ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে খুলনা ও রংপুর বিভাগে বেশি জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। ভালো করেছে রাজশাহী বিভাগেও। বিশেষত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় বেশি জয় পেয়েছে দলটি। এসব এলাকার ভোটার ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিদ্রোহীদের কারণে বিএনপির প্রার্থীদের দুর্বলতা এবং জামায়াতের কৌশলী অবস্থান তাদের প্রার্থীদের জয় পেতে ভূমিকা রেখেছে।
নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নেও রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছিল জামায়াত। ১১ দলীয় জোটে থাকলেও রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে মাত্র চারটি এবং রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনের মধ্যে তিনটিতে শরিকদের ছাড় দেয়। একইভাবে খুলনা বিভাগে ৩৬টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতেই নিজেদের প্রার্থী দেয় দলটি।
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রংপুর বিভাগের ১৭টি ভারত সীমান্তবর্তী আসনের মধ্যে ১৪টিই নিজেদের দখলে রেখেছে জামায়াতে ইসলামী। রাজশাহী, খুলনা ও সিলেট বিভাগের ক্ষেত্রেও সীমান্তসংলগ্ন আসনগুলোয় নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখে দলটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের শুরু থেকেই দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী আসনগুলোয় জামায়াত বাড়তি মনোযোগ দেয়। নির্বাচনের ফলাফলে সীমান্ত এলাকায় দলটির সাফল্যে তা ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন তারা। দলীয়ভাবে যে ৬৮টি আসন পেয়েছে, তার ২১টিই সীমান্তবর্তী এলাকা। সিলেটের একটি সীমান্তবর্তী আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত জোটের দল খেলাফত মজলিস।
নির্বাচনে রাজশাহী বিভাগের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চারটি আসনেই জয় পেয়েছে জামায়াত। সব আসনের সঙ্গেই রয়েছে ভারতের সীমান্ত। এর বাইরে দলটি জয় পেয়েছে সীমান্তবর্তী নওগাঁ-২ ও জয়পুরহাট-১ আসনে। কুড়িগ্রামের চারটি আসনের সবগুলোই জিতেছে জামায়াত। এ আসনগুলোর অবস্থানও সীমান্তবর্তী এলাকায়। বাকি আসনগুলো দলটি পেয়েছে মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর ও সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকায়।
খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতেই জয়ী হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। খুলনা বিভাগের সীমান্তবর্তী জেলা যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে শুধু যশোর-৩ ছাড়া বাকি পাঁচ আসনেই জয়লাভ করেছে জামায়াত। স্থানীয় ভোটার ও নেতারা বলছেন, মনোনয়ন যথাযথ না হওয়ার পাশাপাশি মনোনয়নবঞ্চিতদের বিভেদে বিএনপির এ ভরাডুবি।
চুয়াডাঙ্গার দুটি আসনেই জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। অন্যদিকে সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অন্তঃকোন্দলের কারণে বিএনপির ভরাডুবি হয়। এর কারণ জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ মিল্টন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপি গুছিয়ে উঠতে পারেনি। আমাদের প্রতিপক্ষ জামায়াত তাদের দলীয় প্রার্থী অনেক আগে ঘোষণা করলেও বিএনপি করেছে অনেক দেরিতে। ফলে সমন্বয়ের অভাব ছিল। ভোটাররা বিএনপির প্রার্থীদের প্রতি ভরসা পায়নি। সঙ্গে ছিল অন্তঃকলহও।’
এক সময়ের বিএনপির ঘাঁটি যশোরের ছয় আসনের পাঁচটিতেই জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। তৃণমূলের কর্মীরা জানান, অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে যশোর বিএনপি। দলীয় কোন্দল, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও তলে তলে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আঁতাতের কারণে এমন সময়েও বিএনপি প্রার্থীদের পরাজয় হয়েছে। এ পাঁচ আসনের মধ্যে যশোর-২ ও যশোর-৫-এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বিএনপির দুই বিদ্রোহী প্রার্থীও।
যশোর-১ (শার্শা) আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি। পরবর্তী সময়ে বাদ দিয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া হয় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনকে। এরপর ক্ষোভে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান তৃপ্তির অনুসারীরাও। এছাড়া সীমান্তবর্তী এ উপজেলায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসনটিতে দখল, সীমান্ত চোরাচালান ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনায় বিএনপির প্রার্থীর অনুসারীদের জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। অপরদিকে এ আসনটিতে অভিজ্ঞ ও পরিচিত প্রার্থী জামায়াতের আজিজুর রহমান। জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা সংগঠিতভাবে তার প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।
একই ঘটনা ঘটেছে যশোর-৬ আসনেও। আসনটিতে প্রথমে মনোনয়ন পান ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রওনকূল ইসলাম শ্রাবণ। পরে তাকে বাদ দিয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া হয় উপজেলা সভাপতি আবুল হোসেন আজাদকে। আজাদ চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলে বিএনপির বড় একটি অংশ নাখোশ হয় এবং প্রচারণায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। যশোর-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন কৃষক দলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিএস আইয়ুব। ঋণখেলাপিতে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হলে কপাল খোলে অভয়নগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মতিয়ার ফারাজীর। ফারাজী মনোনয়ন পেলে ভোটের মাঠে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান টিএস আইয়ুবের অনুসারীরা।
যশোর-২ আসনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন সাবিরা সুলতানা। ঝিকরগাছা-চৌগাছা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন হাফ ডজন নেতা। সাবিরার মনোনয়ন বাতিল চেয়ে বিক্ষোভ, দলীয় হাইকমান্ডের কাছেও স্মারকলিপি দেন মনোনয়নবঞ্চিতরা। এমনকি প্রচারণা শুরু করলেও বঞ্চিতরা পাশে ছিলেন না সাবিরার।
যশোর-৫ মণিরামপুরে দলীয় মনোনয়ন পান উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ ইকবাল। পরবর্তী সময়ে তাকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেয়া হয় জমিয়তে উলামায়ের কেন্দ্রীয় নেতা রশিদ আহম্মাদকে। দলের বড় একটি অংশ নেতাকর্মীদের নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন শহীদ ইকবাল। বিএনপির মধ্যে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হওয়ায় সহজেই জয়ী হন জামায়াতের প্রার্থী গাজী এনামুল হক।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দাবি করেছেন, সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানের কারণে এসব এলাকায় দলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সীমান্তবর্তী বলে যে জামায়াত জয় পেয়েছে, বিষয়টা এমন নয়। বাংলাদেশের সীমান্ত তো প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। সবগুলো তো সীমান্তবর্তী নয়। আমরা মনে করি, এ জয় সীমান্তের ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। মূল কারণ হচ্ছে প্রথমত, প্রার্থীদের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা। এসব এলাকায় আমাদের প্রার্থীরা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন এবং জনগণের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। দ্বিতীয়ত, সাংগঠনিক শক্তি, বৃহত্তর রংপুর, বৃহত্তর দিনাজপুর, বৃহত্তর খুলনা ও বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে আমাদের সংগঠন ছিল শক্তিশালী ও সুসংগঠিত। এ সাংগঠনিক কাঠামো নির্বাচন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং তৃতীয়ত, নির্বাচন পরিচালনার সক্ষমতা। এসব এলাকায় আমরা নির্বাচনকে যেভাবে পরিচালনা করেছি, মাঠপর্যায়ে যেভাবে কাজ করেছি, সেটি ছিল কার্যকর ও সময়োপযোগী। এর ফলেই এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের ভোট দিয়েছেন। এখানে উল্লেখ করা দরকার, ঢাকাতেও আমাদের ছয়জন প্রার্থী জয় পেয়েছে। ঢাকা তো সীমান্তবর্তী এলাকা নয়। তাই এখান থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায়, সীমান্ত বিষয়টি মূল ফ্যাক্টর নয়।’
বিএনপির নির্বাচনী তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সীমান্তবর্তী যেসব আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, সেগুলোতে বিএনপি একাধিকবার প্রার্থী বদল করেছে। প্রার্থী পরিবর্তনের কারণে তৃণমূলে সৃষ্ট অসন্তোষ এবং মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদের অসহযোগিতার কারণে এসব আসনে বিএনপির প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ‘যশোরের মতো জায়গায় জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যানটা আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় ও কষ্টকর বটে। পরাজয় নিয়ে নানা কারণ খুঁজে বের করছি আমরা। কিছু নেতা মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে মাঠে না থাকার অভিযোগ উঠেছে। তারা মাঠে না থাকার প্রভাবও পড়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে গোপনে অসহযোগিতার অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
জামায়াতের প্রার্থী বাছাই ও সুকৌশলের কারণে সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরায়ও ভরাডুবি হয়েছে বিএনপির। জেলার চারটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীদের পরাজিত করে জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সাতক্ষীরা-১, সাতক্ষীরা-২ ও সাতক্ষীরা-৩ আসনের বিজয়ীরা।
নির্বাচনে বিএনপির পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাতক্ষীরার আসনগুলোয় সঠিকভাবে প্রার্থিতা যাচাই-বাছাই না করা একটি কারণ। চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণার পর রাজপথে বঞ্চিতদের বিক্ষোভ-সমাবেশ এবং জামায়াতের সুকৌশলের কাছে বিএনপির পরাজয় হয়েছে।’
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার যশোর প্রতিনিধি আব্দুল কাদের, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি শুভব্রত আমান, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি গোলাম সরোয়ার ও চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি রিফাত রহমান