আঞ্চলিক বিপণন কর্মশালা

আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতে ব্যবস্থা চান রাজশাহীর চাষিরা

কর্মশালায় বক্তারা বলেন, উৎপাদন ভালো হলেও আম সংরক্ষণ ও পাল্পিংয়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ না থাকায় কৃষকরা ন্যায্য মুনাফা পাচ্ছেন না। তাই দ্রুত সংরক্ষণাগার স্থাপন এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন

রাজশাহী অঞ্চলে আম উৎপাদন ক্রমাগত বাড়লেও সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাতের সুযোগ-সুবিধার অভাবে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তারা আম সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত এবং এ খাতসংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

জেলার পবা উপজেলার বায়া এলাকায় ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে গতকাল সকালে আয়োজিত এক আঞ্চলিক বিপণন কর্মশালায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম এম আরিফ পাশার কাছে এসব দাবি তুলে ধরেন আমচাষি, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও অন্যান্য অংশীজন।

‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রিপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) এপিসিইউ-ডিএএম’ প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এ কর্মশালার আয়োজন করে।

দেশের অন্যতম প্রধান আম উৎপাদন অঞ্চল রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমের আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু রাজশাহী জেলায় ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন। গোপালভোগ, লক্ষণভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, কাটিমন, ফজলি, সুরমা ফজলি, বারি-৪, ব্যানানা ম্যাংগো ও গৌড়মতির মতো বিভিন্ন জাতের আম বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে এ অঞ্চলে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, এ খাতে বছরে প্রায় ৭৮০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার বাণিজ্য সম্ভাবনা রয়েছে।

কর্মশালায় বক্তারা বলেন, উৎপাদন ভালো হলেও আম সংরক্ষণ ও পাল্পিংয়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ না থাকায় কৃষকরা ন্যায্য মুনাফা পাচ্ছেন না। তাই দ্রুত সংরক্ষণাগার স্থাপন এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন।

আম ভ্যালু চেইন প্রমোশন বডির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও আমচাষি মো. হানিফ আলী মণ্ডল বলেন, আম পরিবহনে ব্যবহৃত ক্যারেট, কাগজ, সুতা ও অন্যান্য উপকরণের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তিনি জানান, এক মণ লক্ষণভোগ আমের দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা হলেও একটি ক্যারেটের দাম ২৮০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে, যা কয়েক মাস আগেও ১৬০ টাকায় পাওয়া যেত। তিনি আমের হাটে প্রচলিত ঢলন প্রথা, টোল ও অন্যান্য হয়রানি কমাতে প্রশাসনিক উদ্যোগের দাবি জানান।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী চাষি ও উদ্যোক্তারা আম রফতানি সম্প্রসারণের ওপরও জোর দেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্যোক্তা ও আমচাষি মুনজের আলম বলেন, বাংলাদেশ থেকে আম রফতানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে রাজশাহী অঞ্চলে একটি বিশেষায়িত আম রফতানি হাব গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা সম্প্রসারণ করা গেলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন।

ডিএএমের অধীন আম ভ্যালু চেইন প্রমোশনাল বডির নির্বাহী কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম সানা বলেন, ঢলন পদ্ধতির সুবিধা মূলত ব্যবসায়ীরা পেলেও কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই এ ব্যবস্থার সংস্কার বা বিলুপ্তির পাশাপাশি আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

চাষি, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম এম আরিফ পাশা রাজশাহীতে আম সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, রাজশাহী অঞ্চলের আমচাষি ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থ বিবেচনায় বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

তিনি আরো বলেন, কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কার্যকর বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত জরুরি। কৃষক ও উদ্যোক্তাদের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে প্রশিক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর নিরাপদ খাদ্য, ন্যায্য মূল্য এবং টেকসই বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে উদ্যোক্তাদের পাশে থেকে কাজ করে যাবে।

আরও