কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের বালিমিশ্রিত জমিতে যে ফসল উৎপাদন হয়, তাতে পরিবারের চাহিদা মেটে না কৃষকের। ফলে জীবিকার জন্য বাড়তি উৎস খুঁজে নিতে হয়েছে স্থানীয়দের। এক্ষেত্রে তাদের আয়ের প্রধানতম উৎস হয়ে উঠেছে গবাদিপশু পালন। বিশেষ করে গরু পালন করে বন্যা, খরা, নদীভাঙনসহ প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগের সঙ্গে অনেকটা যুদ্ধ করেই জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রেখেছেন তারা। গরু বিক্রির বাড়তি আয়ে চলছে সংসার। ফলে চরাঞ্চলসহ জেলায় বেড়েছে গরুর সংখ্যাও।
কুড়িগ্রাম প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যমতে, জেলার নয় উপজেলায় ২০২০ সালের অক্টোবরে গরুর সংখ্যা ছিল আট লাখ। সে সংখ্যা চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩১ হাজার ৪৫২। তবে এ হিসাব খামারসহ বিভিন্ন বাড়িতে পালিত পশুর সংখ্যা। চরাঞ্চলগুলোতে পালিত গরুর হিসাব পাওয়া যায়নি।
জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ফুলকুমার, জিঞ্জিরামসহ ছোট-বড় ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় রয়েছে সাড়ে চার শতাধিক চরাঞ্চল। এসব চরাঞ্চলে বসবাস করছে এক লাখের বেশি কৃষক পরিবারের পাঁচ লাখের বেশি মানুষ। এসব মানুষের একমাত্র পেশা কৃষি। কিন্তু প্রতি বছর কয়েক দফা বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আবার খরায় পুড়ে যায় তপ্ত বালুচরের ফসল। নদ-নদীর ভাঙনে ভিটেবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে পাঁচ-ছয় হাজার পরিবার। এ পরিস্থিতিতে চরাঞ্চলের জমিতে ধান, কাউন, বাদামসহ শুধু মৌসুমি ফসল চাষ করে সংসার চলছে না তাদের। এ অবস্থায় নিজেদের টিকিয়ে রাখতে গবাদিপশু পালনই ভরসা হয়ে উঠেছে চরবাসীর।
কিন্তু গবাদিপশু পালনেও এখন নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে চরাঞ্চলের মানুষের। আগে চরাঞ্চলে চারণভূমি বা বাথানের সংখ্যা বেশি থাকলেও অব্যাহত নদীভাঙনে তা কমে গিয়েছে। নতুন জেগে ওঠা চরের কিছু বাথান বা বন্যার পর পড়ে থাকা জমিতে গজানো ঘাসই একমাত্র ভরসা গবাদিপশুর মালিকদের। চরাঞ্চলের কৃষকরা জানান, প্রতি বছর বন্যার তিন-চার মাস গরুসহ অন্যান্য গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হয় তাদের। কেননা এ সময়টাতে চরাঞ্চলের চারণভূমিগুলো বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে যায়। এ তিন-চার মাস গবাদিপশুকে সঞ্চিত খাবার খাওয়াতে হয় তাদের। আর বড় বন্যা হলে চরাঞ্চলের ঘরবাড়িতেও গবাদিপশু রাখা সম্ভব হয় না। তখন নৌকা ভাড়া করে পালিত গবাদিপশুকে উঁচু বাঁধ বা উঁচু এলাকার আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে রাখতে হয় তাদের। পাশাপাশি গো-খাদ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বেশি দামে কিনতে হয় খড়সহ ফিড। এতে গবাদিপশু পালনে খরচও বেড়ে যায়।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকার খেয়ার আলগার চরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার তিন শতাধিক কৃষক পরিবারে একাধিক গরু রয়েছে। বাড়িগুলোতে গরুর সংখ্যা ২ থেকে ২৫টি। কারো কারো বাড়িতে গরুর সঙ্গে পালিত হচ্ছে মহিষ, ছাগল ও ভেড়া।
এ চরের বাসিন্দা সাজেদুল হক (৬২) বলেন, তার বাড়িতে বর্তমানে ১৩টি গরু, ১০টি ছাগল ও পাঁচটি মহিষ রয়েছে। এর মধ্যে গাভী রয়েছে ছয়টি। গাভী থেকে পাওয়া দুধ নিজেরা খাওয়ার পরও কিছু অংশ বাজারে বিক্রি করা যায়। পালিত এসব গরু-মহিষ দিয়ে নিজেদের জমিতে হালচাষও করেন। প্রতি বছর গরু-ছাগল বিক্রি করেই তার আয় হয় ২ লাখ টাকার ওপরে। চরের জমিতে চাষাবাদ করে কোনো রকমে খাবার জোগাড় হয়। অনেক সময় বেশি বন্যা হলেও বা নদীভাঙনের কবলে পড়লে গরু-ছাগল বিক্রির টাকাই বড় সহায়ক হিসেবে কাজে লাগে।
যাত্রাপুর ইউনিয়নের রলাকাটার চরের শমসের আলী মুন্সি জানান, এ পর্যন্ত আটবার ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের কবলে পড়তে হয়েছে তাকে। বর্তমানে ২২ জনের পরিবার নিয়ে পাঁচ বছর ধরে রলাকাটার চরে বসবাস করছেন। চরে ৬০ বিঘার ওপর জমি রয়েছে। কিন্তু সে জমিতে তেমন আবাদ হয় না। যা হয় তা দিয়ে সারা বছর খাদ্যের জোগান দেয়া সম্ভব হয় না। এজন্য গরু পালনে জোর দিয়েছি। এখন তার গোয়ালে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫টি গরু রয়েছে। কিন্তু বাথান কমে যাওয়ায় গরু পালনেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। বন্যায় আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এক হাজার খড়ের আঁটি কিনতে হচ্ছে ৬-৭ হাজার টাকায়। তবুও চরের মানুষের সম্পদ বলতে গরুই। কেননা আবাদি জমি নদীতে চলে গেলেও গরু রক্ষা করা সম্ভব। গরু বিক্রির টাকায় আপদ-বিপদ থেকে মুক্তিও পাওয়া যায়।
একই অবস্থা ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকার চরাঞ্চলসহ অন্যান্য নদ-নদীর অববাহিকার সাড়ে চার শতাধিক চরের। রোগব্যাধি কম হওয়ায় এসব চরে দেশী জাতের গরুই লালন-পালন করছে চরবাসী।
জেলা প্রাণিম্পদ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) ডা. মো. ইউনুছ আলী জানান, জেলার কৃষকদের গরু পালনে উৎসাহিত করায় গরুর সংখ্যা বেড়েছে। বড় বা দীর্ঘমেয়াদে বন্যার সময় চরাঞ্চলের কৃষকদের মাঝে সরকারিভাবে গো-খাদ্য বিতরণ করা হয়।