২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে বেড সংকটে বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন ও মশারি না পাওয়ার অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। চিকিৎসাসেবার মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রোগীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতার কারণে বেড়েছে এর প্রকোপ। তবে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল সরজমিনে দেখা যায়, মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের নতুন ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলার পুরুষ, মহিলা ও শিশু ওয়ার্ডের পাশাপাশি বারান্দায় রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। ডেঙ্গু ও সিজনাল ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে জেলা সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন অধিকাংশ রোগী। এছাড়া পেটব্যথা ও ডায়রিয়া নিয়েও ভর্তি হয়েছেন অনেকে।
চিকিৎসাধীন রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ, প্রয়োজনীয় স্যালাইন ও মশারি সরবরাহ করা হচ্ছে না। চিকিৎসার নিম্নমানের কারণে সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে চিকিৎসকদের দেখা মেলে না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ছয় শতাধিক ডেঙ্গু রোগী। জেলার বাকি পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ছিলেন আরো চার শতাধিক রোগী। এছাড়া ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে আড়াই হাজারের বেশি মানুষ।
চলতি বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ১১, ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ ও মার্চে চারজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। এপ্রিল থেকে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে, যা ৩৯ জনে দাঁড়ায়। মে মাসে ৩৫ জন ভর্তি হলেও জুনে পরিস্থিতি বদলে যায়। জুনে রোগী ভর্তি হন ১৫১ জন। তবে জুলাইয়ের শুরু থেকে পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে যায়। ১-২৪ জুলাই পর্যন্ত শুধু সদর হাসপাতালেই ৩৩৪ রোগী ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০ জন করে নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩৪ জন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি।
আক্রান্তদের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ সদর উপজেলার নতুনগাঁও, মিরেশ্বর, মহাকালী, পঞ্চসার ইউনিয়ন, উত্তর ও দক্ষিণ ইসলামপুর এবং খালিস্ট এলাকার বাসিন্দা। এছাড়া মিরকাদিম পৌরসভা থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী ভর্তি হয়েছে।
খালিস্ট এলাকার বাসিন্দা সুমি বেগম জানান, তার পাঁচ বছরের শিশুকন্যা তাসনিম ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তীব্র জ্বর নিয়ে গত বুধবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা নেয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিনি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান।
হাসপাতালের চতুর্থ তলায় পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা সামিম মোল্লা জানান, তিনি শহরের উত্তর ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দা। শরীরে তীব্র ব্যথা ও জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে। তিনিও অভিযোগ করেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে পৌর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ঘরে ঘরে জ্বর ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক মৌসুমী মাহবুব বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। সকালে ও বিকালে মশক নিধন স্প্রে করা হচ্ছে। পাশাপাশি জলাবদ্ধ স্থানে ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া দেয়া হচ্ছে।’
মিরকাদিম পৌর প্রশাসক ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফার বলেন, ‘এডিস মশার নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে পৌর কর্তৃপক্ষ।’
হাসপাতালের সেবার সংকট প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আরিফুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য আলাদা আইসোলেশন কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। পর্যাপ্ত স্যালাইন, মশারি ও ওষুধ দেয়া হচ্ছে।’ তবে রোগী বাড়ায় তিনি কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে।
এদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা সত্ত্বেও লোকবল নিয়োগ না হওয়ায় হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে। কবে চালু হবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি তত্ত্বাবধায়ক।