কর্মনৈতিকতাহীনতা ও খোয়াবের বাংলাদেশ

জার্মানি—ইউরোপের কেন্দ্রে অবস্থিত দেশটি কেবল অর্থনৈতিক পরাশক্তি নয়; কর্মনৈতিকতায় গড়া সংস্কৃতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো জার্মানদের উত্থানের মূলে রয়েছে কর্মনৈতিকতা ও সংস্কৃতির অপরিসীম শক্তি।

ফন গ্যোটে, ফ্রেডরিখ শিলার, ইমানুয়েল কান্ট, ফ্রেডরিখ হেগেল, ফ্রেডরিখ নিৎশে ও কার্ল মার্ক্সের মতো দার্শনিক, কবি ও চিন্তাবিদরা জার্মান বুদ্ধিবৃত্তিক ঐক্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। জার্মানদের মনে গেঁথে দিয়েছেন কর্মঠতা, সময়ানুবর্তিতার আদর্শ এবং কর্মকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ। জার্মানির জাতি গঠনের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিভক্ত রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করার পেছনে সংস্কৃতির বড় ভূমিকা ছিল। রোমান্টিক আন্দোলনের ধারায় ফ্রেডরিখ শ্লেগেল ও হাইনরিখ হাইনের মতো কবি-চিন্তকরা জার্মান ভাষা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে জাতীয় আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। ফলে জার্মান রোমান্টিসিজম কেবল নান্দনিকতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি আত্মপরিচয় নির্মাণের সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়। একইভাবে বেথোফেনের সিম্ফনি কিংবা বাখের সংগীত শৃঙ্খলাবদ্ধ সাংস্কৃতিক অভ্যাসের প্রতীক হয়ে ওঠে—যেখানে কাঠামো, অনুশীলন, সময়বোধ ও মনোযোগ অপরিহার্য।

ঐতিহাসিকভাবে জার্মান কর্মনৈতিকতা বা ওয়ার্ক এথিকস গড়ে উঠেছে সংস্কৃতি, ধর্ম ও শিল্পায়নের প্রভাবে। এর বড় উৎস ষোড়শ শতাব্দীর প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন। আন্দোলনের অন্যতম সূচনাকারী জার্মান যাজক মার্টিন লুথার কাজকে ‘ডিভাইন কলিং’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে পরিশ্রম ও দায়বদ্ধতাকে নৈতিক মূল্যবোধে রূপ দেন। ফলে কাজ কেবল উপার্জনের মাধ্যম নয়, এক ধরনের নৈতিক বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়ায়। পরে ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব এ মূল্যবোধকে আরো পাকাপোক্ত করে। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের ধারণায় প্রোটেস্ট্যান্ট এথিকস মূলত পরিশ্রম ও সাশ্রয়ের ধর্মীয় প্রেরণাকে পুঁজিবাদের বিকাশে সহায়ক হিসেবে দেখায়; কিন্তু জার্মান কর্মনৈতিকতা ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান ও অনুশীলনে ডুয়াল শিক্ষা ব্যবস্থা, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, শিল্পমানদণ্ড গেঁথে যায়।

জার্মানির শিল্পবিপ্লব দাঁড়িয়েছিল মূলত কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা এবং পদ্ধতিগত কাজের সংস্কৃতির ওপর। সেখানে প্রথমবারেই সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পদ্ধতিগত উৎপাদন ও মাননির্ভর শিল্পসংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে বিএমডব্লিউ বা সিমেন্সের মতো প্রতিষ্ঠানের পণ্য শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, সামাজিক শৃঙ্খলা ও পেশাগত সততার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। জার্মানির অভিজ্ঞতা দেখায়, জাতি গঠনের প্রকৃত ভিত্তি সংস্কৃতি। সংস্কৃতি যখন কর্মনৈতিকতায় রূপ নেয়, তখনই একটি জাতি সামষ্টিকভাবে উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত হয়।

কর্মসংস্কৃতি উৎসব, পোশাক বা সংগীতের সমষ্টি নয়। এটি মানুষের কাজের অভ্যাস, সময়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, জ্ঞানের মূল্য, পারস্পরিক আস্থা, কর্তব্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার সামষ্টিক কাঠামো। ইতিহাসে দেখা যায়, এ সাংস্কৃতিক কাঠামোই নানা সভ্যতার ভেতরে আচরণ ও দায়িত্ববোধের মানদণ্ড তৈরি করেছে। গ্রিক সভ্যতায় হোমারের ইলিয়াদের মতো মহাকাব্য গ্রিকদের যোদ্ধা-মানসিকতা গড়ে তুলেছে, যা এথেন্স-স্পার্টার সামরিক শক্তির ভিত্তি ছিল। ভার্জিলের এনিয়েদ রোমানদের সমষ্টিগত আত্মপরিচয় পুনর্গঠনে ভূমিকা রেখেছে। ফরাসি বিপ্লবে ভলতেয়ার, রুশোর দার্শনিক চিন্তা সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটিয়েছে। চীনের কনফুসিয়াসীয় মূল্যবোধ কমিউনিস্ট বিপ্লবের পরও জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। অর্থাৎ সংস্কৃতি যখন মানুষের অন্তর্গত আচরণবিধি নির্ধারণ করে, তখনই তা কাজের নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ভিত্তি হয়ে ওঠে।

কিন্তু সংস্কৃতির ভূমিকা শুধু ঐক্য নয়, কর্মমুখিতাও। বিংশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী নৃবিজ্ঞানী ক্লদ লেভি-স্ট্রসের মতে, সংস্কৃতি সমাজের অদৃশ্য কাঠামো। এটি কর্মের আদর্শ জাগিয়ে জাতিকে এগিয়ে নেয়। যেমন আমেরিকার ‘আমেরিকান ড্রিম’ সংস্কৃতি অভিবাসীদের কর্মমুখী করে। সংস্কৃতি ছাড়া জাতি গঠন অসম্পূর্ণ। সংস্কৃতি স্থির নয়; এটি পরিবর্তনশীল। জাতি গঠনের জন্য সংস্কৃতিকে পুনর্গঠন করতে হয়। এ পুনর্গঠন কখনো শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে, কখনো শিল্পনীতির মাধ্যমে, কখনো সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ঘটে।

সংস্কৃতি যদি সচেতনভাবে পুনর্গঠিত হয়, তবে তা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। যার অন্যতম উদাহরণ জাপান। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত জাপান ছিল সামন্ততান্ত্রিক সমাজ। পরবর্তী সময়ে মেজি পুনরুদ্ধার থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত জাপানের জাতি গঠনের কাহিনীতে সংস্কৃতির কর্মমুখী চেতনা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। জাপানের কর্মনৈতিকতার সাংস্কৃতিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গেলে সামুরাই নৈতিক দর্শনের উৎসে থাকা বুশিদো আদর্শের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, যা মধ্যযুগীয় সামরিক অভিজাত শ্রেণীর আচরণবিধি হলেও পরবর্তীকালে পুরো সমাজে শৃঙ্খলা, কর্তব্যবোধ, সম্মান, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও কাজের প্রতি অবিচল নিষ্ঠার মানসিকতা তৈরি করে। এ বুশিদো নীতির সঙ্গে কনফুসীয় শৃঙ্খলা, জেন বৌদ্ধ ধর্মের ধ্যানমুখী মনোযোগ এবং শিন্তো ঐতিহ্যের সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ যুক্ত হয়ে জাপানে এমন এক কর্মসংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে কাজের নিখুঁত সম্পাদন ও সমষ্টিগত অগ্রগতিকেই নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। ফলে শিল্পায়ন থেকে শুরু করে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন—সব পর্যায়েই শ্রম কেবল অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়, বরং চরিত্র ও জাতীয় পরিচয়ের অংশে পরিণত হয়।

জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের কর্মমুখী জাতি গঠনের প্রধান হাতিয়ার। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ—সবকিছু এমনভাবে সাজানো হয় যাতে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, দক্ষ এবং সমষ্টিমুখী নাগরিক তৈরি হয়। ব্যক্তি সফলতার চেয়ে সমষ্টিগত উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়া হয়। হিরোশিমা-নাগাসাকির ধ্বংসের পর জাপানি অর্থনীতির অলৌকিক পুনরুদ্ধার (কেজাই মিরাকল) এ কর্মমুখী সংস্কৃতির ফসল। ‘কাইজেন’ অর্থাৎ ধারাবাহিক উন্নতির ধারণা জাপানি শিল্পকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়, যেখানে গুণগত মান একটি জাতীয় পরিচয়ে পরিণত হয়। হায়াও মিয়াজাকির অ্যানিমে থেকে হারুকি মুরাকামির উপন্যাসের মতো জনপ্রিয় জাপানি সংস্কৃতিতেও দৈনন্দিন শ্রম, অধ্যবসায় ও দায়িত্ববোধ জীবনের স্বাভাবিক নৈতিকতা হিসেবে উঠে এসেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও এ কর্মনৈতিকতার সাংস্কৃতিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গেলে কনফুসীয় মূল্যবোধের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যেখানে শিক্ষা, শৃঙ্খলা, কর্তব্যবোধ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত সাফল্যকে সমষ্টিগত অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। কোরীয় যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠনের সময় এ মানসিকতাই রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পের সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়। পার্ক চুং-হির নেতৃত্বে শিল্পায়নের যে কর্মসূচি নেয়া হয়, তা কেবল নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং একটি জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। যার ফলে দারিদ্র্যপীড়িত একটি কৃষিনির্ভর দেশ কয়েক দশকের মধ্যে প্রযুক্তি ও শিল্পশক্তিতে পরিণত হতে পেরেছে। বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী তৈরি হলেও তাদের সাফল্যকে জাতীয় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছে। সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান কিংবা চীনের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়—শিক্ষা, দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সঙ্গে সামাজিক সংস্কৃতির সংযোগ।

ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ডে কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং পেশাগত সততা এমন এক সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যেখানে দায়িত্ব পালন ব্যক্তিগত বিষয় নয়, সামষ্টিক আস্থার অংশ। সেভাবেই গড়ে উঠেছে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়; বরং নাগরিকের সমষ্টিগত কর্ম-অভ্যাস নির্মাণের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র। শিক্ষকরা শুধু পাঠদান করেন না, বরং সামাজিক নৈতিকতার ধারক হিসেবে কাজ করেন। ফলে নিয়ম মানা সেখানে বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; অভ্যন্তরীণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ফিনল্যান্ড ছাড়াও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের দেশ সুইডেন, ডেনমার্ক ও নরওয়ে জাতি গঠনের ক্ষেত্রে এক ভিন্নধর্মী ও অনুকরণীয় কর্মনৈতিকতার উদাহরণ বিশ্বমঞ্চে হাজির করেছে। সুইডেনের আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের মূলে রয়েছে ‘ফোকহেমেট’ নামক শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দর্শন। এটি রাষ্ট্রকে একটি যৌথ পরিবারের রূপ দেয়, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজেকে সেই পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করে। এখানে কর্মনৈতিকতা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির সিঁড়ি নয়, বরং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার মতো একটি সামষ্টিক আস্থার অংশ। সুইডিশ নাগরিকরা বিশ্বাস করে, প্রত্যেকের অর্পিত দায়িত্ব সঠিক সময়ে এবং নির্ভুলভাবে পালন করাই হলো সমাজকে এগিয়ে নেয়ার পথ। এ আদর্শই সুইডেনকে একটি উচ্চ উৎপাদনশীল এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে পরিণত করেছে, যেখানে শ্রমের মর্যাদা সর্বোচ্চ।

ডেনমার্কের সমৃদ্ধির ইতিহাসে আন্দেলস বা সমবায় আন্দোলনের ভূমিকা অপরিসীম। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এ আন্দোলন ড্যানিশ কৃষকদের শিখিয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে যৌথ মালিকানা ও সংহতির মাধ্যমেই বৃহত্তর দক্ষতা ও শৃঙ্খলা অর্জন সম্ভব। এর পাশাপাশি ‘ফোক হাইস্কুল’ ঐতিহ্য ডেনমার্কের শিক্ষা ব্যবস্থা অনন্য উচ্চতা দিয়েছে। এখানে মুখস্থ বিদ্যা বা পরীক্ষাভিত্তিক প্রতিযোগিতার চেয়ে দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ওপর বেশি জোর দেয়া হয়। নরওয়ের ‘ডুগনাড’ কমিউনিটির জন্য স্বেচ্ছাশ্রম কাজকে নৈতিক কর্তব্যে রূপ দেয়; এখানে স্কুল মেরামত থেকে শুরু করে স্থানীয় অবকাঠামো নির্মাণ পর্যন্ত মানুষ বিনা পারিশ্রমিকে অংশ নেয়, কারণ কাজকে তারা নাগরিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখে। সিঙ্গাপুরে সরকারি সেবা থেকে শুরু করে করপোরেট সেক্টর—সবখানেই দক্ষতা বা এফিশিয়েন্সি জাতীয় ধর্মে পরিণত হয়েছে। কাজকে তারা বিশ্ব মানদণ্ড ছোঁয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখে। এ উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মসংস্কৃতিই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটিকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আর্থিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

আধুনিক বিশ্বে বিভিন্ন জাতির উন্নয়নের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয়ই বারবার সামনে আসে—সমাজের কর্মনৈতিকতা এবং কর্মমুখী সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে উন্নতির প্রকৃত ভিত্তি গড়ে দেয়। যে সমাজে কাজকে কেবল জীবিকা অর্জনের উপায় হিসেবে দেখা হয়, সেখানে উৎপাদনশীলতা সীমিত থাকে। কিন্তু যে সমাজে কাজকে দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, সেই সমাজ ধীরে ধীরে সক্ষম রাষ্ট্রে রূপ নেয়। এ সমাজগুলোতে শ্রমের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ববোধ শৈশব থেকেই সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কাজকে তারা ধর্মীয় নিষ্ঠার মতো গুরুত্ব দিয়ে সম্পন্ন করে।

উন্নত বিশ্বের এ অভিজ্ঞতার বিপরীতে বাংলাদেশের যাত্রাপথে ফিরে তাকালে এক চরম অসংগতি লক্ষ্য করা যায়। যে জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি রচিত হয়েছিল বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, যেখানে ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক সংহতি ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের অনন্য নজির স্থাপিত হয়েছিল—স্বাধীনতার পর সেই সংহতি ‘জাতীয় কর্মনৈতিকতায়’ রূপান্তরের প্রক্রিয়া নানামাত্রিক প্রতিবন্ধকতায় ব্যাহত হয়েছে। রাজনৈতিক ইতিহাসের পালাবদল বারবার এক বৈষম্যমূলক চক্রের আবর্তন ঘটিয়েছে। যেখানে এক গোষ্ঠীর স্থলে অন্য গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যার ফলে রাষ্ট্র বারবার বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের নানা মডেল সামনে আনা হলেও দেখা গেছে, যারা পরিচালনার দায়িত্বে আসীন হন, তারা নিজের বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়ন এবং সম্পদ পুঞ্জীভূত করার দিকেই মনোযোগ নিবদ্ধ করেন। এ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থান্বেষী রাজনীতির আবর্তে পড়ে রাষ্ট্রের সামষ্টিক উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা বারবার ধূলিসাৎ হয়েছে। এর বিপরীতে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসেবে দৃশ্যমান ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় না গড়ে বরং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সম্পদ বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়া বা দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের কোনো অভিযোগ ওঠেনি। তিনি কর্মনৈতিকতার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। তবে একই সময়ে তার আশপাশে থাকা অনেকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনিয়ম-সুবিধাবাদিতার অভিযোগ রয়েছে। যাদের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে ক্ষমতার ধারাবাহিকতায় নিজেদের অবস্থানও সংহত করেন।

অনেক যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজ জাতীয় পুনর্জাগরণের ধারাকে শ্রম, দক্ষতা ও শৃঙ্খলাভিত্তিক একটি সামাজিক–নৈতিক প্রকল্পে রূপ দিতে পেরেছিল। ফলে রাষ্ট্র পুনর্গঠন সেখানে কেবল অবকাঠামো বা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মধ্যে সীমিত থাকেনি, বরং নাগরিক সক্ষমতা নির্মাণের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তায় কাজকে নাগরিক সক্ষমতা তৈরির প্রধান প্রকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ দীর্ঘদিন প্রান্তিকই রয়ে গেছে। আমরা প্রতিনিয়ত সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ইকোনমিক মিরাকলের আখ্যান দ্বারা প্রলুব্ধ হই এবং উন্নয়নের এক দৃশ্যমান অলীক কল্পনাকে জাতীয় লক্ষ্য হিসেবে প্রচার করি। উন্নত বিশ্বের প্রবৃদ্ধি ও আধুনিক অবকাঠামো আমাদের মোহিত করলেও সে উন্নয়নের নেপথ্যে থাকা সুদীর্ঘ সময়ের কর্মনৈতিক অভ্যাস, কালানুক্রমিক সময়বোধ কিংবা পেশাগত সততার মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো আমাদের সমাজের কোনো স্তরেই সঞ্চারিত হয়নি। যে মননশীল শক্তির ওপর রাষ্ট্রের আমূল রূপান্তর নির্ভর করে, সে কর্মনৈতিকতাকে কেন্দ্র করে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক বা সামাজিক আন্দোলন দানা বাঁধেনি। ফলে আমাদের উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পরিকল্পনা কেবল প্রশাসনিক অলংকার কিংবা কাগুজে পরিকল্পনার গাণিতিক সীমানায় রুদ্ধ হয়ে থাকে। উন্নয়নের বিমূর্ত আকাঙ্ক্ষাকে প্রাত্যহিক জীবনের নিবিড় নৈতিক অনুশীলনে রূপান্তরের সামাজিক মনস্তত্ত্ব গড়ে না ওঠায় আমাদের রাষ্ট্র রূপান্তরের স্বপ্ন বরাবরই লক্ষ্যহীন স্থবিরতার বৃত্তে আবর্তিত হয়ে আসছে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কাজের প্রতি নৈতিকতা, সময়ানুবর্তিতা, দলগত দায়িত্ববোধ বা পেশাগত সততার মতো বিষয়গুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখানো হয় না। শিক্ষার্থীরা কর্মনৈতিকতার সংস্কৃতির চেয়ে সনদ বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বড় হয়। কাজের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের সম্পর্ক তৈরি হয় না। এ মানসিকতার প্রভাব সমাজের সব স্তরে দেখা যায়। সরকারি অফিসে ফাইল অকারণে পড়ে থাকা, সময়মতো সেবা না পাওয়া, দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা—এসব কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এগুলো একটি দুর্বল কর্মসংস্কৃতির প্রতিফলন। এ বাস্তবতা দুর্নীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। কর্মনৈতিকতা না থাকায় সমাজের সর্বনিম্ন স্তর থেকে সর্বোচ্চ পর্যন্ত দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বাহ্যিকভাবে চালু থাকলেও ভেতরে ভেতরে তার কার্যকারিতা ক্ষয়ে গেছে।

কর্মনৈতিকতার প্রশ্নটি কেবল আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সরাসরি অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ফল আছে। যে সমাজে নির্ধারিত সময়ের কাজ বারবার পেছায়, ফাইল চলাচলে অকারণ বিলম্ব হয়, নির্দিষ্ট সময় মানা হয় না, সেখানে শ্রমঘণ্টা বাড়লেও উৎপাদন বাড়ে না। সময় অপচয় সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতিতে পরিণত হয়। এর ফলে বিনিয়োগের কার্যকারিতা কমে, প্রযুক্তি ব্যবহার সঠিক ফল দেয় না এবং একই সম্পদ দিয়ে কম আউটপুট তৈরি হয়। অর্থাৎ কর্মনৈতিকতার ঘাটতি কোনো বিমূর্ত সাংস্কৃতিক সমস্যা নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের কার্যকারিতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বাস্তব কাঠামোগত সংকট। জাতি গঠনের জন্য তাই কর্মমুখী সংস্কৃতি কোনো অতিরিক্ত বিষয় নয়; এটি মৌলিক শর্ত।

উন্নত বিশ্বে এ সংস্কৃতি তৈরি হয় একেবারে প্রাথমিক শিক্ষাজীবন থেকে। অথচ বাংলাদেশে সেখানেই কর্মনৈতিকতার অভাব আরো স্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ক্লাস ও গবেষণার চেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো বা কনসালট্যান্সিতে বেশি আগ্রহী। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করার অভিযোগও নিত্যনৈমিত্তিক। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে এ চিত্র আরো ভয়াবহ; শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের চেয়ে কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোকেই অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। মাসের পর মাস স্কুলে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন তোলা কর্মনৈতিকতার এক চরম অবমাননা। এ অবস্থায় ছাত্ররা শিখে ফেলে—শ্রমের মূল্য নয়, শর্টকাটই বাস্তব পথ। আর এখান থেকেই কর্মজীবনে ঢোকার আগেই কাজের সঙ্গে নৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে।

সরকারি হাসপাতালের বেতনভুক্ত চিকিৎসকদের বড় অংশ প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখায় ব্যস্ত থাকেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে পোস্টিং হলেও প্রভাব খাটিয়ে ঢাকায় অবস্থান করা বা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা সাধারণ মানুষের মৌলিক চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিকে অসম্ভব করে তুলেছে। রোগীর প্রতি সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের চেয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশন বা ব্যক্তিগত চেম্বারের সিরিয়ালকে অগ্রাধিকার দেয়ার যে ধারা, তা মূলত পেশাগত দায়বদ্ধতা ক্ষয় এবং দুর্বল কর্মনৈতিকতার প্রতিচ্ছবি।

আর্থিক খাতে কর্মনৈতিকতার ঘাটতি সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ নেয় ব্যাংকের বিপুল ঋণখেলাপির সংকট ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অবহেলায়। এগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের পেশাগত সততা ও দায়বদ্ধতার সংকট। যথাযথ যাচাই না করে কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় বা ব্যক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়ার এ প্রক্রিয়াটি আসলে পেশাগত সততার চূড়ান্ত পরাজয়। ব্যাংক খাতের এ নৈতিক ধস আজ সাধারণ মানুষের আমানতকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘জনস্বার্থ’ বিরোধী দলে থাকাকালে প্রায়ই একটি উচ্চকণ্ঠ স্লোগান হিসেবে উচ্চারিত হলেও ক্ষমতায় গেলে অনেক সময় তার অগ্রাধিকার ও তাগিদ লক্ষণীয়ভাবে বদলে যায়। ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে যারা জনগণের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার থাকেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাদের অগ্রাধিকার আমূল বদলে যায়। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ, স্বজনপ্রীতি এবং নিজ বলয়ের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীনতার পর থেকেই এ সংস্কৃতি চলে আসছে। বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে কর্মনৈতিকতার অন্যতম বড় সংকট দেখা যায় আদর্শিক স্থায়িত্বের অভাব। বিশেষ করে নাগরিক সমাজ বা সক্রিয় আন্দোলনের মধ্য থেকে যখন কেউ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আসীন হন, তখন প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়। এমনকি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এর ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে মৌলিক সংস্কার বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যেসব ব্যক্তি সোচ্চার ছিলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পাওয়ার পর সেই দাবিগুলোর ধার ও অগ্রাধিকার রহস্যজনকভাবে মলিন হয়ে যায়। ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় যে বিষয়গুলোকে তারা অপরিবর্তনীয় লক্ষ্য হিসেবে প্রচার করতেন, চেয়ারে বসার পর সেই একই বিষয়ে তারা আমলাতান্ত্রিক অজুহাত বা ধীরগতির কৌশলের আশ্রয় নেন।

বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে কর্মনৈতিকতাহীনতা ও পেশাগত দায়বদ্ধতার ক্ষয় যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তার সবচেয়ে নির্মম উন্মোচন ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সরকারি উচ্চপদস্থ আমলা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, চিকিৎসক, এমনকি বিচারপতির মতো সাংবিধানিক পদে আসীন ব্যক্তিদেরও পালাতে হয়েছে। এ পলায়ন কেবল রাজনৈতিক পতনের ইঙ্গিত নয়, বরং এটি জাতীয় ‘পেশাগত নৈতিকতার’ চরম দেউলিয়াত্বের প্রকাশ।

যে পেশাগুলো নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থ রক্ষার কঠিন প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেখানে দলীয় আনুগত্য এবং ক্ষমতার সান্নিধ্য পেশাগত মানদণ্ডকে সমূলে ধ্বংস করেছে। উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা যখন জ্ঞানচর্চার চেয়ে দলীয় লেজুড়বৃত্তিকে পদোন্নতির সিঁড়ি হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন প্রতিষ্ঠানের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। একইভাবে বিচার বিভাগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে যখন আইন বা নীতিমালার চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ ও আনুগত্য প্রাধান্য পায়, তখন সে প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলে। এ নৈতিক বিপর্যয়ের বাইরে থাকতে পারেনি সাংবাদিকতাও। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত এ পেশাটির নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতাও গত দেড় দশকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলেও রাষ্ট্রীয় বরাদ্দে অঞ্চল বা বিভাগভিত্তিক চিরাচরিত বৈষম্যমূলক কাঠামোর পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। সাধারণ মানুষের মনে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা পুনরায় নির্দিষ্ট গোষ্ঠীস্বার্থের বলয়ে রুদ্ধ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র রূপান্তরের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে গোষ্ঠীস্বার্থ ও আঞ্চলিক বৈষম্যের পুনরাবৃত্তি বৃহত্তর জনমানসকে কেবল আহতই করেনি, বরং সংস্কারের মৌলিক আকাঙ্ক্ষাতেও ক্ষত তৈরি করেছে।

এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ‘মবতন্ত্রের’ দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানেও। বিভিন্ন দাবি আদায়ে সংঘবদ্ধ চাপ, দপ্তর ঘেরাও, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে কোণঠাসা করা কিংবা কর্মচারীদের দলগত ‘মবের মতো’ আচরণের নজির দেখা গেছে। পরিহাসের বিষয় হলো যারা এ মব সংস্কৃতির মাধ্যমে নিজেদের নানামুখী দাবি-দাওয়া আদায়ে সোচ্চার, তাদের মধ্যে নিজস্ব পেশাগত মান উন্নয়ন কিংবা কর্মনৈতিকতা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা দেখা যায় না। বছরের পর বছর ধরে সেবার মানে চরম ঘাটতি কিংবা সেবা দেয়ার প্রতি অবহেলার যে সংস্কৃতি তারা লালন করে আসছেন, তা পরিবর্তনের কোনো সদিচ্ছা তাদের কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত।

রাষ্ট্রের নানা খাতে পদ, বিধি ও কাঠামো আছে কিন্তু কর্মনৈতিকতার উপস্থিতি নেই। অথচ যেকোনো জাতি গঠনের মূলে প্রোথিত থাকে স্বীয় কর্মের প্রতি ব্যক্তির অবিচল দায়বদ্ধতা এবং নিজ পেশার প্রতি অন্তর্নিহিত সততা। যে সমাজে দায়িত্বকে নৈতিকতার ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়, সেখানে উৎপাদনশীলতা বাড়ে, পারস্পরিক আস্থা গড়ে ওঠে এবং প্রতিষ্ঠান কার্যকর হয়ে ওঠে। মূলত এ সামষ্টিক আস্থার সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর ভর করেই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াটি সাফল্যের মুখ দেখে। তাই বাংলাদেশের টেকসই অগ্রগতির জন্য এমন এক কর্মসংস্কৃতি বা কালচারাল প্যারাডাইম শিফট অপরিহার্য, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে অর্পিত দায়িত্বকে নৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করবে। এ গভীর ও অন্তর্নিহিত কর্মনৈতিকতাবোধই রাষ্ট্র রূপান্তরের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন বা খোয়াবের ভাষা সামষ্টিক ও সৎ। অথচ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আমাদের যাপিত জীবন চরমভাবে প্রতারণাপূর্ণ কর্মনৈতিকতাহীন। এ তীব্র বৈপরীত্যই বাংলাদেশের কঠিন ও অপ্রিয় বাস্তবতা।

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ: সম্পাদক, বণিক বার্তা

[অনুলিখন ও সহায়তায় মাহফুজ রাহমান]

আরও