মেহেরপুরের গাংনীতে নিয়ন্ত্রণে আসছে না অ্যানথ্রাক্স

মেহেরপুরের গাংনীতে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ছে অ্যানথ্রাক্স। ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত গরু ও ছাগলের মাংস খাওয়ার কারণে আক্রান্ত হয়েছে অনেকে।

মেহেরপুরের গাংনীতে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ছে অ্যানথ্রাক্স। ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত গরু ও ছাগলের মাংস খাওয়ার কারণে আক্রান্ত হয়েছে অনেকে। ২০২২ সাল থেকে চলতি বছরের ১১ আগস্ট পর্যন্ত অ্যানথ্রাক্স আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯২১। অবশ্য অনেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে গবাদিপশুর টিকা দেয়াসহ বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিলেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না অ্যানথ্রাক্স। তবে উপজেলার সীমান্তবর্তী তিন ইউনিয়নের বাইরে খুব একটা সংক্রমিত হয়নি।

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৯২১ জন অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত নারী ও পুরুষের  চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৬৪৪ জন, ২০২৩ সালে ৭৯৩ ও ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট পর্যন্ত ৪৮৪ জন অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তদের অধিকাংশ উপজেলার সীমান্তবর্তী কাজিপুর, তেঁতুলবাড়িয়া ও কাথুলী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা।

অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত কাজিপুর ইউনিয়নের সোহেলী বেগম জানান, আক্রান্ত একটি ছাগল পরিবারের লোকজন জবাই করে। তিনি শুধু ধোয়া ও রান্নায় সম্পৃক্ত ছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তারও হাতের আঙুলের মাঝে ফোসকা দেখা দিয়েছে। পরে চিকিৎসকরা অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন। প্রথমে কিছুটা আতঙ্কিত ছিলেন। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন তিনি।

কাজিপুর গ্রামের মিঠু জানান, বাড়িতে চারটি ছাগল রয়েছে তার। কয়েকদিন আগে একটি ছাগল মারা গেছে। পরে জানতে পেরেছেন ছাগলটি ব্যাসিলাস এনথ্রাসিস নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত ছিল। ছাগলটি মাটিচাপা দেয়া হয়। বাকি ছাগল বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি।

গাংনী উপজেলার মাংস বিক্রেতা করিম জানান, মাংস বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকজন এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে চিকিৎসা নিয়ে অনেকে সুস্থ হয়েছেন। প্রথমে তারা বুঝতে পারেননি রোগটি ছাগল বা গরুর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। অনেকে চালাকি করে আক্রান্ত পশু বিক্রি করে দেন। তবে জানতে পারলে তারা রোগাক্রান্ত গরু ও ছাগল জবাই করেন না।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, স্থানীয়ভাবে তড়কা নামে পরিচিত অ্যানথ্রাক্স হলো প্রাণীবাহিত রোগ। যা ভূমিজাত, স্পোর উৎপন্নকারী ব্যাসিলাস এনথ্রাসিস নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা হয়। অ্যানথ্রাক্সের স্পোরগুলো তাপমাত্রা ও জীবাণু ধ্বংসকারী রাসায়নিকের বিপরীতে সুপ্ত অবস্থায় মাটির ভেতর কয়েক দশক টিকে থাকতে পারে। প্রাথমিকভাবে এ ব্যাকটেরিয়ার স্পোর দ্বারা সংক্রমিত খাবার ও পানির মাধ্যমে তৃণভোজী প্রাণী যেমন—গরু, ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া ও শূকরের মাঝে এ রোগ সংক্রমণ ঘটে। মানুষের মধ্যে এ রোগের সংক্রমণ ঘটে ব্যাসিলাসের জীবাণু বা স্পোর দ্বারা সংক্রমিত পশু থেকে তৈরি খাদ্য বা অন্য কোনো উপজাত থেকে।

রোগতত্ত্ববিদরা বলছেন, ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এ রোগ মাঝে মাঝে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে দেখা গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বারবার দেখা দিচ্ছে, যা বাংলাদেশে প্রাণীদের মধ্যে স্থায়ী সংক্রমণ নির্দেশ করছে। বাংলাদেশে সাধারণত মে থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে এর সংক্রমণ ঘটে। মানবদেহে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের পথ অনুযায়ী অ্যানথ্রাক্সে চারটি ধরন পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ত্বকের অ্যানথ্রাক্স। যেখানে আক্রান্ত স্থান শুরুতে একটু উঁচু হয়ে ফুলে থাকে, চুলকানি থাকে যা পোকার কামড়ের মতো মনে হয়। খুব দ্রুতই সেটা মাঝে কালো হয়ে গিয়ে ব্যথাহীন দানায় পরিণত হয়। রোগটি প্রাণঘাতি নয়। দ্রুত এবং যথাযথ চিকিৎসা শুরু করা গেলে এটি একটি মৃদু রোগ হিসেবে সহজেই সেরে যায়। সংক্রমিত মাংস কাঁচা বা অসম্পূর্ণভাবে রান্না করে খেলে এ রোগ হতে পারে।

অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশুর মাংস খেয়ে পরিপাকতন্ত্রে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশে সাধারণত যেভাবে মাংস রান্না করে খাওয়া হয় তাতে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু টিকে থাকার আশঙ্কা খুবই কম। বিদেশে আংশিক রান্না করা অবস্থায় মাংস খাওয়া হয়, সেই পদ্ধতিতে রান্না করলে মাংসে জীবাণু থাকার আশঙ্কা থাকে। তবে বাংলাদেশে যেভাবে মাংস রান্না করা হয়, ওই পদ্ধতিতে রান্না করলে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু থাকার আশঙ্কা খুব কম। তবে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশুর মাংস না খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা (ইউএইচএফপিও) ডা. সুপ্রভা রানী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গাংনী হাসপাতালে প্রতিদিনই আমরা অ্যানথ্রাক্স রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছি। আমরা যাদের চিকিৎসা দিচ্ছি, এখানে যদি সুস্থ না হয়, তাহলে কুষ্টিয়া মেডিকেলে স্থানান্তর করছি। তবে সাধারণত এখানেই অনেকে সুস্থ হচ্ছেন। তবে রোগটির বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

মেহেরপুর গবাদিপশু পালনে উপযোগী অঞ্চল। বিখ্যাত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের খামার রয়েছে এখানে। অ্যানথ্রাক্সের কারণে খামারগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। গবাদিপশুর টিকা দেয়া হলেও রোগটি নির্মূল হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আরিফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গরু ও ছাগল পালনকারীদের সচেতনার অভাব রয়েছে। যারা কষ্ট করে অর্থ ব্যয় করে পশু পালন করছেন, তাদের আরো সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে অ্যানথ্রাক্সের টিকা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে আক্রান্ত পশুর মাংস খাওয়ার চিন্তা না করে অবশ্যই মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। আমরা গাংনী উপজেলার প্রতিটি গ্রামে গবাদিপশুর টিকা দেয়া নিশ্চিত করতে চাই। প্রতি বছর ব্যাপক হারে টিকা দেয়া হচ্ছে। তার পরও রোগটি নির্মূল হচ্ছে না।’

আরও