নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, দুর্বল স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতায় ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করছে বাংলাদেশ। শিশুদের টিকাদানের হার কমে যাওয়ার পরিণতি কতটা মারাত্মক হতে পারে, বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি এখন তারই উদাহরণ হয়ে উঠেছে। প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালানো হলেও বিপুলসংখ্যক শিশুকে সময়মতো টিকার আওতায় আনতে না পারায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে রয়টার্স বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২ লাখ ২ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২২ হাজার রোগীর সংক্রমণ পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে। এ সময়ে হামে মারা গেছে ১ হাজার ১৪৭ জন। মৃতদের ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে কোনো দেশে এটিই সর্বোচ্চ হামে সংক্রমণের সংখ্যা।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অর্জিত অগ্রগতি সাম্প্রতিক সময়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতি, টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ও নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে বহু শিশু প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে শিশুদের মধ্যে হামের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। পরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি কর্মসূচির ওপর নির্ভর করতে হয় সরকারকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজের টিকাদানের হার ছিল ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৯৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে যথাক্রমে ৯০ ও ৮৬ শতাংশে দাঁড়ায়। অথচ হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের সামগ্রিক হার বেশি থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থাকলে সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ের গড় হিসাব দিয়ে টিকাদান কর্মসূচির প্রকৃত দুর্বলতা সব সময় বোঝা যায় না। কোন এলাকায় কত শিশু টিকা পায়নি, তাদের কীভাবে শনাক্ত করা হবে এবং কীভাবে তাদের কাছে সেবা পৌঁছানো যাবে—এসব তথ্য নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা জরুরি।
প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু করে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল ও মে মাসে এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেয়া হয়। তবে এত বড় কর্মসূচি পরিচালনার পরও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকাবিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট রয়টার্সকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রতিটি দেশের জন্যই একটি বাস্তব সতর্কবার্তা। রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার চেয়ে নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে আগেই তা প্রতিরোধ করা সহজ, নিরাপদ ও কম ব্যয়বহুল।’
রয়টার্সের প্রতিবেদনে সিলেট অঞ্চলের কয়েকটি পরিবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দুই বছর বয়সী আরমান হোসাইন ও নয় মাস বয়সী লাবিবা আক্তার হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তাদের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুরা হামের টিকা পায়নি। এ ঘটনা দুর্গম এলাকার শিশুদের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগে বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শেষ দিকে নতুন টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। তবে সব শিশুকে শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
হামের টিকাদান কর্মসূচিতে সাধারণত ছোট শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এ বয়সী শিশু। এ কারণে শুধু নির্দিষ্ট বয়সী শিশুদের টিকা দেয়ার পাশাপাশি আগে টিকা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকা নেয়া শিশুদের শনাক্ত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদানের ঘাটতি, শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে সীমাবদ্ধতা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর সমস্যাগুলো উঠে এসেছে। ফলে দেশীয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আগের সতর্কবার্তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমটির অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ মিল দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের হামের প্রাদুর্ভাব শুধু জরুরি টিকাদান কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা নয়, বরং নিয়মিত টিকাদান, স্বাস্থ্যকর্মী ব্যবস্থাপনা, নির্ভুল তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা পৌঁছানোর সক্ষমতার ঘাটতিও সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান ও দেশীয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আগের সতর্কবার্তা একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে—টিকাদান কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নিশ্চিত করতে হলে কোনো শিশুকেই বাদ রাখা যাবে না।