‘উত্তরবঙ্গের মাটি বিএনপির ঘাঁটি’ কথাটি বেশ প্রচলিত। তবে এবার কথাটির কিছুটা হলেও ব্যত্যয় ঘটতে পারে বলে অভিমত সুশীল, সাধারণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনের মাধ্যমে রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসন গত ১৭ বছর দখলে রেখেছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দেড় বছর পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এবারের নির্বাচনে হারানো আসনগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় ব্যস্ত। তবে সেক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী ভোটারদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও বিএনপির মধ্যে তৈরি হওয়া বিভেদকে কাজে লাগিয়ে অর্ধেকের বেশি আসনে ভাগ বসাতে চায় জামায়াত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর ছয়টি আসনে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে বিভেদ প্রকাশ্যে আসা শুরু করেছিল। রাজশাহী-২ (সদর) ও ৬ (বাঘা-চারঘাট) আসন বাদে বাকি চারটিতে প্রার্থী বদলের দাবিও উঠেছিল। রাজশাহী-১ ও ৩ আসনে বিক্ষোভ মিছিল এবং সড়ক অবরোধ করেন দলটির একাংশের নেতাকর্মীরা। এছাড়া রাজশাহী-৪ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে মনোনয়নপ্রত্যাশীর লোকজনের বাড়িঘরে হামলার অভিযোগও ওঠে। রাজশাহী-৫ আসনে প্রার্থী বদলের দাবিতে সমাবেশ ও বিক্ষোভ করেন মনোনয়ন প্রত্যাশীর সমর্থকরা।
তবে দলটির নেতারা বলছেন, প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনের কারণে বিএনপি কিছুটা অস্বস্তিতে ছিল। যদিও তা শেষ পর্যন্ত মিটমাট করা গেছে।
এ প্রসঙ্গে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিএনপির দীর্ঘদিনের শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে অন্য দল সুযোগ পাবে না। তবে মনোনয়ন নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ ছিল। সেটা কেটে গেছে। এখন আমরা সবাই নির্বাচনী মাঠে একসঙ্গে দলীয় প্রার্থীর জন্য কাজ করছি। জেলার সব আসনেই আমাদের ভালো ফলাফল আসবে।’
তবে তার দাবিকে উড়িয়ে দিয়ে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মণ্ডল বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘আগে বিএনপির শক্ত অবস্থান ছিল। এখন সেটি নেই। বিএনপি নেতাকর্মীদের নেতিবাচক অবস্থানই জামায়াতকে নির্বাচনের মাঠে বাড়তি সুবিধা দেবে। ভোটাররাও তাদের এসব বিরোধ নিয়ে বিরক্ত।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীর ছয়টি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন ৩০ জন। এর মধ্যে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন বিভিন্ন দলের চার প্রার্থী। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন শরীফ উদ্দিন। এছাড়া জামায়াতের অধ্যাপক মজিবুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের মো. শাহজাহান, এবি পার্টির আবদুর রহমানও রয়েছেন ভোটের মাঠে। আসনটিতে ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৫৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৯, নারী ২ লাখ ৩৪ হাজার ২৭৭ ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার তিনজন।
বিএনপি নেতা মরহুম ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভাই মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দিন। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ছিলেন। আমিনুল হক এ আসনে তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। মন্ত্রীও ছিলেন। আরেক ভাই এম এনামুল হকও একবার দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবার শরীফ উদ্দিনকে বেছে নিয়েছে বিএনপি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এখন পর্যন্ত এ আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পাঁচবার করে, জামায়াত প্রার্থী একবার নির্বাচিত হয়েছেন। সব মিলিয়ে বিএনপির ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত এ আসন পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় রয়েছে দলটি। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন মনোনয়ন বঞ্চিতরা।
রাজশাহী-২ (সদর) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন মিজানুর রহমান মিনু। এছাড়া ভোটের মাঠে রয়েছেন জামায়াতের ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এবি পার্টির মু. সাঈদ নোমান, নাগরিক ঐক্যের মোহাম্মদ সামছুল আলম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মেজবাউল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সালেহ আহমেদ।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ভোটার রয়েছেন ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৪ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৫১, নারী ১ লাখ ৯১ হাজার ৩০৫ ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন আটজন।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু ১৯৯১-২০০১ সাল পর্যন্ত এ আসনে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আসনটিতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। পারিবারিক ও আর্থিকভাবে বেশ সামর্থ্যবান তিনি। পেশায় চিকিৎসক এবং রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, পৃষ্ঠপোষক হওয়ায় নগরজুড়ে তারও বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে।
পবা ও মোহনপুর নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৩ আসন। মোট ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ২৩ হাজার ১৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ১০ হাজার ৮৮৬, নারী ২ লাখ ১২ হাজার ৩০৭ ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ছয়জন।
আসনটিতে ভোটে লড়ছেন পাঁচজন। এর মধ্যে বিএনপির মনোয়ন পেয়েছেন শফিকুল হক মিলন। এছাড়া জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ, জাতীয় পার্টির আফজাল হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের ফজলুর রহমান ও আমজনতার দলের সাইদ পারভেজও ভোটের মাঠে রয়েছেন।
প্রথমদিকে মিলনকে ‘বহিরাগত’ উল্লেখ করে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে মাঠে নামেন দুই মনোনয়নপ্রত্যাশী রায়হানুল আলম রায়হান ও দলের সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী কবির হোসেনের ছেলে নাসির হোসেন অস্থিরের অনুসারীরা। তবে সময় গড়িয়ে বর্তমানে তাদের মধ্যে দেখা গেছে ঐক্যের বন্ধন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এ আসনে সীমানা পুনর্গঠন করা হয়। এর পর বিএনপি তিনবার, আওয়ামী লীগ চারবার, জাতীয় পার্টি দুবার ও বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ একবার বিজয়ী হয়।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে ভোটে লড়ছেন চারজন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ডিএমডি জিয়াউর রহমান, জামায়াতের আবদুল বারী সরদার, জাতীয় পার্টির ফজলুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তাজুল ইসলাম খান। আসনটিতে ভোটার ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬০ হাজার ৭৩৫, নারী ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৮৬ ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন। পূর্বে এ আসনে বিএনপি তিনবার, আওয়ামী লীগ পাঁচবার ও জাতীয় পার্টি এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ একবার করে জয় পেয়েছে।
পুঠিয়া ও দুর্গাপুর নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৫ আসনে লড়ছেন বিএনপির নজরুল ইসলাম মণ্ডল, জামায়াতের মনজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রুহুল আমিন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির আলতাফ হোসেন মোল্লা, স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসফা খায়রুল হক, রায়হান কাওসার ও রেজাউল করিম। এ আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৮, নারী ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার পাঁচজন।
আসনটিতে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ইসফা খায়রুল হক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীকে লড়ছেন। একই আসনে যুক্তরাজ্য জিয়া পরিষদের সহসভাপতি রেজাউল করিমও ফুটবল প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন। আসনটিতে রায়হান কাওসার নামে আরেকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত রায়হান কাওসার এবার পেয়েছেন মোটরসাইকেল প্রতীক।
এদিকে প্রথমে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি নুরুজ্জামান লিটনকে মনোনয়ন দেয় দলটি। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত বদলের ফলে জামায়াতের মঞ্জুর রহমানকে মনোনীত করা হয়। আসনটি বরাবরই বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল দলটির নেতা নাদিম মোস্তফার জন্য। এমনকি আওয়ামী লীগের সময়ও তিনি ছিলেন দুর্বার। তার মৃত্যুর পর ছেলে নাঈম মোস্তফা এমপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চেয়েও পায়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অনড় থাকলেও শেষমেশ মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে ঋণ খেলাপির কারণে বাদ পড়েন তিনি।
রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনে ভোটে লড়ছেন বিএনপির আবু সাইদ চাঁদ, জামায়াতের নাজমুল হক, জাতীয় পার্টির ইকবাল হোসেন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুস সালাম সুরুজ। আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৮ হাজার ১৮, নারী ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৩ ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন দুজন।
আসনটিতে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন বিএনপি প্রার্থী চাঁদ। নিজ নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয় এ বর্ষীয়ান নেতা। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত আসনটিতে জাতীয় পার্টি দুবার, বিএনপি চারবার ও আওয়ামী লীগ পাঁচবার জয় পেয়েছে।