়। তবে সীমিত আকারে (মোট উৎপাদনের ২৫ শতাংশ) নিয়ম মেনে উৎপাদিত চা বাগানেই বিক্রির সুযোগ রয়েছে। দেশে তিনটি চা নিলাম কেন্দ্র থাকলেও মোট উৎপাদিত চায়ের ৯৫ শতাংশই লেনদেন হয় শতবর্ষী চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক নিলামে।

সর্বশেষ ৩১ নিলাম প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শীর্ষ দামে বিক্রি হওয়া চায়ের ১০টি লট থেকে সাতটিই কিনে নিয়েছে আবুল খায়ের টি কোম্পানি। বাকি চাগুলোর মধ্যে ইস্পাহানি, মেঘনা, এইচআরসি টি কোম্পানি কিনেছে। এর মধ্যে ১০ প্যাকেট (প্রতিটিতে ৫০ কেজি) চা প্রতি কেজি ৩৫৯ টাকায় কিনেছে আবুল খায়ের টি। শীর্ষ দামের চায়ের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রতি কেজি ২৯৮ টাকা দরে ১০ প্যাকেটের একটি লট কিনেছে আল আমিন নামের এক প্রতিষ্ঠান।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সময়ে দাম বাড়লেও চা ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো কৃচ্ছ্রতা দেখাত। শুধু নির্বাচনের কারণে বাড়তি দামেও অনেক কোম্পানি চা কেনা অব্যাহত রেখেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দ্য কনসুলেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানির (ফিনলে) প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) তাহসিন আহমেদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত দেড় দশকের মধ্যে এবারই একটি ইনক্লুসিভ নির্বাচনের আশা করছে দেশের মানুষ। বাগান মালিক থেকে শুরু করে মোড়কজাতকারী কোম্পানিগুলোও দীর্ঘদিনের মন্দা ভাব কাটিয়ে চা খাতে রিটার্নের আশা করছে। আগামী কয়েক মাসে বাগান থেকে ভালোমানের চা আসবে না। শীর্ষ ক্রেতারা মূলত আসন্ন নির্বাচন ও শীত মৌসুমকে সামনে রেখে আগাম মজুদ বাড়াচ্ছে।’

বাগান মালিক ও ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছেন, কেবল নির্বাচন নয়, বর্তমানে দেশের সীমান্ত পথগুলো দিয়ে চা চোরাচালান কমে গেছে। সেই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতা, মূল্যস্তর সংশোধনের কারণেও চায়ের দামে প্রভাব পড়েছে। তবে দাম বাড়লে চাহিদা কমে যাওয়ার অর্থনৈতিক প্রবণতার বিপরীতে সর্বশেষ এক-দেড় মাসে নিলামগুলোয় চায়ের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়াকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বলে মনে করছেন তারা।

অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচনে চায়ের একটা বড় চাহিদা থাকে। শুধু চা নয়, নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশের গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিতেও একটি চাঞ্চল্য তৈরি হয়। এটা স্বাভাবিক। যদিও সবে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে চায়ের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে—এখনই সে বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে চা-কেন্দ্রিক নির্বাচনী ডামাডোল আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।’

আরও