দেশের উপকূলবর্তী এলাকায় কৃষিজমিতে লবণাক্ততার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে উপকূলের পর এখন সমতলের জমিতেও লবণাক্ততার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বর্তমানে দেশের ১১ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) ২০০৯ সালের শুমারি (সেন্সাস) অনুযায়ী, আক্রান্ত জমির পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার ২০০ হেক্টর। অর্থাৎ দেড় দশকে লবণাক্ত জমির পরিমাণ এক লাখ হেক্টরের মতো বেড়েছে। এসআরডিআইয়ের সর্বশেষ (২০২৪) শুমারিতে এ পরিস্থিতি উঠে এসেছে। আজ বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস উপলক্ষে শুমারির ফল ঘোষণার কথা রয়েছে।
এসআরডিআই সূত্রে জানা যায়, নতুন শুমারিতে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী, মুকসুদপুর ও যশোর সদর উপজেলায় তীব্র লবণাক্ততায় আক্রান্ত জমি পাওয়া গেছে। এ উপজেলাগুলোকে নতুন করে ম্যাপিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। এতে জাতীয়ভাবে লবণাক্ততায় আক্রান্ত ম্যাপিংয়ের আওতায় এসেছে ১০৬টি উপজেলা। শুমারি চলাকালে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা ও মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলায় ‘সামান্য’ এলাকার মাটিতে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। তবে আক্রান্ত জমির পরিমাণ খুবই কম বলে জাতীয়ভাবে ম্যাপিংয়ে না এনে স্থানীয় ম্যাপিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি এ দুই জেলা আক্রান্ত হওয়ার অতি উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সেজন্য সরকারকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
লবণাক্ততা পরিমাপে ব্যবহার করা হয় ডেসিসিমেন্স একক। প্রতি মিটারে লবণাক্ততার তীব্রতাকে ডেসিসিমেন্স পার মিটার বা ডিএস/এম দিয়ে বোঝানো হয়। লবণাক্ততার ভিত্তিতে জমিকে পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। ডিএস/এম ২-এর নিচে হলে তাকে ‘অলবণাক্ত’ বলা হয়। ২ থেকে ৪-এর মধ্যে থাকলে সেই জমি ‘খুব সামান্য লবণাক্ত’। ৪ দশমিক ১ থেকে ৮ পর্যন্ত মাত্রার জমিকে বিবেচনা করা হয় ‘সামান্য লবণাক্ত’ হিসেবে। ৮ দশমিক ১ থেকে ১২ পর্যন্ত ‘মধ্যম লবণাক্ত’ আর ডিএস/এম ১২ দশমিক ১ থেকে ১৬-এর নিচে থাকলে সেই জমি ‘অধিক লবণাক্ত’। স্কোর ১৬-এর বেশি হলে জমিটি ‘অত্যন্ত লবণাক্ত’। তবে ৪ ডিএস/এম মাত্রাকে জমির জন্য স্বাভাবিকই বিবেচনা করা হয়। এমন জমিতে ‘লবণাক্ততা সংবেদনশীলতা’ ব্যতীত সব ধরনের ফসলই চাষ করা যায়।
এসআরডিআইয়ের নতুন শুমারি অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকায় ১৭ লাখ ৩ হাজার ৭৫৯ হেক্টর চাষযোগ্য জমি রয়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখ ৫৬ হাজার তথা ৬৮ শতাংশ জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। ২০০৯ সালে এ হার ছিল ৫৩ শতাংশ। এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৬০ হেক্টর জমি ‘অত্যন্ত লবণাক্ত’। ‘অধিক লবণাক্ত’ জমির পরিমাণ ২ লাখ ৮০ হাজার ৮০ হেক্টর। ‘মধ্যম লবণাক্ত’ শ্রেণীর চাষযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ ২ লাখ ৬৫ হাজার ৮৮০ হেক্টর। ‘সামান্য লবণাক্ত’ জমি ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৮০ হেক্টর। আর ‘খুব সামান্য’ লবণাক্ত জমির পরিমাণ ১ লাখ ৭৩ হাজার ৪০০ হেক্টর।
খুলনায় অবস্থিত লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অমরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক জায়গায় তীব্র লবণাক্ততার প্রমাণ মিলেছে। এতে উপকূলের অনেক জায়গায় শুকনো মৌসুমে চাষাবাদ হচ্ছে না। তবে সেখানে মিঠাপানির ব্যবস্থা করা গেলে লবণাক্ত জমিতেও চাষাবাদ সম্ভব। খুলনা অঞ্চলে কৃষিজমিতে মিঠাপানি সরবরাহের জন্য বিএডিসি একটি খাল খনন করছে। আশা করছি এটি হলে অনেক জমির উৎপাদন বাড়বে।’
মাটির লবণাক্ততা মূল্যায়ন ও ম্যাপিং ২০২৪-এ বেশকিছু উদ্বেগজনক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। গবেষকরা বলছেন, অলবণাক্ত ও ‘খুব সামান্য লবণাক্ত’ চাষযোগ্য জমি দিন দিন কমছে। বাড়ছে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা। তুলনামূলকভাবে উপকূলীয় দক্ষিণ-মধ্য অঞ্চলের কিছু অংশ (বরিশাল বিভাগের বরগুনা ও পটুয়াখালী ছাড়া এবং নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী বাদে) কম লবণাক্ততার শিকার হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এ অঞ্চলে পদ্মা ও নিম্ন মেঘনা থেকে স্বাদু পানির যথেষ্ট প্রবাহ রয়েছে।
উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গড়াই, মধুমতী, কপোতাক্ষ প্রভৃতি নদীর স্বাদু পানির প্রবাহ কমে গেছে। এ কারণে অনেক এলাকায় উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা দেখে দিয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন কমছে। লবণাক্ততার বিস্তার গোপালগঞ্জ ও যশোর জেলার নিম্নাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী, মুকসুদপুর ও যশোর সদর—এ তিন উপজেলা নতুনভাবে আক্রান্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে লবণাক্ততা দেশের মধ্যাঞ্চলের দিকে বিস্তৃত হতে পারে। এক্ষেত্রে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা ও মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলা হতে পারে পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা।
দেশে ১৯৭৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত লবণাক্ত জমির পরিমাণ বৃদ্ধির হার ছিল ২২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এ হার ৩ দশমিক ৫ এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আমীর মো. জাহিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা ও মাগুরার মোহাম্মদপুর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’
মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, দেশের নয়টি উপজেলায় ৪০ ডিএস/এমের ওপরে লবণাক্ততা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বাগেরহাটের রামপালে ৬৪ ডিএসএম পর্যন্ত লবণাক্ততার তথ্য মিলেছে। যদিও একটি মাত্র জায়গায় ৬৪ ডিএস/এম পাওয়ায় এটির সঙ্গে অন্য এলাকার সংযোগ টানতে চাইছেন না বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, ৪০-এর ওপরে মাত্রা যেখানে সেগুলোই মূলত অ্যালার্মিং বিষয়। রামপালের বিষয়টিকে তারা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ভাবছেন।
বিজ্ঞানীরা উদ্বেগ জানিয়ে বলছেন, উপকূলীয় এলাকার মাটি আগের মতো উর্বর নেই। ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা শুধু কৃষি উৎপাদন কমাচ্ছে না, বরং গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপও তৈরি করেছে। তাই কৃষককে যুক্ত করে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আবেদীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাধারণত ৪ ডিএস হলে আমরা তাকে লবণাক্ততা বলি। ধান সর্বোচ্চ ১০ ডিএস পর্যন্ত ফলন দেয়। দুই-একটি জাত ১৫ ডিএস পর্যন্ত টিকে যায়। ১০ ডিএস পর্যন্ত ধান ফলন দিলেও সেখানে অন্য ফসল চাষ করা যাচ্ছে না। সেজন্য লবণাক্ততা বৃদ্ধি খুবই উদ্বেগের বিষয়। এটি অন্য ফসলের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।’