চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে সরিষার আবাদ গত বছরের তুলনায় বেশি হয়েছে। তাই মধু আহরণের মাত্রাটাও গত বছরের চেয়ে বেশি হবে। এ বছর প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকার মধু আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি দপ্তরসহ সংশ্লিষ্টরা।
মধু উৎপাদন বাড়ার কারণ হিসেবে কৃষিবিদরা বলছেন, রিলে ক্রপিং পদ্ধতিতে সরিষা চাষের কারণে কৃষক ধান কাটার আগ মুহূর্তে সরিষার আগাম বীজ বপন করতে পারছেন। গত বছরের মতো চলতি মৌসুমে ধানের মধ্যে সরিষার আবাদে রিলে ক্রপিং পদ্ধতির অনুসরণ করায় মধু আহরণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রিলে ক্রপিংয়ের কারণে ২০২১-২২ মৌসুমের চেয়ে ২০২২-২৩ মৌসুমে সরিষা আবাদ প্রায় আট গুণ বেড়েছিল। মধু উৎপাদন হয়েছিল ৭ কোটি টাকার। গত বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এ বছর তা আরো বেড়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২১-২২ মৌসুমে রাজশাহীতে সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৪ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ২ হাজার ১৬০ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৯১৬টি মৌবক্স স্থাপন করা হয়। তা থেকে ২১ হাজার ২৭৭ কেজি মধু উৎপাদন হয়। ২০২২-২৩ মৌসুমে ৭৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে ৩ হাজার ৯২২ হেক্টর জমি থেকে মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। এসব জমিতে ১ হাজার ৯১৬টি বাক্স স্থাপনের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে মৌবাক্স স্থাপিত হয় ৩ হাজার ৯৬৫টি। এ থেকে আহরিত হয় ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৬০ কেজি মধু, যা প্রতাশ্যার চেয়ে ছিল আট গুণ বেশি। চলতি মৌসুমে সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমি থেকে মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এতে সম্ভাব্য ১ লাখ ৮০ হাজার কেজি কেজি মধু উৎপাদন হবে বলে আশা করছেন রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
মৌচাষী ও কৃষিবিদরা জানান, চলতি (২০২৩-২৪) মৌসুমে আগের তুলনায় তিন হাজার হেক্টর বেশি জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এ কারণে মধু আহরণের পরিমাণও বাড়বে এবার। ডিসেম্বরেই মধু আহরণ শুরু করেন মৌয়ালরা। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ দিক থেকে মধু আহরণের পরিমাণ বাড়ে। মধু আহরণ এখন প্রায় শেষের পথে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে নয়টি উপজেলায় মধু আহরণ করা হয়। এ বছর নয়টি উপজেলায় ১১১ জন মৌয়াল সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমিতে ৪ হাজার ১৮৫টি মৌবাক্স স্থাপন করেছিলেন। এখন পর্যন্ত মধু আহরিত হয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৫০০ কেজি মধু; যার বাজারমূল্য প্রায় ৯ কোটি ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর পরিমাণ আরো বাড়বে বলেও আশা সংশ্লিষ্টদের। নয়টি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আহরিত হয় মোহনপুর উপজেলায়। এ উপজেলায় ৫০ চাষী ৯২০টি বাক্স স্থাপন করেন। এছাড়া দুর্গাপুর, পুঠিয়া ও গোদাগাড়ীতে গড়ে ১৩-১৪ জন মৌয়াল মধু আহরণ করছেন। বাকি উপজেলাগুলোয় তিন থেকে পাঁচজন মৌয়াল মধু আহরণের কাজ করছেন।
গোদাগাড়ী উপজেলার মৌয়াল আতাউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৪৫টি বক্সে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ মণ মধু আহরণ করেছি। গত বছর মধু আহরণ করেছি ২০ মণ। এবার দ্বিগুণেরও বেশি মধু আহরণ করেছি। বাজারে মধু বিক্রি করছি কেজিপ্রতি ৪৫০-৫০০ টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে কমপক্ষে ৫-৭ লাখ টাকা আয় হতে পারে। আর কয়েকদিন পর দিনাজপুর যাব লিচুর মধু আহরণের জন্য। গত বছর লিচুর মধু আহরণ করেছি প্রায় ১০ মণ।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজদার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরিষায় রিলে ক্রপিং পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে ২০২১-২২ মৌসুমের চেয়ে ২০২২-২৩ মৌসুমে ৮ গুণ বেশি মধু আহরণ হয়। ২০২৩-২৪ মৌসুমে সরিষার আবাদ বেড়েছে। এবার সরিষায় ফুল আসার মাত্র ৭-১০ দিনের মাথায় মৌচাষীরা মধু আহরণ করতে পেরেছেন। সরিষার ফুল যত বেশি হবে, মৌমাছি তত বেশি মধু উৎপাদন করতে পারে। এতে সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে বাণিজ্যিকভাবে মৌচাষীরাও প্রচুর লাভবান হয়েছেন। এ বছর রাজশাহীতে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকার মধু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে, যা বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।’