জলবায়ু অভিঘাত মোকাবেলায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে

-ড. ফাহমিদা খাতুন

সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

জলবায়ু পরিবর্তনের যে সংকটের মধ্যে আমরা রয়েছি, তার জন্য বাংলাদেশ প্রধানত দায়ী নয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ধরনের নীতিমালা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়, অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে, উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে এতদিন আমরা যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলে এসেছি, সেই প্রবৃদ্ধির হিসাবের মধ্যে পরিবেশগত সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হলে আমাদের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বা জিডিপির পরিমাণ অনেক কম হতে পারে।

প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কারণে মানুষের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যায়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। তাই জলবায়ু পরিবর্তনকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত শুধু উৎপাদন কমিয়ে দেয় না, এটি আমাদের ব্যালান্স অব পেমেন্টস, বাণিজ্যনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলে।

জলবায়ু পরিবর্তনের যে সংকটের মধ্যে আমরা রয়েছি, তার জন্য বাংলাদেশ প্রধানত দায়ী নয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে কার্বননির্ভর ও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক ছিল। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে যে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, তার অভিঘাত এখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে বহন করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য প্রশমনের চেয়ে অভিযোজন গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ। সরকার এখানে প্রাথমিক অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার সব ব্যয় শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে বহন করা সম্ভব নয়। অন্যান্য দেশের মতো আমাদেরও ক্রমে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমরা যদি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখতে চাই, তাহলে পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সকে অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত প্রধান ভূমিকা পালন করবে। সরকারকে নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা, অর্থায়নের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

বিশ্বের মোট গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের তুলনায় বাংলাদেশের অবদান প্রায় দশমিক ৪ শতাংশ। তারপরও আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলা করতে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় আমাদের নিঃসরণ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে এখন থেকেই পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এজন্য বাংলাদেশ তার ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনসের (এনডিসি) মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এনডিসির তৃতীয় পর্যায়ে নিঃসরণ কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে ২০ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাসের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে বা আনকন্ডিশনাল লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বিদেশী অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সহায়তা পাওয়া গেলে অতিরিক্ত ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। অভিযোজন ও প্রশমন—দুই ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের (কপ) মতো বৈশ্বিক আলোচনায় উন্নত দেশগুলো বিভিন্ন ধরনের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতখানি হচ্ছে? আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের বড় অংশ প্রশমনের জন্য বরাদ্দ হয়। এসব আলোচনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ অর্থ প্রশমনের জন্য এবং ৩৫ শতাংশ অভিযোজনের জন্য বরাদ্দের চিত্র দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে অভিযোজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে যেকোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ফলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলা, মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অভিযোজনের জন্য অর্থায়ন বাড়ানো জরুরি।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাজারসুবিধা এবং বাণিজ্যিক শর্তের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে হলে পরিবেশগত মানদণ্ড ও কমপ্লায়েন্সের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশে প্লাটিনাম ও গোল্ড সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব কারখানা রয়েছে। এটি ইতিবাচক অগ্রগতি। আমরা একটি সমীক্ষায় দেখেছি কারখানাগুলো কীভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার এবং সবুজ রূপান্তরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বড় কারখানাগুলো এক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। তারা বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স পূরণ করছে এবং সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার সক্ষমতাও তাদের তুলনামূলকভাবে বেশি। সমস্যা হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে। সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হলে শুরুতেই বড় অংকের বিনিয়োগ করতে হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেরই সেই বিনিয়োগ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই। আবার বিনিয়োগ করলেও তার ব্যয় বহন করে দীর্ঘমেয়াদে লাভ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার মতো সক্ষমতাও অনেকের নেই।

বাংলাদেশ সরকারের জলবায়ু বাজেট রয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারি অর্থায়নের কিছু ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এর পরিমাণ কম। অন্যদিকে, বেসরকারি খাত যখন কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করে, তখন তারা সাধারণত এমন ক্ষেত্র বেছে নেয়, যেখান থেকে আর্থিক মুনাফা আসে। কিন্তু অভিযোজনের অনেক প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরাসরি আর্থিক মুনাফা পাওয়া যায় না। এ কারণে অভিযোজনের ক্ষেত্রে সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে শুনেছি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেও তারা সব সময় পণ্যের জন্য বাড়তি দাম পায় না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণ করলেই যে ক্রেতারা বেশি দাম দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য সুরক্ষা, বিধিনিষেধ এবং অভ্যন্তরীণমুখী নীতির প্রবণতা বাড়ছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর জন্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদের দক্ষতায় বিনিয়োগ করতে হবে। এটিকে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধির কৌশল হিসেবেও দেখতে হবে।

আরও