ফলে দেশের প্রধান এ নগরীর জলাবদ্ধতা, পানির সংকট এবং তাপদ্বীপ (আরবান হিট আইল্যান্ড) সমস্যা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। অথচ রাজধানীর পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এবং জলাবদ্ধতা কমাতে প্রায় তিন বছর আগেই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ ২০২২-৩৫) ১৪টি ইকোপার্ক ও ৫৫টি ওয়াটার পার্ক নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছিল। যদিও এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
সাম্প্রতিক টানা ভারি বর্ষণে ঢাকার অধিকাংশ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ার পর আবারো সামনে এসেছে নগর পরিকল্পনার এ অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির বিষয়টি। নগরবিদদের মতে, পরিকল্পিতভাবে জলাধার ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করা গেলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা যেমন কমানো সম্ভব, তেমনি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে এসব ইকোপার্ক ও ওয়াটার পার্ক।
ড্যাপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজউকের আওতাধীন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পুরো এলাকা এবং গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত পরিকল্পনা অঞ্চলে মোট ১৪টি ইকোপার্ক এবং ৫৫টি ওয়াটার পার্ক গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। ইকোপার্কের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানকে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, রাজউকের আওতায় থাকা ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের পুরো অংশকে ইকোপার্ক হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি গাজীপুরের ধীরাশ্রম, খালিকাইর ও গাজীপুরা মৌজার প্রায় ২২৭ একর এবং জয়দেবপুরের ভুরুলিয়া মৌজার ৮২ দশমিক ৬৩ একর জমিও ইকোপার্ক হিসেবে সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে ড্যাপে।
পূর্ববর্তী পরিকল্পনাগুলোয়ও রাজধানীর ভেতর জলাধার, রিটেনশন পন্ড, বন্যাপ্রবাহ এলাকা চিহ্নিত করে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেগুলোকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি বলে অভিযোগ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের। এ বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা এখন একটু বৃষ্টিতেই ডুবে যায়। গরমে টেকা যায় না। খাওয়ার পানি পাওয়া যায় না। বারবার নগর পরিকল্পনাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখানোর ফলই হলো আজকের এ চতুর্মুখী দুর্যোগ।’
রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শনে মাঠ, পার্ক, জলাধার, বৃক্ষ, বন্যপ্রাণী, পাখি—এসব গৌণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন ড. আদিল মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘সুপারিশ করা হয়েছে ৫৫টি (ওয়াটার পার্ক), দেখা গেল ২০ বছর পর একটি বা দুটি বাস্তবায়ন হলো। আর বাকি সব এলাকা আবাসন, বাণিজ্যিক ভবনে বেদখল হয়ে গেল। এভাবেই তো ঢাকা নষ্ট করেছি আমরা।’
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম ইকোপার্কটি হলো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নাসিরাবাদের গজারিয়া ও বালুধিতপুর মৌজার ১ হাজার ২০৬ একর ফাঁকা ভূমি। এর আগের ড্যাপে এবং ঢাকা স্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে (ডিএমডিপি) এলাকাটিকে দেখানো হয়েছিল ওয়াটার রিটেনশন পন্ড হিসেবে। যদিও সরকার এখন পর্যন্ত জলাধারটি সংরক্ষণের ব্যাপারে জোরালো কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
ইকোপার্কের জন্য চিহ্নিত রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উত্তরখানের স্নানঘাটা, তালনা, ভাতুরিয়া ও ছোট পলাশিয়া মৌজার প্রায় ৫০৮ একর এলাকা। এটিও অতীতে ওয়াটার রিটেনশন পন্ড হিসেবে নির্ধারিত ছিল। বর্তমানে এখানেও সংরক্ষণ কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
ড্যাপে আরো যেসব এলাকায় ইকোপার্ক গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের চর সাংঘার্ড ও চর বক্তারবলি মৌজার প্রায় ২৮৪ একর এলাকা; সাইনবোর্ডের ডগার মৌজার ৪৩ একর; নারায়ণগঞ্জের জালকুড়ি ও কুবিতপুর মৌজার প্রায় ৮৯ একর; জালকুড়ি ও দেউলপারা মৌজার সাড়ে ৮৬ একর জমি। এছাড়া মেনিখালির বাইদের বাজার এলাকার ৬১ একর, রূপগঞ্জ-কালীগঞ্জের সাদিপুর ও জামপুর মৌজার ৫২ একর, জাঞ্জির মৌজার সাড়ে ৬৩ একর, পিতলগঞ্জ মৌজার ১৪ একর এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বুড়িগঙ্গা-তীরবর্তী কাটাসুর মৌজার প্রায় সাড়ে তিন একর জমিতে ইকোপার্ক গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে ড্যাপে।
জানা যায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ণয়ের জন্য ১৯৯৫ সালে ২০ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত পরিকল্পনা করেছিল রাজউক। পরিকল্পনাটির নাম ছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি ১৯৯৫-১৫)। সে পরিকল্পনায় বলা হয়, ভবিষ্যতের ঢাকাকে জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে হলে পাঁচটি রিটেনশন পন্ড বা স্থায়ী জলাধার প্রয়োজন। কোন কোন এলাকায় জলাধারগুলো হবে সেগুলোও চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছিল ওই প্ল্যানে।
পরবর্তী সময়ে রাজউক ডিএমডিপি প্ল্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১০ সালে প্রথম রাজধানীর জন্য বিশদ একটি আঞ্চলিক পরিকল্পনা বা ড্যাপ প্রণয়ন করে। সে বিশদ পরিকল্পনায় কল্যাণপুর, গোড়ান চটবাড়ি, নাসিরাবাদ, বেরাইদ ও উত্তরখানে বৃহৎ এলাকাজুড়ে (২০০-৫০০ একরের বেশি) স্থায়ী জলাধার বা রিটেনশন পন্ড হিসেবে সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়। এসব পন্ড সংরক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল বন্যা, জলবাদ্ধতা, বৃষ্টির পানির গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণসহ প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে রাজধানীর বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার। বর্তমান ড্যাপ এবং ঢাকা ওয়াসা ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানেও এলাকাগুলোকে স্থায়ী জলাধার হিসেবেই চিহ্নিত করা আছে। কিন্তু রাজধানীর নদী, খাল, লেক ও অন্যান্য গণপরিসরের মতোই এসব স্থায়ী জলাধার বেদখল হয়ে পড়েছে।
আগের পরিকল্পনায় চিহ্নিত অধিকাংশ জলাধারই দখল ও ভরাটের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সে অভিজ্ঞতা থেকে রাজধানীর অবশিষ্ট জলাধার সংরক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা মোকাবেলায় নতুন ড্যাপে ইকোপার্কের পাশাপাশি ৫৫টি জলকেন্দ্রিক পার্ক বা ওয়াটার পার্ক নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। ড্যাপসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রচলিত ওয়াটার রিটেনশন পন্ড ধারণাকে আরো আধুনিক ও বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এ পরিকল্পনায়। আগে রিটেনশন পন্ড নির্মাণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ (বেড়িবাঁধ) নির্ভরতা থাকলেও নতুন পরিকল্পনায় সে পথ থেকে সরে এসে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ পানি যেন স্বাভাবিক গতিতে প্রবেশ ও নির্গমন করতে পারে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই ইকোপার্ক ও ওয়াটার পার্কের ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় জলাধার বলতে প্রাকৃতিক, স্থায়ী বা মৌসুমি এমন জলাভূমিকে বোঝানো হয়েছে; যেখানে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় পানি থাকে এবং এর গভীরতা সাধারণত ছয় মিটারের কম। এসব জলাধার স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ড্যাপে প্রস্তাবিত ওয়াটার পার্কগুলোর আয়তন ইকোপার্কের তুলনায় তুলনামূলক ছোট। অধিকাংশ পার্কের আয়তন ৫০-১০০ একরের মধ্যে। কোথাও দুই থেকে চার একরের ছোট পার্ক রয়েছে, আবার কয়েকটি পার্কের আয়তন ২০০ একরেরও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ওয়াটার পার্কটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের গোড়ান-চটবাড়ি এলাকায়, যার আয়তন প্রায় ৫৮৭ একর। অন্যদিকে সবচেয়ে ছোট পার্কটি কল্যাণপুর হাউজ বিল্ডিং এলাকায়, যার আয়তন আড়াই একরের মতো। মূলত রাজউকের আওতাধীন এলাকায় যেখানে উল্লেখযোগ্য জলাধার রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণ করেই ওয়াটার পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে নতুন ড্যাপে।
রাজউকের আওতাধীন এলাকার ৪৯টি জলাভূমিকে ঘিরে এসব পার্ক নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বিদ্যমান জলাধার সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি ধারণ, জলাবদ্ধতা কমানো, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মাছ চাষ এবং সামগ্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারেও যেন এগুলো ভূমিকা রাখে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ড্যাপের সাবেক প্রকল্প পরিচালক এবং রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারে এ ধরনের ইকোপার্ক ও ওয়াটার পার্ক নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। রাজউক এরই মধ্যে মতিঝিলে একটি পার্ক নির্মাণ শুরু করেছে ও ঘাটারচরে আরো একটি ছোট পার্ক নির্মাণের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এখনো সেগুলোর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হয়নি।’
এতগুলো পার্ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ এককভাবে রাজউকের পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এজন্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য সংস্থাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় এসব পার্ক বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ—দুটিই কঠিন হয়ে পড়বে।’