নির্মাণের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় ২০১৮ সালে ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করা হয় ফৌজদারহাটে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের দুই তলা ভবন। এরপর আট বছর পেরিয়ে গেলেও ভবনটির স্থানান্তর হয়নি। এরই মধ্যে ফৌজদারহাটে হাসপাতালের ২৩ দশমিক ৯২ একর জায়গা চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি সীতাকুণ্ডের কুমিরায় রেলওয়ের পরিত্যক্ত এলাকায় স্থানান্তরের প্রস্তাব করা হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোয় চলছে চিকিৎসাসেবা। পাশাপাশি হাসপাতালটির ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে জনবল সংকট ও আধুনিকায়নের ঘাটতিতে সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে ফৌজদারহাটে বিভাগীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি নির্মিত হয়। পরবর্তী সময়ে পুরনো অবকাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি ২০১৩ সালে নতুন দুই তলা ভবন নির্মাণ করা হয়। ইনডোরে রয়েছে ১০০ শয্যা। বহির্বিভাগে ৫ টাকা এবং ভর্তি রোগীদের ১০ টাকা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। তবে নির্মাণের মাত্র পাঁচ বছর পর ২০১৮ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তর ভবনটিকে ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, এ সিদ্ধান্তের আগে তাদের মতামত নেয়া হয়নি।
এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য ২০১৮ সালে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ২৩ দশমিক ৯২ একর জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়। এ কারণে হাসপাতালটি সীতাকুণ্ডের কুমিরা রেলস্টেশনসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় রেলওয়ের পরিত্যক্ত বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রায় ১০ একর জায়গায় স্থানান্তরের প্রস্তাব করা হয়। রেলওয়ের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে স্থানান্তরের আলোচনা হলেও এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফৌজদারহাটের বক্ষব্যাধি হাসপাতাল নিয়ে অনেক বড় পরিকল্পনা ছিল। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে হাসপাতালটি স্থানান্তরের বিষয়টি উঠলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিকল্প জায়গা দেখার কথা বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় অন্যত্র হলে বক্ষব্যাধি হাসপাতাল সরানোর প্রয়োজন হবে না; বরং হাসপাতালটি আরো আধুনিকায়ন করা সম্ভব হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যক্ষ্মা ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় এ হাসপাতালের জন্য অনেক জায়গার প্রয়োজন। দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হবে। যদিও হাসপাতালের জায়গায় অনেক স্থাপনা এরই মধ্যে তৈরি করা হয়েছে।’
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ১০১ জন ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা (ডিআর-টিবি) রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ১১৭, ২০২৪ সালে ১১৪ এবং ২০২৩ সালে ২২৮ জন। অন্যদিকে সাধারণ যক্ষ্মা (ডিএস-টিবি) রোগীর ক্ষেত্রে ২০২৩ সালে ৩১৪ জন, ২০২৪ সালে ৩৬২ এবং ২০২৫ সালে ৩৫৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। চলতি বছরের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ২১১ জন রোগী নিবন্ধিত হয়েছেন।
২০২৩ থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ১ হাজার ২৪২ জন সাধারণ যক্ষ্মা রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এ সময় ডিআর-টিবির চিকিৎসায় বিপিএএলএম পদ্ধতির ব্যবহারও বেড়েছে। ২০২৩ সালে এ পদ্ধতিতে কোনো রোগী চিকিৎসা না পেলেও ২০২৪ সালে নয়জন এবং ২০২৫ সালে ৯৭ জন চিকিৎসা পেয়েছেন।
যক্ষ্মা শনাক্তে পরীক্ষার পরিধি বাড়লেও জিনএক্সপার্ট পরীক্ষায় শনাক্তের হার কমেছে। ২০২৩ সালে ৮৪৫ জনের পরীক্ষায় ৩০০ জন, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৬৭০ জনের পরীক্ষায় ৩৯৯ জন এবং ২০২৫ সালে ২ হাজার ৩৯৯ জনের পরীক্ষায় ৩৩৭ জনের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়।
সরজমিনে দেখা যায়, বহির্বিভাগে রোগীর চাপ তুলনামূলক কম। দুপুর পর্যন্ত ৪১ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। তবে সংক্রামক রোগের চিকিৎসা কেন্দ্র হওয়ায় হাসপাতালটিতে বহিরাগতদের আনাগোনাও কম।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, যক্ষ্মা রোগীদের রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীদের ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করা হয়। তবে রোগী এমডিআর (মাল্টিড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট টিউবারকুলোসিস) আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। এ ধরনের রোগীর চিকিৎসা অন্তত আট সপ্তাহ থেকে দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। এ সময় প্রয়োজনীয় সব ওষুধ হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। কোনো কারণে ওষুধের মজুদ শেষ হলে বাইরে থেকে কিনতে বলা হয়, যদিও এমন ঘটনা খুবই কম।
চিকিৎসকদের হিসাবে, হাসপাতালে ভর্তি একজন রোগীর পেছনে সরকারের ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য হাসপাতালের পরীক্ষাগারে জিনএক্সপার্ট, পিসিআর, ভিটেক-২ ও বায়োফায়ারের মতো বিভিন্ন যন্ত্র রয়েছে। এসব যন্ত্রে যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের পরীক্ষা করা হয়। তবে এসব চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকলেও জনবল সংকটে হাসপাতালের সেবার পরিধি ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতালে ১৩৫টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৬০ জন। শূন্য রয়েছে ৭৫টি পদ। ১৭টি সহকারী নার্সের পদে কেউ নেই। অফিস সহায়কের ২৫টির মধ্যে ২৩টি এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ১৫টির মধ্যে ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদে থাকলেও তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংযুক্ত আছেন।
হাসপাতালের চিকিৎসা তত্ত্বাবধায়ক ডা. এসএম নুরুল করিম বলেন, ‘হাসপাতালের সংকটের বড় কারণ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের প্রকল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ তলা ভবনের তিনটি ফ্লোর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দেয়ার কথা মৌখিকভাবে জানানো হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপিপিতে হাসপাতালের বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। ফলে এ বরাদ্দের নিশ্চয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘হাসপাতালটি কুমিরায় রেলওয়ের পরিত্যক্ত বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এলাকায় স্থানান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে টেকনাফ, কুমিল্লা ও চাঁদপুরের রোগীরা আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত এবং অনেকে ঢাকামুখী হচ্ছেন।