যশোরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোয় ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০১ জন ডেঙ্গু রোগী। এর বাইরে বেসরকারি পর্যায়েও চিকিৎসা নিচ্ছেন শতাধিক রোগী। শহরের তুলনায় গ্রামে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি মানুষ। এদিকে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কীটতত্ত্ববিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দুই বছর ধরে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে শূন্য রয়েছে এ পদ। ফলে কোথায় কীভাবে ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকার পরে যে কয়েকটি জেলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি তার মধ্যে অন্যতম যশোর। আক্রান্তের সংখ্যা শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে বেশি। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর ১০টা পর্যন্ত জেলায় নতুন করে ৩২ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে অভয়নগরে ১০ জন, বাঘারপাড়ায় ছয়, ঝিকরগাছায় একজন, কেশবপুরে আট, মণিরামপুরে চার, শার্শায় তিন ও সদর উপজেলায় চারজন রয়েছেন। এ নিয়ে জেলায় চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৮ জনে। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ১৬৬ জন। উন্নত চিকিৎসার জন্য যশোর থেকে ঢাকায় রেফার করা হয়েছে ১৯ জনকে। চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। আক্রান্ত হার সবচেয়ে বেশি নৌ-বন্দরনগরী অভয়নগরে উপজেলায় ৫৭৩ জন।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ডেঙ্গু ওয়ার্ডের নির্ধারিত শয্যার বাইরে পুরুষ ও নারী মেডিসিন ওয়ার্ডেও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে বর্তমানে ১০০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ডেঙ্গু ওয়ার্ড ও পুরুষ-নারী মেডিসিন ওয়ার্ড মিলিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫১ জন। হাসপাতালের বহির্বিভাগে এদিন চিকিৎসা নিয়েছেন ২৩২ জন পুরুষ ও ৩১১ নারী। তাদের অধিকাংশই জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসেন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাদের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদাভাবে ২০ শয্যা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেককে নারী ও পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের সেবায় অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স কাজ করছেন। বর্তমানে ওষুধ বা স্যালাইনের কোনো সংকট নেই। মানুষ সচেতন না হলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এজন্য সবাইকে এখনই সতর্ক হতে হবে।’
মূলত চার কারণে যশোরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি হয় বলে জানিয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। তার মতে, মূলত শহর এলাকায় এডিস মশার বংশবিস্তার হয়। যশোর হচ্ছে যোগাযোগের ট্রানজিট পয়েন্ট। যানবাহন; বিশেষ করে ট্রেন, ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসের মাধ্যমে রাজধানীকেন্দ্রিক এডিস মশার বিস্তার যশোরে ঘটেছে। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেন যশোর আসে। সেখানে থাকা ফাঁকা বগিতে মানুষের সঙ্গে এডিস মশাও ট্রান্সফার হতে পারে। ট্রানজিট পয়েন্ট বিধায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এমনকি ভারত থেকেও যানবাহন যশোরে আসে। ফলে স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি। আবার যশোরে ভালো চিকিৎসাসুবিধা থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মাধ্যমেও ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। এছাড়া জেলার তিনটি উপজেলা অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুরে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। মাঝেমধ্যে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়াতে এসব জায়গায় ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে।
যশোরে বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয় আগস্টের মাঝে থেকে সেপ্টেম্বর ধরে। প্রকোপ বাড়লেও এডিস মশা নিয়ে কোনো জরিপ হয়নি। এর মূল কারণ জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। জেলা কীটতত্ত্ববিদ আমিনুল হক দুই বছর আগে অবসরে গেছেন। তিনি অবসরে যাওয়ার পর থেকে তার পদ শূন্য। কার্যত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও জেলায় কোথায় কীভাবে ছড়াচ্ছে তা শনাক্ত করতে পারছে না স্বাস্থ্য বিভাগ।
অবসরপ্রাপ্ত কীটতত্ত্ববিদ আমিনুল হক জানান, সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া যায় যশোর শহরে। মহাসড়কে, নষ্ট ও পরিত্যক্ত টায়ার, বাসাবাড়ির ছাদে, নওয়াপাড়া বেনাপোল বন্দর ছাড়াও গ্রামাঞ্চলেও লার্ভা পাওয়া যায়। এডিস মশার দুটি প্রজাতি—এডিস ইজিপটাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাস। ডেঙ্গু ভাইরাস প্রধানত এডিস ইজিপটাইয়ের মাধ্যমে বেশি ছড়ায়। কম হলেও এডিস অ্যালবোপিকটাসও ডেঙ্গু ছড়ায়। গ্রামাঞ্চলে এডিস অ্যালবোপিকটাস বেশি। এডিস ইজিপটাই বেশি শহর এলাকায়।
যশোর সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, ‘শুরুর দিকে ঢাকা থেকে আসা ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়। তাদের মাধ্যমে জেলায় এ রোগ বেশি ছড়িয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত জলাবদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে সমস্যা বাড়ছে। অক্টোবরেও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়বে। এটি রোধে সচেতন হতে হবে ও চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।’