বিনিয়োগে স্থবিরতা, বাজারে চাহিদার সংকোচন ও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতিতে দেশের উৎপাদনমুখী ভারী শিল্প খাতের ভিত ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। কমছে শিল্পের প্রধান কাঁচামাল আমদানি। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় চাহিদা কম থাকায় বাড়ছে অবিক্রীত পণ্যের মজুদ। এর সঙ্গে জ্বালানি সংকট ও বাড়তি ব্যয় উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে উৎপাদন, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব আরো বাড়তে পারে।
কাচ বা গ্লাস শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল সোডা অ্যাশ ডেনস। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উন্নত মানের ফ্ল্যাট গ্লাস, কনটেইনার গ্লাস ও ফাইবার গ্লাস উৎপাদনে সিলিকা বালির পাশাপাশি অপরিহার্য এ উপাদান ব্যবহার করা হয়। দেশে কাচ শিল্পে ব্যবহৃত সোডা অ্যাশ ডেনসের সম্পূর্ণ চাহিদাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।
দেশের সব কাস্টম হাউজ ও শুল্ক স্টেশনের আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) দেশে সোডা অ্যাশ ডেনস আমদানি হয়েছে মাত্র ২৯ হাজার ৬১৪ টন। অথচ আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৯৮ হাজার ৭৯০ টন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কাচ শিল্পের অন্যতম এ কাঁচামাল আমদানি কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ।
কাচ শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে উৎপাদন সক্ষমতা অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের কারণে রফতানি বাজারেও টিকে থাকা কঠিন হচ্ছে। কাচ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি গ্যাসের পেছনেই মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ খরচ হয়। অথচ নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকায় এবং গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিযোগী দেশগুলোয় জ্বালানি ও কাঁচামালের ব্যয় তুলনামূলক কম। অনেক দেশে সোডা অ্যাশের মতো কাঁচামালও স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশের বড় কাচ উৎপাদকদের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক প্রায় দুই হাজার টন। বিপরীতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ৮০০ টন। চাহিদা কমলেও উৎপাদন বন্ধ রাখা কঠিন। কারণ কাচ উৎপাদনের ফার্নেস একবার চালু করলে সাধারণত টানা ১০-১২ বছর সচল রাখতে হয়। ফলে পণ্য বিক্রি কমলেও ফার্নেস চালু রাখা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও বিকল্প ব্যবস্থা বজায় রাখার ব্যয় বহন করতে হয় উদ্যোক্তাদের।
পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উদ্যোক্তারা সাধারণত বিনিয়োগ না করে বসে থাকতে পারেন না, আমরাও পারিনি। কিন্তু এখন পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়েই স্ট্রাগল করতে হচ্ছে। আমাদের কারখানায় উৎপাদিত কাচও ভালো পরিমাণ ডিসকাউন্ট দিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। একদিকে অবকাঠামো খাতের গতি কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতির কারণে বাজারের চাহিদা দুর্বল, অন্যদিকে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দামও অনেক বেড়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের এ বাড়তি চাপ সামাল দেয়ার মতো পরিস্থিতিও নেই।’
লজিস্টিকস ও জ্বালানির উচ্চ ব্যয়ে রফতানির সুযোগ কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়েছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এখন কারখানা চালু রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। কাচ কারখানা ইচ্ছা করলেই বন্ধ রাখা যায় না। ফার্নেস সার্বক্ষণিক সচল রাখার পাশাপাশি উৎপাদনে মূল্য সংযোজন ও বিকল্প ব্যবস্থা বজায় রাখতে হয়। এসব মিলিয়ে এ খাতে আমাদের বিনিয়োগ ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি কবে হতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেলে উদ্যোক্তারা বিদ্যমান বিনিয়োগ ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগেও আগ্রহী হতেন। উৎপাদনের ভিত দুর্বল হলে কর্মসংস্থানসহ অর্থনীতির অন্যান্য সূচকও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নির্বাচিত সরকারের কাছে উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা অনেক। সরকারও পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে উৎপাদন খাতকে টিকিয়ে রাখতে শুল্ক, ভ্যাট ও কর আরো যৌক্তিকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বাজার প্রতিকূল থাকলে উচ্চ শুল্ক-কর উৎপাদকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।’
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ইস্পাতের প্রধান কাঁচামাল পুরনো লোহার টুকরা আমদানি হয়েছে ১৮ লাখ ৬১ হাজার টন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২০ লাখ ৮৭ হাজার টন। সে হিসাবে আমদানি কমেছে ২ লাখ ২৬ হাজার টন বা প্রায় ১১ শতাংশ।
ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়লে উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি আসবে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো জরুরি। কিন্তু চাহিদা ও বিক্রি কমার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাপে রয়েছে শিল্পকারখানাগুলো।
বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমীর আলীহুসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে চাহিদা সংকুচিত হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্পের ওপর। শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হলে উদ্যোক্তারা নানা দিক থেকে চাপে পড়েন। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেরই ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যাংক ঋণ রয়েছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই ব্যবসা টেকসই রাখা কঠিন হবে। একপর্যায়ে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের দায়ও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। আগের মতো পণ্য বিক্রি করা যাচ্ছে না। বিক্রি ধীর হয়ে যাওয়ায় ইস্পাত খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানের অবিক্রীত পণ্যের মজুদ বেড়েছে। আবার যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে, সেগুলোও তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারের এ পরিস্থিতির প্রতিফলন পড়েছে কাঁচামাল আমদানিতেও।’
তিনি আরো বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কৌশল নিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে বেশি দামে জ্বালানি তেল ও গ্যাস কিনতে হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলংকার তুলনায় বাংলাদেশ অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এতে শিল্পের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও চাপে পড়ছে। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কোথায় কমানো সম্ভব, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নে ভারসাম্য আনা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে তুললে শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি আনা সম্ভব। কারখানার বাইরের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।’
সিমেন্ট শিল্পের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার। ভারী শিল্প খাতের গুরুত্বপূর্ণ এ কাঁচামালের আমদানিও কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) দেশে ক্লিংকার আমদানি হয়েছে ৫৮ লাখ ৮৯ হাজার টন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৬১ লাখ ১০ হাজার টন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সিমেন্ট ক্লিংকারের আমদানি কমেছে সাড়ে ৩ শতাংশ।
উৎপাদনমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য অস্বস্তিকর বলে মনে করেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি ও প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিমেন্ট খাতেও এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। অন্যান্য শিল্পেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়লেও উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। ডলার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যাতে নতুন করে চাপ তৈরি না হয়, সেজন্য এখন থেকেই কৌশলগত প্রস্তুতি নিতে হবে। আমদানি কমার এ প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব বাড়তে পারে। উৎপাদনমুখী শিল্প খাতকে শক্তিশালী করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়ে সরকার যথেষ্ট মনোযোগী। সংকট রয়েছে, তবে কৌশলী পদক্ষেপের মাধ্যমে তা মোকাবেলা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়লে উৎপাদন বাড়ে। আর উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ে কর্মসংস্থান ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি।’