দুয়ারে ঈদুল আজহা। আজ রাতে পোহালেই কাল কোরবানির ঈদ। হাটে, পথে পথে কিংবা অনলাইনে চলছে কোরবানির পশু বেচাকেনা। একই সঙ্গে বাজারে চাহিদা বেড়েছে কোরবানি ও মাংস কাটার জন্য দরকারি সরঞ্জাম দা, ছুরি, চাপাতির। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এসব সরঞ্জামের দামও। তবে এবার দাম বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে লোহার মূল্যবৃদ্ধি। ফলে অন্যবারের তুলনায় কোরবানির সরঞ্জামের দাম কিছুটা বেশি, যার প্রভাব পড়েছে কামারপল্লীতে। তারা বলছেন সরঞ্জাম বিক্রি কমেছে। অনেকে নতুন কেনার চেয়ে পুরনো দা-ছুরিতে ধার দিয়ে প্রস্তুত করছেন।
ঢাকার কারওয়ান বাজার কামারপল্লীর সভাপতি মো. সেলিম বলেন, ‘কোরবানি ঈদে দা, বঁটি, ছুরি, চাপাতির চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অনেকে নতুন দা, ছুরি কেনেন, আবার অনেকে পুরনোগুলো মেরামত করেন। পশু জবাই বাড়লে আমাদের দা-ছুরির চাহিদাও বাড়বে। এবার চাহিদা আছে ঠিকই কিন্তু দাম বাড়ার কারণে ক্রেতা কম আসছেন। ঈদের মাস খানেক আগে থেকে আমাদের ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। এ ব্যস্ততা থাকবে ঈদের তিন দিন পর্যন্ত।’
লোহার দাম বাড়ার কারণের মধ্যে আছে কাঁচামালের দাম ও ভ্যাট বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতা। এর প্রভাব পড়ছে দামে। কারওয়ান বাজারের কামারপল্লীর বিক্রেতারা জানান, আগে যে চাপাতি বানাতে ৫০০ টাকা খরচ হতো সেটি এখন ৭০০ টাকায়ও বানানো যাচ্ছে না। আবার ৩০০-৪০০ টাকার বঁটি এখন ৫৫০-৬০০, ৫০ টাকার ছুরি বানাতে ১০০ টাকা খরচ হচ্ছে। এছাড়া কয়লার দাম, শ্রমিকের মজুরি ও ঘর ভাড়া বেড়েছে।
গতকাল দুপুরে কারওয়ান বাজারের কামারপল্লী ঘুরে দেখা যায়, চাপাতি ৮০০ থেকে ১২০০, পশু জবাইয়ের ছুরি ৬০০ থেকে ১৫০০, দা ৫০০ থেকে ১০০০, বঁটি ৭০০ থেকে ১৩০০, চাইনিজ কুড়াল ১২০০ থেকে ৩০০০, মাংস কাটার ছুরি ১৫০ থেকে ৫০০, বড় চামচ ২০০ থেকে ২৫০, রুটি বানানোর তাওয়া ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দেশে লোহার চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে। পুরনো জাহাজ ভেঙে লোহা গলিয়ে বানানো হয় দা, চাপাতি, ছুরি। বর্তমানে অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে এসব পণ্য। তবে বর্তমানে জাহাজ ভাঙা লোহা কম আসছে বলে জানান মো. সেলিম। তিনি বলেন, ‘আমাদের দা-ছুরি বানানোর ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের জাহাজ থেকে অনেক কাঁচামাল আসত। কিন্তু এখন সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। যার কারণে দেশীয় কারখানায় তৈরি লোহার ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। লোহার দাম বাড়লে জিনিসেরও দাম বেড়ে যায়।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে লোহার দাম বেড়েছে। বর্তমান বাজারে প্রতি কেজি লোহার দাম ৮৫ থেকে ৯০ টাকা কিংবা তার বেশি। বর্তমান বাজারে আগের তুলনায় প্রতি কেজি লোহার দাম প্রায় ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। লোহার দাম কিছুদিন আগেও কেজিপ্রতি ছিল ৭৫-৮০ টাকা। আগামী অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রস্তাবিত বাজটে রডের কাঁচামাল আমদানিতে নতুন মূল্য সংযোজন কর আরোপ করা হয়েছে। আগে প্রতি টন রড উৎপাদনে ভ্যাট ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা, যা বাড়িয়ে ২ হাজার ৭০০ টাকা করা হয়েছে। পুরনো লোহার টুকরা আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে ৫০০ টাকা। স্পঞ্জ ও পিগ আয়রনে (কাঁচা লোহা) শুল্ক বেড়েছে ৩০০ টাকা। ফলে সামনের দিনে লোহার দাম আরো বাড়বে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারওয়ান বাজারের কামারপল্লীতে ১৯৯১ সাল থেকে কামার হিসেবে কাজ করছেন মো. মাসুম। এ পল্লীতে ১২টি কামারের দোকানে প্রায় দেড়শ জন শ্রমিক কাজ করেন। মাসুম জানান, ‘আগের চেয়ে লোহার দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এছাড়া ঘর ভাড়া, শ্রমিক খরচ, কয়লার দাম বেড়েছে। যার প্রভাব গিয়ে পড়ছে পণ্যের দামে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কামাররা বছরের ১১ মাস ভবন নির্মাণের সরঞ্জাম তৈরি করেন। কোরবানির এক মাস আগে থেকে দা, ছুরি, চাপাতি তৈরির ব্যস্ততা শুরু হয়। এবারো প্রায় ১০০০ চাপাতি, ২০০০ চামড়া ছাড়ানোর ছুরি, ২০০ দা ও কুড়াল প্রস্তুত করেছি। তবে উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে দা-ছুরির দামও বাড়াতে হয়েছে। বেশি দামের কারণে অনেক ক্রেতা সরঞ্জাম কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন না। ক্রেতারা আসছেন কিন্তু দাম শুনে চলে যাচ্ছেন।’
দোকানের বিক্রির পাশাপাশি অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে কোরবানির সরঞ্জামাদি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা বলেন, ‘দোকানে বিক্রির পাশাপাশি আমরা অনলাইনেও বিক্রি করছি। অনেক জায়গা থেকে অর্ডার আসে।’
দাম বৃদ্ধি পেলেও কোরবানি ঈদে দা-ছুরির মতো সরঞ্জাম অতি প্রয়োজনীয়। কারওয়ান বাজারের কামারপল্লীতে আসা কামরুল এবার পুরনো দা-ছুরি মেরামত করেছেন। বণিক বার্তার এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘কোরবানি শেষ হলে এসব বড় দা-ছুরির ব্যবহার থাকে না। নতুন কিনতে চেয়েছিলাম কিন্তু দাম অনেক, তাই পুরনোগুলো মেরামত-ধার করছি। দা মেরামতে ২৫০ টাকা এবং ছুরির জন্য ২০০ টাকা নিয়েছে।’
দা, ছুরি, চাপাতি ছাড়াও বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে খাইট্টা (কাঠের গুঁড়ি), বাঁশের চাটাই, ঝুড়ি ইত্যাদি। এছাড়া ঈদের আগে কেনা পশুর জন্য বিক্রি হচ্ছে কাঁচা ঘাস ও খড়। কাঠের গুঁড়ি (ছোট সাইজ) ২০০ থেকে ১০০০ টাকা (বড় সাইজ), বাঁশের চাটাই ২৫০ থেকে ৩০০, ঝুড়ি ২০০ টাকা, খড়ের ছোট আঁটি ৩০০ টাকা, কাঁচা ঘাসের আঁটি ২০ থেকে ৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কোরবানির পশুর মাংস ও হাড় কাটতে প্রয়োজন হয় খাইট্টা বা কাঠের গুঁড়ির। এসব গুঁড়ির দাম এবার বেশ চড়া। চাঁদপুরের দুদু খান বলেন, ‘এ বাজারে প্রতি বছর খাইট্টা নিয়ে আসি। এবারো ৬২২টি নিয়ে এসেছি। কোরবানি ঈদে খাইট্টার বেশি চাহিদা থাকে। এবারো চাহিদা আছে কিন্তু সেভাবে ক্রেতা আসছে না। গত শুক্রবার এসে এক সপ্তাহে মাত্র ২০ হাজার টাকার খাইট্টা বিক্রি করতে পেরেছি।’ বিক্রি কম হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে গাছের দাম বাড়ার কারণে খাইট্টার দামও বেড়েছে। যার কারণে মানুষ কিনতে আসছে না।’