নিখোঁজ এক যুবকের সন্ধানের দাবিতে মানববন্ধনকে কেন্দ্র করে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন চিলা ইউনিয়নের জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্ট গার্ডের হারবারিয়া স্টেশনে হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় কোস্ট গার্ডের কয়েকজন সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করলেও বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নিখোঁজ মিরাজ শেখের সন্ধান দাবিতে তার স্বজন ও স্থানীয় গ্রামবাসীরা জয়মনির ঘোল এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। একপর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ সেখানে অবস্থিত কোস্ট গার্ডের হারবারিয়া চেকপোস্ট ও স্টেশনে হামলা চালায়। হামলাকারীরা কোস্ট গার্ডের স্পিডবোট, পন্টুন অফিস এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও মালামাল ভাঙচুর করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় কোস্ট গার্ড সদস্যদের উপর সরাসরি হামলা ও স্টেশনের পন্টুনে ভাঙচুর করা হয়। এ সময় কয়েকজন কোস্ট গার্ড সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্ট গার্ড সদস্যরা কয়েক রাউন্ড ব্ল্যাঙ্ক কার্টিজ (ফাঁকা গুলি) নিক্ষেপ করে।
ঘটনার খবর পেয়ে অতিরিক্ত কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ করলে নারী-পুরুষসহ অন্তত ১০ জন গ্রামবাসী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
চিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গাজী আকবর হোসেন বলেন, ঘটনার সময় আমি এলাকায় ছিলাম না। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে কোস্ট গার্ডের উপর এলাকাবাসীর হামলা-ভাঙচুরের বিষয়টি জানতে পেরেছি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সূত্রপাতের পর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। তখন পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত ছিল। আমি উত্তেজিত গ্রামবাসীকে শান্ত করার চেষ্টা করেছি।
মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও র্যাব মোতায়েন রয়েছে।
তিনি আরো জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো পক্ষ থানায় মামলা করেনি। তবে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল।
জানা গেছে, জয়মনীর ঘোল এলাকার মিরাজ শেখ (৩২) নামের এক যুবক গত ১০ এপ্রিল নিখোঁজ হন। এ ঘটনার পর মিরাজের স্বজনরা দাবি করে আসছে, কোস্টগার্ডের পরিচয়ে মিরাজ শেখকে তুলে নেয়া হয়। পরে মিরাজ শেখের সন্ধানের দাবিতে তার স্বজনরা পর্যায়ক্রমে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। যদিও কোস্টগার্ড এ নিখোঁজ ঘটনার সঙ্গে তাদের বাহিনীর কোনো সম্পৃক্ততা থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে।
ঘটনার বিষয়ে কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জয়মনির ঘোলে অবস্থিত কোস্ট গার্ড স্টেশন হারবারিয়ায় একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেছে। এতে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন।
এতে বলা হয়, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বনদস্যু দমন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কোস্ট গার্ড দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে আসছে। জয়মনির ঘোল দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সেখানে কোস্ট গার্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়।
কোস্ট গার্ডের দাবি, স্টেশন স্থাপনের ফলে বনদস্যুদের কাছে রসদ, অস্ত্র ও অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ অনেকাংশে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে বনদস্যু ও তাদের সহযোগীরা কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি মেনে নিতে পারছে না।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, প্রাথমিক তদন্ত ও স্থানীয় পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ও অসাধু চক্র নিজেদের অপকর্ম পরিচালনার সুবিধার্থে পরিকল্পিতভাবে হামলা, ভাঙচুর ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য সুন্দরবনে বনদস্যু দমন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কোস্ট গার্ডের চলমান কার্যক্রম ব্যাহত করা এবং বাহিনীকে ওই এলাকা থেকে সরিয়ে দেয়া।
কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। পাশাপাশি কোনো ধরনের হামলা, ভয়ভীতি বা অপপ্রচারে দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত না হয়ে সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।