রাজশাহী-রংপুরের ১৬ জেলায় সার বিতরণে ডিলারদের অনিয়ম

আমন মৌসুমে বাড়ছে সারের চাহিদা। এমন সময়ে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলার মধ্যে পঞ্চগড় ছাড়া বাকি সব জেলাতেই ডিলার ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান, জরিমানা, সার জব্দ, এমনকি কৃষকদের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত এবং সার সরবরাহ ব্যবস্থার তদারকির দায়িত্বে থাকা অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কোথাও সরকারি বরাদ্দের সার খোলাবাজারে বিক্রি, সরকারি দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৪০০-৮০০ টাকা বেশি নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার কোথাও গুদামে সার রেখে ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন। কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার অন্যত্র সরিয়ে নেয়া বা পাচারের ঘটনাও ধরা পড়েছে। এসব ঘটনা ঘটেছে রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলায়। আর রাজশাহী বিভাগে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাটে।

সার বিতরণে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এটা আমরা হতে দেব না। এসব ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তিনজন ডিডিকে প্রত্যাহার করেছি। এছাড়া সার ব্যবস্থাপনা তত্ত্বাবধানের জন্য দুজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে কমিটি করা হয়েছে। সরকারের বরাদ্দকৃত সার না তুলে গুদামজাত করে রাখার ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলার মধ্যে ১৫টিতেই এ ঘটনা ঘটেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটিকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’

সারের মজুদ পরিস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গতকাল পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া সারের মজুদ রয়েছে ৪ দশমিক ৮২২ লাখ টন, টিএসপি ৩ দশমিক ৬৯৩ লাখ ও ডিএপি ৩ দশমিক ৬৮১ লাখ টন। অন্যদিকে এমওপির মজুদ ১ দশমিক ৪৬০ লাখ টন। চার ধরনের সারের মধ্যে বর্তমান মজুদের অনুপাত সবচেয়ে বেশি টিএসপিতে এবং সবচেয়ে কম এমওপিতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে গত রোববার সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকরা এক ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে প্রায় ১০ হাজার কেজি বা ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে গতকাল নিয়মবহির্ভূতভাবে সার মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়। লালমনিরহাটে ১০ আগস্ট পর্যাপ্ত ও ন্যায্যমূল্যে সার না পাওয়ার অভিযোগে কয়েক হাজার কৃষক মহাসড়ক অবরোধ করেন। রংপুরে ১৭ আগস্ট সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনায় বরাদ্দ ও সরবরাহে ঘাটতি না থাকার পরও ডিলার পর্যায়ের অনিয়মে কৃষকের কাছে সার পৌঁছাতে সমস্যা হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।

দিনাজপুরে ১১ আগস্ট ৪৬৭ বস্তা সারের হিসাবের গরমিল ও বিক্রির রসিদ দেখাতে না পারায় এক সার ব্যবসায়ীকে এক মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। ঠাকুরগাঁওয়ে ১২ আগস্ট কৃষকের জন্য বরাদ্দ সরকারি সার খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়। আর নীলফামারীতে ডিলারের কাছে কৃষক সার না পেলেও বিভিন্ন গুদামে সার মজুদ, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় সরিয়ে নেয়া এবং সরকারি বরাদ্দের সার বেশি দামে বাজারজাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কুড়িগ্রাম ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সার ডিলার শামসুল ইসলাম মন্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উৎপাদন মৌসুমে সারের ডিলারশিপ নিয়ে “‍সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত)” বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত ও অপ্রতুল বরাদ্দ সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

এদিকে রাজশাহী বিভাগের আট জেলার সবক’টিতেই সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীতে ২১ আগস্ট সার না পেয়ে কৃষকদের ডিলারের দোকানে ঘুরতে হয়েছে; এর আগে ১৪ আগস্ট পবার হরিয়ান বাজারে সরকারি বরাদ্দের ১২ বস্তা সার নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে সরিয়ে নেয়ার অভিযোগে এক ডিলারকে জরিমানা করা হয়। নাটোরের গুরুদাসপুরে ২১ আগস্ট সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। নওগাঁর রানীনগরে ১১ ও ১৮ আগস্ট পাঁচ ডিলারকে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগে জরিমানা করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে ১৭ আগস্ট অবৈধভাবে সার মজুদের দায়ে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা ও ১৩ বস্তা ডিএপি জব্দ করা হয় এবং ২৪ আগস্ট সদর উপজেলার ঝিলিমে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি ও অবৈধ মজুদের দায়ে এক ব্যবসায়ীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। পাবনার চাটমোহরে ১০ আগস্ট বেশি দামে সার বিক্রির দায়ে চার ব্যবসায়ীকে মোট ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সিরাজগঞ্জে ১৩ ও ১৬ আগস্ট অনুমোদন ছাড়া সার বিক্রি ও অন্যান্য অনিয়মে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়। বগুড়ার শেরপুরে ২২-২৩ আগস্ট টিএসপি ও ডিএপি সার বস্তাপ্রতি ৪০০-৪৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ পাওয়া যায়। আর জয়পুরহাটে ২১ আগস্ট পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও সরকারি দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৪০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে রাজশাহী বিভাগে ডিলার পর্যায়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রি, অবৈধ মজুদ, বরাদ্দের সার সরিয়ে নেয়া ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে কৃষকেরা যাতে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার পান, তা নিশ্চিত করতে দেশের সব সার ডিলারকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)। ২২ আগস্ট বিএফএর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ডিলারদের সময়মতো অর্থ জমা দেয়া, দ্রুত সার সংগ্রহ করা এবং নির্ধারিত গুদামে যথাযথভাবে সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, সার গুদামে পৌঁছানোর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। পাশাপাশি বিক্রয় রেজিস্টার সংরক্ষণ এবং অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি করতে হবে। বিএফএ সতর্ক করে বলেছে, এসব নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে ডিলারশিপ বাতিল এবং আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। অসাধু ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠী যাতে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির দায় ডিলারদের ওপর চাপিয়ে দিতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার জন্য ডিলারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) আহমেদ ফয়সল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা বেশকিছু ডিলারের তালিকা তৈরি করেছি। প্রায় ১৫০ জনের ডিলারশিপ বাতিল করার প্রক্রিয়া চলছে। যেসব ডিলার অনিয়ম করছেন, পর্যায়ক্রমে তাদের বাদ দেয়া হচ্ছে। একবারে সব ডিলারকে বাদ দিলে মাঠপর্যায়ে সংকট তৈরি হতে পারে।’

আহমেদ ফয়সল ইমাম আরো বলেন, ‘খুচরা ডিলারদের বিষয়টিও আমরা দেখছি। আমরা খুচরা ডিলারের পদ্ধতিটি তুলে দিতে চেয়েছিলাম। খুচরা পর্যায়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তারা ইচ্ছামতো দাম রাখে। অনেক ক্ষেত্রে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা মিলে সংকট তৈরি করে। তার পরও আমরা একটি ব্যবস্থা রেখেছি। উত্তরবঙ্গে সার নিয়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলো মূলত ডিলারদের অনিয়মের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি।’

আরও