মানব পাচার নির্মূলে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ায় ২০২৬ সালের ট্রাফিকিং ইন পারসন্স প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে আগের মতোই টিয়ার-২-এ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। ২০২৬ সালের ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের প্রতিবেদনের সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ সরকার সামগ্রিকভাবে মানব পাচার প্রতিরোধে প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে ২০২৬ সালের অধ্যাদেশ প্রণয়ন, তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম বাড়ানো, মানব পাচারের অপরাধ ও ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ নির্দেশিকা হালনাগাদ এবং সুরক্ষা সেবায় ভুক্তভোগীদের দ্রুত ও সমন্বিতভাবে পাঠাতে ডিজিটাল ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম বা এনআরএম পরীক্ষামূলকভাবে চালুর বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। অভিবাসী শ্রমিকদের মানব পাচারের ঝুঁকি কমাতেও সরকার সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়, পাচারকারীদের দোষী সাব্যস্ত করার সংখ্যা কমেছে এবং দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপকভাবে চলতে থাকা মানব পাচার মোকাবেলায় পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। একই সঙ্গে আগের তুলনায় কম ভুক্তভোগী শনাক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে সরকার ৫ হাজার ২৬৩ সন্দেহভাজনকে ঘিরে ৯৬১টি মানব পাচার মামলা তদন্ত করেছে। এর মধ্যে যৌন পাচারের ১৩৭টি, জোরপূর্বক শ্রমের ৪৪৩টি এবং অনির্দিষ্ট ধরনের পাচারের ৩৮১টি মামলা ছিল। আগের প্রতিবেদনের সময়ে তদন্ত হয়েছিল ৮১১টি মামলা।
একই সময়ে ১ হাজার ৭৯৫ সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে যৌন পাচারে ৬০৪, জোরপূর্বক শ্রমে ৬০০ এবং অন্যান্য বা অনির্দিষ্ট ধরনের পাচারে ৫৯১ জন রয়েছে। আগের বছরের ৪৫২ জনের তুলনায় এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তবে আদালত ও ট্রাইব্যুনাল মাত্র ৭৬ পাচারকারীকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০৩ এবং ২০২৩ সালে ৪০৭। ৩৫ জন পাচারকারীকে তিন মাস থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়েছে। বাকি দণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা সম্পর্কে সরকার তথ্য দেয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনুপাতিক কারাদণ্ডের পরিবর্তে জরিমানা আরোপ প্রতিরোধমূলক প্রভাব দুর্বল করেছে।
ভুক্তভোগী সুরক্ষার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। সরকার ১ হাজার ১৩৫ জন ভুক্তভোগী শনাক্ত করেছে, আগের প্রতিবেদনের সময়ে যা ছিল ১ হাজার ৪৬২ জন। তাদের মধ্যে যৌন পাচারের শিকার ১৯৯, জোরপূর্বক শ্রমের ৫১০ এবং অন্যান্য ধরনের পাচারের শিকার ৪২৬ জন। সরকার ৭৪৫ জনকে সেবার জন্য পাঠিয়েছে, যেখানে আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬০৭।
সরকারি হিসাবে মাত্র ১১১ জন ভুক্তভোগী সেবা পেয়েছে, আগের প্রতিবেদনের সময়ে যা ছিল ৮৮৩। ভুক্তভোগী সেবায় ২১ কোটি ২৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দের কথা জানানো হলেও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে, এর মধ্যে রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনার অর্থও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে বিদেশগামী শ্রমিকদের নিয়োগ ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। সরকার বৈধ নিয়োগ ফি ৮৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৬২ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করলেও এ ব্যয় অনেক শ্রমিককে ঋণগ্রস্ত করে এবং ঋণনির্ভর জবরদস্তির মাধ্যমে পাচারের ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক অভিবাসী নির্ধারিত সীমার চেয়েও বেশি অর্থ পরিশোধ করেন।
সব মিলিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মূল্যায়ন, মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ প্রচেষ্টা বাড়ালেও বিচার, ভুক্তভোগী সুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ পাচার মোকাবেলা এবং অভিবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে।