কক্সবাজারে পানিবন্দি লাখো মানুষ, চারদিনে ২৫ জনের মৃত্যু

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে।

টানা কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং সড়ক যোগাযোগসহ স্বাভাবিক জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জেলা ও স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, গত সোমবার থেকে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। চকরিয়া উপজেলার কাকারা, কৈয়ারবিল, লক্ষ্যারচর, ফাঁসিয়াখালী, বরইতলী, বমু-বিলছড়ি, ডুলাহাজারা, সাহারবিল ও সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

এছাড়া, পানি বেড়ে যাওয়ায় চকরিয়া পৌরসভার হাসপাতালপাড়া, থানা সেন্টার ও নিউমার্কেট এলাকায় সড়কে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পেকুয়ার মেহেরনামা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। সদর, শীলখালী ও আশপাশের নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমি পানির নিচে চলে গেছে এবং রান্না করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছে।

অন্যদিকে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে এবং স্লুইস গেট খুলে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রশাসন।

চকরিয়া ও মাতামুহুরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, কৃষিজমি, আমনের বীজতলা ও চিংড়ির ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা অব্যাহত থাকলে কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন তারা।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। আগামী দিনগুলোতেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

জেলা ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার থেকে এ পর্যন্ত জেলায় মোট ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে ১৮ জন নিহত হন। এছাড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আজ শুক্রবার দুপুরে চকরিয়া উপজেলার হারবাং সেতু এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবির ঘটনায় আব্দুল মালেকের ১২ বছর বয়সী কন্যা হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণার মৃত্যু হয়। এর আগে, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নে দুই বছরের ওয়াকিম এবং মাতামুহুরীর কোনাখালী ইউনিয়নে তিন বছরের পুষ্প মারা যায়।

এর আগে, বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়াকাটা (ডবলতলী) এলাকায় ভোররাতে পাহাড়ধসে দুই ভাইবোন নিহত হন। নিহতরা হলেন তৌসিফ মিয়া (১৩) ও রুমি আক্তার (১৭)। এ ঘটনায় আরো একজন আহত হয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে।

আরও