মানব পাচারই দেশের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত আন্তঃসীমান্ত অপরাধ

নৌপথে সবচেয়ে বেশি পাচার হয় কক্সবাজার থেকে নারী ও শিশু পাচারের বড় রুট যশোর

আয়েশা আক্তারের (ছদ্মনাম) বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইনে। দেশটির সামরিক বাহিনী ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীভুক্ত এ নারী বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। আশ্রয় নেন কক্সবাজারের উখিয়ার একটি উদ্বাস্তু শিবিরে।

আয়েশা আক্তারের (ছদ্মনাম) বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইনে। দেশটির সামরিক বাহিনী ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীভুক্ত এ নারী বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। আশ্রয় নেন কক্সবাজারের উখিয়ার একটি উদ্বাস্তু শিবিরে। সেখানেই স্থানীয় কয়েক দালালের খপ্পরে পড়েন। মাত্র ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেয়ার প্রলোভন দেখায় তারা। বলা হয়, সেখানে গিয়ে কাজ করে প্রচুর অর্থ উপার্জনের সুযোগ আছে তার। সে টাকা পরিশোধের পর কক্সবাজার থেকে নৌপথ ব্যবহার করে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। গিয়ে জানতে পারেন, বিক্রি করে দেয়া হয়েছে তাকে। সে সময় দালালরা ভুক্তভোগী এ নারীকে জানায়, তাকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত নিয়ে যেতে তাদের খরচ হয়েছে ২ লাখ টাকার মতো। এ অর্থ তাকে বিক্রি করে আদায় করে নিয়েছে দালালরা। অনেক চেষ্টার পর বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানানোর সুযোগ পান তিনি। যদিও তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত।

শুধু উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা নয়, বাংলাদেশীরাও এ ধরনের মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ছেন অহরহ। যাত্রাবাড়ীর একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন নাসিমা (ছদ্মনাম)। কভিডের সময় ওই চাকরি হারান তিনি। ঘুরতে থাকেন নতুন কাজের সন্ধানে। নাজুক ওই পরিস্থিতিতে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়েন তিনি। সৌদি আরবে পাঠানোর কথা বলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় যশোরের শার্শা উপজেলায়। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে পাচার করা হয় ভারতের বসিরহাটে। পরে কলকাতার একটি যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেয় পাচারকারী চক্র। একটি এনজিওর সহায়তা নিয়ে তিনি দেশে ফেরেন। এরপর শার্শা থেকে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মানব পাচারের মতো অপরাধের মাত্রা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে নাজুক অবস্থানে থাকা ব্যক্তিরা এর শিকার হচ্ছেন। বিদেশে উন্নততর জীবনযাপনের প্রত্যাশায় থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীরাও দালালের খপ্পরে পড়ছেন নিয়মিত। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে নৌপথে মানব পাচারের বড় রুট এখন কক্সবাজার। স্থলপথে নারী ও শিশু সবচেয়ে বেশি পাচার হয় যশোর দিয়ে। আবার ময়মনসিংহ থেকে সোমেশ্বরী নদী পেরিয়ে মানব পাচারের তথ্যও এখন সামনে আসছে। আর ইউরোপ ও আমেরিকায় মানব পাচারে শুরুতে ব্যবহার হয় আকাশপথ। এর মধ্যে ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যপ্রাচ্য হয়ে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখান থেকে নৌকায় করে ইউরোপ অভিমুখে উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যু হয় অনেকের।

অনেক ক্ষেত্রে পাচারকারীরা এসব অভিবাসনপ্রত্যাশীকে জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করে মোটা অংকের টাকা। এ অর্থ দিতে না পারলে তাদের ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। কাউকে কাউকে মেরেও ফেলা হয়। আবার বাংলাদেশ থেকে নৌপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় পাচার হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশকে এখন বিভিন্ন শিল্পে শ্রমদাস হিসেবে বা রেড লাইট এরিয়ায় বিক্রি করে দেয়ার ঘটনা ঘটছে অনেক।

গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মানব পাচারই এখন সবচেয়ে বড় আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রকাশিত আন্তঃদেশীয় অপরাধ সূচকে মানব পাচারের ভয়াবহতার ১০ পয়েন্টে বাংলাদেশের সূচক মান ৮। সংস্থাটির হিসাবে বাংলাদেশ থেকে মানব পাচার বেড়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা সংকট।

একই পর্যবেক্ষণ দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর তরুণ ও যুবকদের মধ্যে ক্যাম্পের অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে উন্নততর জীবনযাপনের খোঁজে অভিবাসন গ্রহণে সচেষ্ট হওয়ার প্রবণতা এখন বেড়েছে। ফলে কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে দেশে মানব পাচারকারীদের কয়েকটি সিন্ডিকেট এখন সক্রিয়। শুধু রোহিঙ্গা নয়, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দালালের মাধ্যমে বাংলাদেশীদেরও পাচার করছে তারা। আর কক্সবাজার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ থেকে নৌপথে মানব পাচারের সবচেয়ে বড় রুট।

জানা গেছে, মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দালালরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় চাকরি দেয়ার কথা বলে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রথমে কক্সবাজারে নিয়ে আসে। এরপর নৌকায় করে তাদের তুলে দেয়া হয় বড় ইঞ্জিন বোট বা জাহাজে। এজন্য মূল পাচারকারীদের কাছ থেকে মাথাপিছু হিসাবে কমিশন পায় দালালরা। আগে এ ধরনের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অপহরণ করে থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার বনে গোপন বন্দিশিবিরে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে পাচারকৃত অভিবাসনপ্রত্যাশীদের গভীর জঙ্গলের বন্দিশালায় আটকে নির্যাতন ও হত্যা করা হতো। কিন্তু ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডের বনে নৌপথে পাচার হওয়া বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের গণকবর আবিষ্কারের পর এ পাচারকারীদের দমনে সচেষ্ট হয় থাইল্যান্ড সরকার। আটক হয় সেখানকার প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও সেনাবাহিনীর জেনারেলসহ অনেকেই। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নাগরিকও ছিল। ওই ঘটনার পর এ রুট দিয়ে মানব পাচার বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এ চক্রের সদস্যরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

আগে পাচারের পর মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হলেও এখন মানব পাচারকারীরা তাদের কৌশল বদলেছে। পাচারকৃতদের অনেককেই এখন মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন শিল্পে দাস হিসেবে বা রেড লাইট এরিয়ায় বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে নেয়ার জন্য যেসব রোহিঙ্গাকে টার্গেট করা হয়, তাদের প্রত্যেক পরিবারের কাছ থেকে জনপ্রতি ২০-২৫ হাজার টাকা নেয় পাচারকারীরা। তবে একেকজনকে বিদেশে পাঠাতে খরচ পড়ে দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি। তাদের বিদেশ নিয়ে একেকজনকে ৪-৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২৯ ডিসেম্বর রাতে টেকনাফের বাহারছড়ায় কচ্ছপিয়া কবরস্থানসংলগ্ন একটি অস্থায়ী তাঁবুঘরে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে পাচারের জন্য ৬৬ জন বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাকে এনে জড়ো করা হয়েছিল। পাচারকৃতদের মধ্যে বাংলাদেশী সাতজন। বাকিরা সবাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য। এ ৬৬ জনের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু, যার মোট সংখ্যা ৪৮। সেখান থেকে পাঁচ পাচারকারীকে আটকে সক্ষম হয় পুলিশ।

জানা গেছে, পাচারের জন্য এনে জড়ো করাদের সবাই অত্যন্ত দরিদ্র ও প্রান্তিক জীবনযাপন করছিলেন। উন্নত জীবনযাপন, বাড়তি বেতনের চাকরি ইত্যাদি প্রলোভন দেখিয়ে ১০-১৫ দিন ধরে তাদের এখানে এনে জড়ো করা হচ্ছিল। তাদের সবাইকে জবরদস্তিমূলক শ্রমে বাধ্য করা ও নানা ধরনের নিপীড়নের জন্য বিক্রি করে দেয়ার উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হচ্ছিল।

পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ট্রলারে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর জন্য পাচারকারীরা এখন কক্সবাজার উপকূলের বেশ কয়েকটি পয়েন্ট ব্যবহার করছে। এগুলো হলো টেকনাফের শামলাপুর, শীলখালী, রাজারছড়া, নোয়াখালীপাড়া, জাহাজপুরা, শাহপরীরদ্বীপ, কাটাবনিয়া, মিঠাপানির ছড়া, জালিয়াপালং, ইনানী, হিমছড়ি, রেজুখাল, কুতুবদিয়াপাড়া, কক্সবাজার শহরের খুরুশকুল, চৌফলদি ও মহেশখালীর সোনাদিয়া, কুতুবজোম। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাসহ বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা। এ রোহিঙ্গা নেতাদের সবাই টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পের বাসিন্দা। এছাড়া মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বেশ কয়েকজনও এখন মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান পরিচালনা চালিয়ে অনেক দালাল ও ভিকটিমকে আটক করেছে।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন জানান, ‘টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে এ বছর রেকর্ডসংখ্যক দালাল ও পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যেসব পয়েন্ট দিয়ে পাচার হয় সেখানে সবসময় নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জড়িত সবাইকে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিবির এখন মানব পাচারের হটস্পট হয়ে উঠেছে। সেখানেও আমরা কাজ করছি।’

বাংলাদেশ থেকে মানব পাচার নিয়ে গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্সের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশী নারী ও কন্যাশিশুরা জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন অপরাধের উদ্দেশ্যে পাচারের শিকার হয়। অনেক ক্ষেত্রে তা সাজানো বিয়ের মাধ্যমেও ঘটে। দেশের অভ্যন্তরে, প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের আইনি বা অবৈধ যৌনপল্লী ও ব্যক্তিগত হোটেলে মিথ্যা চাকরির প্রতিশ্রুতি, ঋণভিত্তিক জোরপূর্বক শ্রম এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শোষণ করা হয়। দেশের দুর্বল জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যৌন ও শ্রম পাচারের লক্ষ্যবস্তু। এছাড়া অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য মানব পাচারও ব্যাপকভাবে প্রচলিত।

দেশে এখন নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে যশোর সীমান্ত দিয়ে। এর সঙ্গে যশোরের শার্শা উপজেলাকেন্দ্রিক একাধিক সিন্ডিকেট জড়িত বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এ উপজেলার বাহাদুরপুর, পুটখালী ও বেনাপোল ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম একেবারে সীমান্ত ঘেঁষা। সেখান দিয়ে নারী ও শিশু পাচারের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

মানবাধিকার সংস্থা রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয়কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, ‘২০২৪ সালে আমরা ৮০ জনকে ভারতে পাচার হয়ে যাওয়া থেকে উদ্ধার করেছি। গত দুই মাসে মোট ৩২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। যশোরের পাশাপাশি ঝিনাইদহের মহেশপুর ও সাতক্ষীরার কলারোয়া সীমান্ত দিয়েও এখন অনেক মানব পাচারের ঘটনা ঘটছে বলে খবর পাওয়া গেছে।’

তিনি বলেন, ‘মানব পাচার প্রতিরোধে সরকারের সতর্ক অবস্থান দরকার। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশ থেকে যেসব মানব পাচারের ঘটনা ঘটে, সেগুলো মূলত অনিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থার জন্য হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিশেষ করে রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন দেয়ার আগে ভালোমতো তথ্য যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দিতে হবে।’

যশোর বিজিবি অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা মানব পাচার প্রতিরোধে সতর্ক আছি। এজন্য আমরা সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছি।’

বাংলাদেশ থেকে ভারতে মানব পাচারের আরেকটি বড় রুট হয়ে উঠছে ময়মনসিংহ। জেলাটি থেকে সোমেশ্বরী নদী পেরিয়ে ভারতের মেঘালয়ে মানব পাচারে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি চক্রের তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে রয়েছে। জেলার ধোবাউড়া উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া, পোড়াকান্দুলিয়া ও ঘোষগাঁও দিয়ে বেশি মানব পাচারের ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, সীমান্তের ওপারে মেঘালয়ের বাঘমারায় নিয়ে ভুক্তভোগীদের নির্যাতন করে অর্থ আদায় করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অর্থ আদায়ের পর ভুক্তভোগীদের মুক্তি দেয়া হয় না। বরং বিক্রি করে দেয়া হয় অন্য চক্রের কাছে।

বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে অভিবাসনের নামে মানব পাচারের প্রধানতম রুটটি হলো লিবিয়া। এজন্য অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যপ্রাচ্য হয়ে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখান থেকে নৌকায় করে ইউরোপ অভিমুখে উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যু হয় অনেকের। আবার কাউকে কাউকে নৌকায় না তুলে অপহরণ করে মানব পাচারকারীরা। এরপর তাদের পরিবারের কাছে মোটা অংকের অর্থ দাবি করা হয়। সেখানে মারাত্মক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় অপহৃতদের। কারো কারো মৃত্যুও ঘটে।

গত ২৮, ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি লিবিয়া উপকূলে ২৩ মরদেহ ভেসে আসে। তাদের সবাই বাংলাদেশী। এ ২৩ জনের মধ্যে ১১ জনই মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার। দালালের মাধ্যমে ইউরোপে অভিবাসন নিতে গিয়ে মানব পাচারের শিকার হয়েছিলেন তারা। গত ৩১ জানুয়ারি লিবিয়ায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা দুই যুবককে গুলি করে হত্যার পর পরিবারের কাছে তাদের ছবি হোয়াটসঅ্যাপ মারফত পাঠিয়েছে মানব পাচারকারীরা। ইতালি পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মোটা টাকা দাবি করা হয়। বড় অংকের অর্থ পরিশোধের পরও আরো টাকা চেয়ে না পাওয়ায় তাদের হত্যা করা হয়।

মানব পাচারের মতো এমন অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পুলিশের কতিপয় সদস্যও যুক্ত থাকায় এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক অবহেলা এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে সাহায্য করছে। দৃশ্যত এখন পর্যন্ত এমন কোনো পদক্ষেপ রাষ্ট্রের তরফ থকে গ্রহণ করা হয়নি, যার কারণে মানব পাচারকারীরা এ ধরনের অপরাধ থেকে সরে আসবে। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের অপরাধ হচ্ছে, মানব পাচার হচ্ছে। কিন্তু কয়টি ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত মামলা সফল হয়েছে সেই প্রশ্নটি থেকেই যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্য এ ধরনের পাচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। আর্থিক সুবিধা নেন এবং নিরাপদে পাচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাহায্য করেন। এ ধরনের বিষয়গুলো আমরা বিগত দিনে দেখেছি।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনেস্ট ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম থেকে প্রকাশিত গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স বা বৈশ্বিক সংঘবদ্ধ অপরাধ সূচকের তথ্য অনুযায়ী, ১০-এর মধ্যে ৮ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ আন্তঃসীমান্ত অপরাধগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে মানব পাচার। সাড়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যৌন অপরাধের উদ্দেশ্যে পাচার। একই সূচক নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক পাচার। এরপরের অবস্থানে রয়েছে বন্যপ্রাণী চোরা শিকার ও পাচার। এ ধরনের অপরাধের সূচক মান ৫ দশমিক ৫। অস্ত্র চোরাচালানসংক্রান্ত অপরাধের সূচক মান ৫। একই সূচক মান নিয়ে এ তালিকায় রয়েছে বনজ সম্পদ ধ্বংস ও পাচারের জন্য সংঘটিত অপরাধ। এছাড়া ভেজাল পণ্য বিক্রির অপরাধের সূচক ৪ দশমিক ৫। একই সূচকে রয়েছে হিরোইনের কারবারসংক্রান্ত অপরাধ এবং অর্থনৈতিক অপরাধ।

মানব পাচার ছাড়াও বেশকিছু অপরাধে বৈশ্বিক সংঘবদ্ধ অপরাধ সূচকে অবস্থান ওপরের দিকে রয়েছে বাংলাদেশ। তার মধ্যে ছিনতাই ও চাঁদাবাজি অন্যতম। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে চাঁদাবাজি একটি বড় সমস্যা, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি এবং এমনকি উদ্বাস্তুদের কাছ থেকেও হুমকি ও সহিংসতার মাধ্যমে অর্থ আদায় করে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা অপহরণ ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সক্রিয় অপরাধ চক্রগুলো অপহরণে জড়িত। ঢাকায় সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্র সক্রিয়। চাঁদাবাজির কারণে অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী কর দিতে অনাগ্রহী।

বাংলাদেশে অস্ত্র পাচারকে একটি মাঝারি মাত্রার সমস্যা হিসেবে এ প্রতিবেদনে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ভারত ও নেপালে অস্ত্র পাচারের জন্য কৌশলগত রুট হয়ে উঠেছে কক্সবাজার। স্থানীয় অপরাধী চক্র মিয়ানমার থেকে আসা অস্ত্রের একটি ছোট বাজার পরিচালনা করে। ছোট অস্ত্রগুলো মূলত রাজনৈতিক অভিজাতদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়, যেখানে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর অস্ত্রধারী ক্যাডার রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো এরই প্রমাণ। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা বিকল্প জীবিকার অভাবে এ অস্ত্র বাণিজ্যে জড়িত হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রধান বনজ সম্পদ ধ্বংস ও পাচারের জন্য অপরাধের মধ্যে রয়েছে অবৈধভাবে গাছ কাটা, বনভূমি দখল ও ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগ। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে কাঠ পাচারও একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা। যদিও বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক ইভেন্ট ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীসংক্রান্ত অপরাধ মোকাবেলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তবে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে এসব অপরাধ দমনে এটি বড় নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হয় না।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার কক্সবাজার প্রতিনিধি ছৈয়দ আলম ও যশোর প্রতিনিধি আবদুল কাদের)

আরও