এপ্রিলের জন্য এলএনজির জোগান নিশ্চিত করেছে পেট্রোবাংলা

বাড়তি দামে কেনায় চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি ছাড়াবে ২০ হাজার কোটি টাকা

বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের মধ্যে দেশে গ্যাসের সরবরাহ ঠিক রাখতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সংকট রাখতে চায় না সরকার।

যে কারণে খোলা বাজার থেকে বেশি দাম দিয়েও এলএনজির জোগান ঠিক রাখা হচ্ছে। আগামী এপ্রিলের জন্য প্রয়োজনীয় এলএনজির সব কার্গো সরবরাহের নিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। ওই মাসের জন্য মোট নয় কার্গো এলএনজি কেনা হচ্ছে। এর মধ্যে আট কার্গো আসবে স্পট মার্কেট থেকে আর বাকি এক কার্গো কেনা হবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বিকল্প একটি দেশ থেকে। তবে বাড়তি দামে কেনায় চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি আগের অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের হিসাবে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি ছাড়াবে ২০ হাজার কোটি টাকা।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা এপ্রিলের চাহিদা অনুযায়ী নয়টি কার্গো সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। এ বিষয়ে গত ২৫ মার্চ নিশ্চিত হওয়া গেছে। আটটি কার্গো কেনা হবে স্পট মার্কেট থেকে এবং বাকি একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়।’

দেশে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি কেনে বাংলাদেশ। এর মধ্যে কাতার এনার্জির কাছ থেকে প্রতি বছর ৪০ কার্গো এলএনজি কেনা হয়। আর ওমানের ওকিউটি থেকে কেনা হয় ১৬ কার্গো এলএনজি।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে সব ধরনের এলএনজি আমদানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি একটি এলএনজি কার্গো কেনা হচ্ছে কাতার এনার্জির কাছ থেকে। তবে কার্গোটি সরবরাহ করবে অ্যাঙ্গোলা থেকে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর আগে শিডিউল অনুযায়ী ১১টি এলএনজি কার্গো কেনার পরিকল্পনা ছিল সরকারের। তবে কাতারের এলএনজির স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বিশ্বব্যাপী এলএনজি সংকট শুরু হওয়ার কারণে দাম বৃদ্ধি ও গ্যাসের তীব্র সংকট শুরু হয়েছে। যে কারণে পরিকল্পনা থাকলেও এলএনজির সরবরাহ ব্যবস্থাপনা সংকটে দুটি কার্গো কম আমদানি হচ্ছে।

দেশে গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে দীর্ঘমেয়াদি উৎস বন্ধ হলেও বিকল্প উপায়ে এলএনজি কিনছে সরকার। এতে দামের বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে সরবরাহ সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে গ্যাস খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, স্পট মার্কেট থেকে কার্গোপ্রতি এলএনজি প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন মেট্রিক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) গড়ে প্রায় ২২ ডলার করে কেনা হচ্ছে, যা যুদ্ধের আগে প্রতি এমএমবিটিইউ সাড়ে ৯-১০ ডলারে কেনা হতো। অর্থাৎ গ্যাসের সরবরাহ ঠিক রাখতে এখন দ্বিগুণেরও বেশি দামে এলএনজি কেনা হচ্ছে।

এলএনজি আমদানি করে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি আগের অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার শীর্ষ কর্মকর্তারা।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন এলএনজি কার্গো কেনা হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি দামে। সেই হিসাবে ভর্তুকিও আগের অর্থবছরে চেয়ে বেড়ে যাবে।’ কি পরিমাণ ভর্তুকি বাড়াতে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ অর্থবছরে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার মতো ভর্তুকি লাগবে।’

দেশে প্রতি বছর এলএনজি আমদানির জন্য গড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখে সরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ৬ হাজার কোটি টাকা এলএনজিতে ভর্তুকি রাখলেও অতিরিক্ত কার্গো আমদানি করায় ওই অর্থবছরে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ভর্তুকি লাগে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও গ্যাস খাতে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রাক্কলন রাখা হয়েছে। তবে এ অর্থ এখন কয়েক গুণ বেড়ে যাবে বলে জানা গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর কাতার এনার্জি, ওমানের ওকিউটি ট্রেডিং এবং এক্সেলারেট এনার্জিসহ বড় সরবরাহকারীরা ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ (নিয়ন্ত্রণ-বহির্ভূত ঘটনা, যেমন যুদ্ধ, মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগে চুক্তির বাধ্যবাধকতা পালন থেকে দায়মুক্তি) ঘোষণা করে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এরই মধ্যে কাতার এনার্জির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির চুক্তিবদ্ধ অনেক দেশ এর আওতায় পড়েছে। যে কারণে দেশগুলো এখন এলএনজি সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশে কাতার এনার্জি এখনো দীর্ঘমেয়াদে ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা না করলেও এ সংকটকে এড়িয়ে যাচ্ছেন না বিশ্লেষকদের অনেকেই।

দেশে এলএনজি আমদানির বৃহৎ অংশই কাতার এনার্জির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরে পেট্রোবাংলার মোট ১১ কার্গো এলএনজি আমদানির প্রাক্কলনের মধ্যে কাতার এনার্জি থেকে ৪০ কার্গো এলএনজি আমদানির প্রাক্কলন রয়েছে।

দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গত ১১ মার্চ স্পট মার্কেটে দ্বিগুণেরও বেশি দামে তিন কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তিন কার্গো এলএনজি কিনতে ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে দুই কার্গো এবং যুক্তরাজ্য থেকে এক কার্গো এলএনজি আসবে।

তিন কার্গো এলএনজির মধ্যে যুক্তরাজ্যের টোটাল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে এক কার্গো এলএনজি ৯০৭ কোটি ৮৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩০৪ টাকা দিয়ে আমদানি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতি এমএমবিটিইউর মূল্য ধরা হয়েছে ২১ দশমিক ৫৮ ডলার।

গত বছরের ৯ ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যের এ প্রতিষ্ঠান থেকে এক কার্গো এলএনজি ৪৩৬ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫২ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সে সময় প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ধরা হয় ১০ দশমিক ৩৭ মার্কিন ডলার।

তিনি আরো বলেন,‘কাতার এনার্জির পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু না করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌ-পরিবহন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।’

গত ২৬ মার্চ যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কাছ থেকে দুই কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দুই কার্গো এলএনজি কিনতে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি ৭৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ধরা হয়েছে ১৯ দশমিক ৭৭ ডলার।

দেশে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা মোট গ্যাসের মধ্যে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে এলএনজির, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ করা হয় গড়ে সাড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে বর্তমানে গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে সাড়ে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।

আরও