একদিকে মাসব্যাপী বন্যায় আক্রান্ত নোয়াখালী। এর মধ্যেই ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। চলতি মাসে শুধু ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৪০০ রোগী। যদিও হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে অনুমোদিত শয্যা রয়েছে মাত্র ২০টি। তবে সেখানে ভর্তি রয়েছে ২৮০ জন। এর মধ্যে গতকাল ভর্তি হয়েছে শতাধিক, যার এক-তৃতীয়াংশই শিশু।
গতকাল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু বিভাগের ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় তিল পরিমাণ ঠাঁই নেই। বেড ছাড়িয়ে রুম, বারান্দা ও করিডোরের মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে রোগীরা। কক্ষগুলোর সামনের করিডোরে দুটি গলি করে বিছিয়ে দেয়া হয়েছে ফোম আর সাদা চাদর। সেখানেই চিকিৎসা নিচ্ছে শত শত রোগী। এসব বেডে নেই স্যালাইন স্ট্যান্ড। অনেকে রোগীর হাতে ক্যানোলা লাগিয়ে স্যালাইন নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেউ জানালার সঙ্গে বেঁধে রেখেছে।
লাইলুন নাহার নামে এক অভিভাবক জানান, ছয়দিন আগে তার দুই বছরের মেয়ে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়। প্রথমে তাকে সুবর্ণচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়। দুদিনেও তার কোনো উন্নতি না হওয়ায়, চারদিন আগে তাকে ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এখন মেয়ে অনেকটাই ভালো।
তিনি বলেন, ‘এখানে এত বেশি পরিমাণ রোগী, অনেকে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও ওয়ার্ড বয় নেই। পুরো একটি ওয়ার্ডে মাত্র একটি টয়লেট। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আসেন দিনে একবার। নার্স যে কজন রয়েছেন তাও অপর্যাপ্ত।’
তবে আবদুল হক নামে আরেকজন অভিযোগ করেন, এখানে আয়া, বয় সবাই বেডের জন্য ১০০-২০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন। নার্সদের ডাকলেও পাওয়া যায় না। কিছু নার্স রয়েছেন, তারাও টাকা চান। টাকা দিলে তারপর ইনজেকশন দিতে আসেন। তবে বেশির ভাগ নার্স চেষ্টা করেন দ্রুত আসার জন্য। অবশ্য রোগী বেশি হওয়ায় তারাও হিমশিম খাচ্ছেন। এখানে শুধু স্যালাইন দেয়া হচ্ছে। অন্যসব ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে তাদের। এমনকি স্যালাইনের পাইপও বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসাবে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে অনুমোদিত শয্যার সংখ্যা মাত্র ২০টি। তবে কর্তৃপক্ষ সেখানে ৪০টি পর্যন্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে ২০টি শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছে ২৮০ জন। যার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ শূন্য থেকে ১০ বছরের শিশু। সরকারিভাবে শয্যা হিসাবে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। তার পরও সরকারি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের সহযোগিতায় সর্বোচ্চ ওষুধ দেয়া হচ্ছে।
মূলত চলতি মাসের শুরু থেকেই রোগী বাড়তে থাকে। সবচেয়ে বেশি রোগীর চাপ দেখা দিয়েছে গত এক সপ্তাহ ধরে। গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত একদিনে ভর্তি হয়েছে শতাধিক। সব মিলিয়ে বর্তমানে ভর্তি রয়েছে ২৮০ জন। শয্যার বাইরে, রুম, বারান্দা ও করিডোরের মেঝেতে রাখার পরও রোগীর চাপ সামলাতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাশের একটি নির্মাণাধীন সার্ভিস ভবনের তৃতীয় তলার বিভিন্ন কক্ষের মেঝেতেও রোগী রয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী এক মাসে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ১ হাজার ৪০০ জন।
এ ব্যাপারে নোয়াখালী সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গতকাল জেলার আটটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ১৮৪ জন। সেখানে পর্যাপ্ত ওষুধ ও লোকবল রয়েছে। ফলে কোনো প্রকার বেগ পেতে হচ্ছে না। জেলার প্রধান এ চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রতিদিন বাড়ছে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এতে চিকিৎসা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের। রোগী অনুপাতে ওষুধ একেবারেই কম। ফলে রোগীদের বাইরে থেকে তা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। হাসপাতালে নিরাপদ পানির সংকটও রয়েছে। পানিও বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে রোগীদের।’
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিদিন ৮০-১০০ জন করে রোগী ভর্তি হচ্ছে। তাদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ শিশু। যাদের বয়স শূন্য থেকে ১০ বছর। রোগীর চাপের কারণে চিকিৎসক, নার্স ও সহযোগী স্টাফরা ৩০ ঘণ্টাও ডিউটি করতে হচ্ছে। ওষুধ যা রয়েছে সবকিছুই রোগীদের মাঝে দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে ওষুধ প্রশাসন, রোগী কল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্নভাবে ওষুধ সরবরাহ করছে। তার মাঝেও কিছু কিছু ওষুধ রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। তবে আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে লোকবলও কম। তার পরও দেখা গেছে অনেককে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে অতিরিক্ত ডিউটি করতে হচ্ছে।’