ইন্টারনেটের অপব্যবহারে বাড়ছে কিশোর অপরাধ

সচেতনতায় ৩৮ হাজার মাধ্যমিক শিক্ষার্থীকে সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেবে সরকার

প্রকল্পটি ৫০ কোটি টাকার কম হওয়ায় বিধি অনুযায়ী পরিকল্পনামন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) রোববারের সভায় প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে অবহিত করা হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, অনলাইন বিরোধ থেকে বাস্তব জীবনে সংঘাত—ইন্টারনেটের অপব্যবহারে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা। অনলাইনে হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি অপব্যবহার, প্রতারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধ হয়ে অপরাধে জড়ানোর ঘটনাও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে মাধ্যমিক পর্যায়ের ৩৮ হাজার ১৮০ শিক্ষার্থীকে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় ৪৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নেয়া এ প্রকল্পে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিদেরও সম্পৃক্ত করা হবে।

সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত কয়েকজনের হাতে সপ্তম শ্রেণীর এ শিক্ষার্থীকে প্রাণ দিতে হয়। হত্যাকাণ্ডের পর তার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে পুলিশের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, তার মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

একইভাবে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার কিশোরী জান্নাতুল তাজমিনের ঘটনাও শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কক্সবাজার থেকে গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লায় ফেরার পথে খুন হয় তাজমিন। এসব ঘটনা এবং অনলাইনে কিশোরদের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পড়াশোনা, তথ্য অনুসন্ধান ও যোগাযোগে ইন্টারনেটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বয়সোপযোগী সচেতনতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও পারিবারিক তদারকির অভাবে এর অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, অনলাইন গেমিংয়ের সূত্রে অপরিচিতদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং উসকানিমূলক কনটেন্টের প্রভাবে কিশোররা বিপদে পড়তে পারে। অনলাইনে শুরু হওয়া বিরোধ কখনো কখনো বাস্তব জীবনের সংঘাতেও রূপ নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারও এ উদ্বেগের অংশ।

এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার, সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ শেখাতে প্রকল্প নিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ। ‘দেশের শিশু-কিশোরসহ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি।

প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর আওতায় প্রশিক্ষণ দেয়া হবে ৩৮ হাজার ১৮০ শিক্ষার্থী ও ২ হাজার ৪৭৫ শিক্ষককে। পাশাপাশি অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে ৫০৫টি কর্মশালার আয়োজন করা হবে। সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে আয়োজন করা হবে দুটি প্রতিযোগিতাও। চলতি বছর শুরু হয়ে ২০২৯ সালের মার্চে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রকল্পটি ৫০ কোটি টাকার কম হওয়ায় বিধি অনুযায়ী পরিকল্পনামন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) রোববারের সভায় প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে অবহিত করা হবে।

প্রকল্পটির বিষয়ে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মুখপাত্র হোসেন বিন আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের সঙ্গে সাইবার অপরাধ ও বুলিংয়ের প্রবণতাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে ঢাকাকেন্দ্রিক সচেতনতা ও সুযোগ-সুবিধা থাকলেও মফস্বল ও গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা সাইবার নিরাপত্তা এবং এর প্রতিকার সম্পর্কে এখনো অনেকাংশে অজ্ঞ। এ সংকট উত্তরণে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি জেলার গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন করে তোলা। এজন্য মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সাইবার বুলিং, হয়রানি ও ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য সহায়ক কোর্স কনটেন্ট তৈরি করা হবে, যাতে তারা আধুনিক সময়ের সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে পারেন।’

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, ঢাকাসহ সারা দেশে বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং। এসব গ্যাংয়ের সদস্য অন্তত ৪ হাজার ২৫০ জন। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরেই রয়েছে ১৫৯টি গ্যাং, যার সদস্য ১ হাজার ৮১২ জন। ঢাকার বাইরে সক্রিয় ২২৭টি গ্যাংয়ে সদস্য রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার।

স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তারে শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল জগতে প্রবেশের সুযোগ বাড়লেও নিরাপদ ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং অনলাইন অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা সে অনুপাতে বাড়েনি। ফলে কেবল প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; এর দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানোও জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট ব্যবহারের কৌশল শেখানোর পাশাপাশি সাইবার জগৎ সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। একই সঙ্গে তারা ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো ঝুঁকিতে পড়ছে কিনা কিংবা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিনা, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেট, সাইবার নিরাপত্তা ও ওয়েবভিত্তিক তথ্য সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তবে প্রশিক্ষণের পর তারা ইন্টারনেট কীভাবে ব্যবহার করছে, কোথায় যাচ্ছে এবং অনলাইনে কী ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে, তা দেখভালের দায়িত্বও রয়েছে। এখানে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবার সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারলে শিশু-কিশোরদের সাইবার জগতের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।’

দেশে ইন্টারনেটের অপব্যবহার ও সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বাড়লেও কার্যকর প্রতিরোধ, সচেতনতা এবং প্রশিক্ষণের পরিধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ অবস্থায় ৩৮ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের মান, দক্ষ প্রশিক্ষক, হালনাগাদ পাঠ্যক্রম এবং বাস্তব প্রয়োগের ওপর।

প্রযুক্তিবিদ ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ডিজিটাল ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানভীর হাসান জোহা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের জন্য দেশ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। আগ্রহ ও উদ্যোগ আছে, কিন্তু প্রশিক্ষিত শিক্ষক, হালনাগাদ পাঠ্যক্রম এবং গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোর ঘাটতি রয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় জরুরি। কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং ডিজিটাল আলামত কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, তা শিক্ষার্থীরা জানলে অনেক অপরাধের প্রতিকার সহজ হবে। তবে পুলিশের ভূমিকা হতে হবে সহায়তামূলক। ভীতি প্রদর্শনের পরিবেশ তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়েও অভিযোগ করতে চাইবে না।’

তানভীর হাসান জোহা আরো বলেন, ‘এ ধরনের প্রশিক্ষণে কিশোর বয়সের কৌতূহল সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি নৈতিকতা ও আইনি দায়বদ্ধতা শেখাতে হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত ও বৈধ পরিবেশে হাতেকলমে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।’

আরও