ভোটের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি, বাড়তি ভাড়া আদায়

বিভিন্ন স্থানে তীব্র যানজট

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আগামীকাল। এ উপলক্ষে সাধারণ ও সাপ্তাহিক মিলিয়ে চারদিনের ছুটি পেয়েছেন চাকরিজীবীরা—বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার। আর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য ছুটি শুরু হয়েছে মঙ্গলবার থেকেই।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আগামীকাল। এ উপলক্ষে সাধারণ ও সাপ্তাহিক মিলিয়ে চারদিনের ছুটি পেয়েছেন চাকরিজীবীরা—বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার। আর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য ছুটি শুরু হয়েছে মঙ্গলবার থেকেই। ভোট দেয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ ছুটিতে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে অনেকেই তাই নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় যাচ্ছেন। তবে এ ঘরমুখো মানুষের যাত্রাকে কেন্দ্র করে সড়কে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা। যানজট, পরিবহন সংকট, বাড়তি ভাড়া আদায়ের মতো নানা ঘটনা দুর্ভোগ বাড়িয়েছে গ্রামমুখী এসব মানুষের। সেই সঙ্গে পরিবহন সংকট থাকায় রাজধানীবাসীকেও বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে গতকাল।

সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এবং নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে গতকাল সকাল থেকেই অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ দেখা গেছে। সাভার ও গাজীপুরের মহাসড়কগুলোয় নামে ঘরমুখো মানুষের ঢল। তবে যাত্রীদের অভিযোগ, বাসের সংখ্যা কম থাকায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সুযোগ বুঝে বাস শ্রমিকরা দ্বিগুণ-তিন গুণ ভাড়া হাঁকাচ্ছেন। কোথাও কোথাও যানবাহনের ধীরগতি ও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রতিবাদে গতকাল সকাল ৯টার দিকে আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় নবীনগর-চন্দ্রা সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ যাত্রীরা। পুলিশের আশ্বাসে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে নেন।

এদিকে অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে গতকাল ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় থেমে থেমে যানজট সৃষ্টি হয়। দুপুর থেকে মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে সদর উপজেলার শিবপুর পর্যন্ত উত্তরবঙ্গগামী লেনে এ যানজট দেখা যায়।

হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. শরিফ জানান, নির্বাচনের দীর্ঘ ছুটিতে উত্তরাঞ্চলসহ আশপাশের ২৩ জেলার মানুষ যাতায়াত করছে। এতে দুপুরের পর থেকে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে থেমে থেমে যানজট হচ্ছে।

একইভাবে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। নবীনগর-চন্দ্রা সড়কের পলাশবাড়ী থেকে বাইপাইল, ইপিজেড ও চক্রবর্তী থেকে বাড়ইপাড়া পর্যন্ত সড়কেও সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশেও গতকাল তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এতে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

যানবাহন সংকটের পাশাপাশি বাড়তি ভাড়া আদায় করায় ক্ষুব্ধ হয়ে সড়ক অবরোধ করেন গাজীপুরের শ্রীপুর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। প্রায় আধাঘণ্টা অবরোধের জেরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

ঢাকা থেকে জামালপুরগামী যাত্রী কালাম হোসেন জানান, নন-এসি বাসের ভাড়া ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। কিন্তু সড়কে গাড়ি নেই। সে জন্য তিনি ৮০০ টাকায় টিকিট কিনে বাড়ি যাচ্ছেন।

এদিকে বাসে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া নেয়ার অভিযোগে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে অভিযান চালিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাসের নেতৃত্বাধীন একটি দল। এ সময় মানিকগঞ্জগামী সেলফি পরিবহনে সরকার নির্ধারিত ১৮৮ টাকার জায়গায় ৪০০ টাকা ভাড়া ও জলঢাকাগামী রানী পরিবহনে ৯৫০ টাকার ভাড়া ১ হাজার ২০০ নেয়ায় বাস দুটিকে জরিমানা করা হয়।

ঢাকা থেকে বের হওয়ার প্রবেশপথগুলোতে যখন মানুষের উপচেপড়া ভিড়, তখন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সড়কগুলো অনেকটাই ফাঁকা। চোখে পড়েনি চিরচেনা যানজট। ব্যক্তিগত যানবাহন চলেছে হাতেগোনা, আর গণপরিহন চলাচল ছিলও খুবই কম। এতে অফিসগামীদের বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও বাস না পেয়ে রিকশা, অটোরিকশা, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেলে চেপে গন্তব্যে পৌঁছেছেন। তবে এজন্য তাদেরকে অন্যান্য দিনের তুলনায় ‍দ্বিগুণ-তিন গুণ পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে। রাজধানীতে লোকাল বাসগুলোর সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা হলেও গতকাল ২০ টাকার নিচে ভাড়া নেয়নি বাসগুলো। এতে তীব্র ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবী মানুষ।

আব্দুল্লাহপুর-সদরঘাট রুটে চলাচল করে ভিক্টর ক্ল্যাসিক বাস। এ বাসে করে উত্তরা থেকে শাহজাদপুরে আসেন ষাটোর্ধ্ব বয়সী আব্দুর রাজ্জাক। সাধারণত ৩৫ টাকা ভাড়া হলেও তিনি ৮০ টাকা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়ি পাচ্ছিলাম না। পরে আজকের জন্য (গতকাল) ‘গেটলক’ সার্ভিস বলে উঠিয়ে তারা ৮০ টাকা ভাড়া নিয়েছে। গেটলক সার্ভিসের কথা বললেও রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তুলেছে। সড়কে মানুষের ব্যাপক চাপ থাকায় গাদাগাদি করেও অনেকে গন্তব্যে যেতে পারছে না।

মনিরুল ইসলাম নামের এক তরুণ রাজধানীর গুলশানে চাকরি করেন। ভোট দিতে নিজ জেলা ভোলায় যাচ্ছিলেন তিনি। নতুন বাজারে বাস না পেয়ে অটোরিকশায় চেপে সদরঘাটে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তবে ৩৫০ টাকায়ও কেউ যেতে রাজি হয়নি। তিনি বলেন, অটোরিকশাচালকরা ৫০০ টাকা চাচ্ছিল। সেজন্য তিনি অটোরিকশায় যান। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তিনিও ভিক্টর ক্ল্যাসিকের একটি বাসে করে সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা হন। সাধারণ সময়ে নতুন বাজার থেকে ৩০ টাকা ভাড়া হলেও গতকাল ৫০ টাকা করে আদায় করেন কন্ডাক্টাররা।

গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, বাড্ডা, রামপুরা, শ্যামলী, শিশুমেলা, আসাদগেট, ধানমন্ডি, বনশ্রী, রেলস্টেশনে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। দীর্ঘ সময় পর পর একটি লোকাল বাস থামলে মানুষের হুড়োহুড়ি চোখে পড়ে। দুই-চারজন ঠেলাঠেলি করে উঠতে পারলেও অনেকেই না পেরে আবার গাড়ির জন্য অপেক্ষা করেন। সব বাসই যাত্রীতে পরিপূর্ণ ছিল। এতে অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত থ্রিহুইলারে চেপেও অনেকে গন্তব্যে রওনা দেন। এসব যানবাহনও যাত্রীদের কাছ থেকে ‍ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্বাচন উপলক্ষে সরকারিভাবে বাস রিকুইজিশন দেয়া হয়েছে। এতে পরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে। বিপরীতে টানা ছুটি পাওয়ায় ঈদের মতো ঘরমুখো মানুষের ভিড় বাড়ায় পরিবহনের ওপর আরো চাপ বেড়েছে। ফলে রাজধানীতে চলাচল করা অনেক লোকাল বাস যাত্রী নিয়ে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে আরো পরিবহন সংকট তৈরি হয়েছে।

সড়ক ও রেলপথের মতোই চাপ ছিল নৌপথে। দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখো মানুষের পদচারণায় গতকাল মুখর ছিল সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। সকাল থেকেই সদরঘাটে পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জগামী লঞ্চের পন্টুনগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। বন্দরসংশ্লিষ্টরা জানান, দুপুরের পর থেকে যাত্রীর চাপ আরো বাড়তে শুরু করে, যা রাত পর্যন্ত ছিল।

অনেক যাত্রী জানান, আগেভাগেই তারা পরিবারের সদস্যদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন, এখন নিজে যাচ্ছেন। লঞ্চঘাটে স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যস্ততাও ছিল চোখে পড়ার মতো। মাইকে বারবার লঞ্চের অবস্থান ও নিরাপত্তা বার্তা প্রচার করা হচ্ছিল।

সদরঘাট নৌ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, ‘সদরঘাটে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সবাই যেন সুস্থ-সুন্দরভাবে বাড়ি পৌঁছাতে পারে এজন্য আমরা কাজ করছি। লঞ্চে বাড়তি ভাড়া বা কোনো বিশৃঙ্খলা চোখে পড়েনি এখনো। আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করছি সবাইকে সহযোগিতা করার জন্য।’

প্রসঙ্গত, জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে বুধ ও বৃহস্পতিবার সাধারণ ছুটি। শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ায় টানা চারদিনের ছুটি পেয়েছেন চাকরিজীবীরা। তবে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিনদিনের সাধারণ ছুটি পেয়েছেন।

আরও