পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় নির্বিচারে বনভূমি উজাড়, প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে ফলদ ও সেগুন বাগান সৃজনসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে রয়েছে অন্তত ২০ প্রজাতির প্রাচীন বৃক্ষ। দেশীয় প্রজাতির এসব বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে বৈলাম, সিভিট, তালিপাম, উদাল, চুন্দুল, তমাল, পুদিনা, উদয়পদ্ম, বুদ্ধ নারকেল, কামদেব। এসব প্রজাতির দেশীয় উদ্ভিদকে ‘সংরক্ষিত উদ্ভিদ’ ঘোষণা করে এক যুগ আগে সুরক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত বনভূমি ও সবুজ আচ্ছাদনের বিশাল এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম। এখনো পাহাড়ের চিরহরিৎ বনগুলো বন্যপ্রাণীদের অভয়ারণ্য হিসেবে টিকে রয়েছে। টিকে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বনজ বৃক্ষ ও বুনো অর্কিড। বাংলাদেশের অতিবিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষগুলো সুরক্ষায় ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে ৫৫টি প্রজাতির উদ্ভিদকে সংরক্ষিত বা রক্ষিত উদ্ভিদ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বিশেষত সমতলের জেলাগুলোয় এসব উদ্ভিদ এখন প্রায় বিলুপ্ত। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো দেখা যাচ্ছে বৈলাম, সিভিট, উদয়পদ্ম, তমাল, বাঁশপাতা, চুন্দুলসহ প্রায় ২০ প্রজাতির রক্ষিত তালিকায় থাকা উদ্ভিদ। রাঙ্গামাটির কাচালং সংরক্ষিত বন, পাবলাখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (সারোয়াতলী বন), কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, রাইংক্ষ্যং সংরক্ষিত বন ছাড়াও বন বিভাগের নার্সারি ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে এসব উদ্ভিদ। ২০২৪ সালের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা রেড ডাটাবুকেও এসব উদ্ভিদ স্থান পেয়েছে।
বন কর্মকর্তারা বলছেন, রক্ষিত উদ্ভিদগুলোর মধ্যে আকারে বড় প্রজাতির গাছগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে পানি শোষণ বা পানি ধরে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে স্থানীয় ঝিরি-ঝরনা আর পাহাড়ি বনে বছরজুড়ে থাকে পানির সতেজতা। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার আশায় বিগত কয়েক দশক ধরে সেগুন গাছ রোপণ বাড়িয়েছে। সেগুনের আধিক্যে অন্যান্য প্রজাতির বৃক্ষ কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আবার সেগুন বাগানে অন্য প্রজাতির উদ্ভিদ না জন্মানোর কারণে সংকটে পড়েছে জীববৈচিত্র্য।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ঝুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের সদ্য সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ও উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ মো. ড. জাহিদুর রহমান মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ করে রক্ষিত উদ্ভিদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ৪২ উদ্ভিদের মধ্যে ২০টির মতো এখনো টিকে রয়েছে। এগুলো সরকারি যেসব বনাঞ্চল রয়েছে, সেখানে আছে। কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর যেসব বাগান এবং তারা যে বনগুলো ব্যবস্থাপনা করে সেগুলোয় তেমন দেখা যায় না। এর কারণ এককভাবে সেগুন বাগানের আধিক্য হওয়ায় ক্রমেই রক্ষিত উদ্ভিদগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বন বিভাগ ডাটাবুক তৈরি করেছে। সেখানে এক হাজার উদ্ভিদের রেড ডাটাবুকে করা হয়েছে। ডাটাবুকের ৪০ শতাংশ উদ্ভিদই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। রেড ডাটাবুকেও রক্ষিত উদ্ভিদগুলোর তথ্য এসেছে ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আমরা যদি অর্কিডের ক্ষেত্রে দেখি, সেখানেও একই অবস্থা। ১৩টি রক্ষিত অর্কিড প্রজাতির মধ্যে উইলোপিয়া, বালবোপাইলাম, ভেন্ডা, ডেনড্রোবিয়ামসহ আরো অনেক প্রজাতি এখন আর আমাদের সংরক্ষিত বনেও দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ বড় বড় গাছে সেগুলো জন্মে থাকে, বিশ্বব্যাপী এসব বুনো অর্কিডের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। পাচারকারীরা অর্কিডগুলো বিভিন্নভাবে প্রাকৃতিক বন থেকে সংগ্রহের পর পাচার করে। অর্কিড হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ এটা।’
বাংলাদেশের রক্ষিত উদ্ভিদের তালিকার মধ্যে ৪২ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ১৩ প্রজাতির অর্কিডসহ ৫৫ প্রজাতি রয়েছে। উদ্ভিদগুলোর মধ্যে রয়েছে তালিপাম, সিভিট, বৈলাম, চুন্দুল, কুম্ভি, আমুর, ধূপ, কাঁটালাল বাটনা, কর্পূর, তেজবহুল, মণিরাজ, অনন্তমূল, পিপারমিন্ট, বাঁশপাতা, উরি আম, পেড়ুক, রিটা, কুসুম/জায়না, উদাল, হাঁড়জোড়া, ত্রিকোণীবট, লতাবট, গয়া অশ্বথ, পরিজাত, উদয়পদ্ম, জহুরী চাঁপা, কাঁচ, কামদেব, কির্পা, কুর্চি, খলশী, গলগল, জইন, টালি, তমাল, নারকেলি, হরিনা, সিংড়া, সমুন্দর ফল, মইলাম, পশুর ও চাম্পা ফুল। এর মধ্যে তালিপাম, সিভিট, বৈলাম, চুন্দুল, কুম্ভি, ধূপ, কাঁটালাল বাটনা, তেজবহুল, বাঁশপাতা, উরি আম, পেড়ুক, উদাল, উদয়পদ্ম, কুর্চি, তমাল, নারকেলি হরিনা, মইলাম ও চাম্পা ফুলের অস্তিত্ব প্রায়ই দেখা যায়। অর্কিডগুলোর মধ্যে রয়েছে ভেন্ডপসিস, ব্লু ভেন্ডা, কোথ, লেডিস স্লিপার, পিটচার প্লান্ট, রোড ভাণ্ডা, বালভো পাইলাম, ডুথি, সিম্বিডিয়াস ও চার প্রজাতির ডেন্ড্রোবিয়াম।
পরিবেশবাদীদের মতে, স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকেরই বৃক্ষ সম্পর্কে জানা-শোনার কমতি রয়েছে। সে কারণে রক্ষিত উদ্ভিদগুলো অনেকেই চিনতে পারছেন না। আবার জনসচেতনতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতারও অভিযোগ রয়েছে। বন বিভাগ সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছাড়াও ব্যক্তিগত বাগানিদের নিয়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে উদ্ভিদ সম্পর্কে আগ্রহ বাড়বে।
রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের টিস্যু কালচার ল্যাবের গবেষক রবিউল ইসলাম রিফাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের তরুণ প্রজন্ম বৃক্ষ নিয়ে খুবই কম জানে। এর অন্যতম কারণ হলো আমরা দালালকোটায় থাকা পছন্দ করছি, পরিবেশের সান্নিধ্যে খুবই কম যাচ্ছি। আর বাংলাদেশে বৃক্ষ নিয়ে তেমন কোনো গবেষণাও হচ্ছে না। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। যেগুলো অনেকের জানা-অজানার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এসব নিয়ে গবেষণামূলক কার্যক্রম তেমন হচ্ছে না। এ কারণে তরুণ প্রজন্ম এসব নিয়ে তেমন জানে না। গাছ আমাদের জন্য অপরিহার্য। গাছ বাঁচাতে না পারলে আমাদের জীবনও হুমকির মুখে পড়বে।’
পরিবেশবিষয়ক গবেষক মোস্তাফিজুর রহমান মেহেদী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা ছোট থেকেই অনেক উদ্ভিদ দেখে বড় হয়েছি। কিন্তু বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে অপরিকল্পিত বাগান সৃজনের ফলে দেখা যাচ্ছে বড় বড় বৃক্ষ কেটে ফেলা হচ্ছে। এ কারণে এখানে যেসব বিপন্ন প্রজাতি রয়েছে সেগুলো বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এগুলো সংরক্ষণ করা না গেলে ভবিষ্যতে আমাদের আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।’