পুরান ঢাকায় ১০-২০টি বাড়ি নিয়ে ব্লকভিত্তিক ভবন নির্মাণের সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

কমিটির বৈঠকের কার্যপত্র অনুযায়ী, পুরান ঢাকা পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে ১০-২০টি বাড়ি একত্র করে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ব্লকভিত্তিক ভবন নির্মাণের পাইলট প্রকল্প অনুমোদন ও দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

সরু সড়ক, ঘনবসতি, জরাজীর্ণ ভবন ও অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে পুরান ঢাকার নগরজীবন। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকির সঙ্গে রয়েছে উন্মুক্ত জায়গার সংকটও। এ পরিস্থিতি বদলে এলাকাটিকে পরিকল্পিত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য করে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এর অংশ হিসেবে ১০-২০টি বাড়ি বা প্লট একত্র করে ব্লকভিত্তিক আধুনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পরিকল্পনাটির পাইলট প্রকল্প অনুমোদন ও দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত দেশের মডেলগুলো অনুকরণ না করে পুরান ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা নেয়া উচিত। একই সঙ্গে তাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক কাঠামো, ঐতিহ্য এবং নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতিফলন থাকতে হবে।

কমিটির বৈঠকের কার্যপত্র অনুযায়ী, পুরান ঢাকা পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে ১০-২০টি বাড়ি একত্র করে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ব্লকভিত্তিক ভবন নির্মাণের পাইলট প্রকল্প অনুমোদন ও দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বা ব্যবহার সনদ ছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ না দেয়ার নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকরের সুপারিশ করেছে কমিটি। এ প্রক্রিয়ায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সম্পৃক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুরান ঢাকায় ব্লকভিত্তিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় নিয়েছে। আমরা বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় অধিবাসীরা উপকৃত হবেন। বৈঠকে আমরা পরিকল্পনাটি দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছি।’

বৈঠকের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, পুরান ঢাকাকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। এর আলোকে এলাকাটিতে ব্লকভিত্তিক পুনর্বিন্যাসের কাজ চলছে। ১০-২০টি বাড়ি নিয়ে কয়েকটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হলেও সেগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মতি ও অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংসদীয় কমিটি।

কার্যপত্রে রাজধানীর আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন অসংগতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, অতীতে বিভিন্ন হাউজিং সোসাইটি রাজউকের বিধিমালা মেনে মাঠ, স্কুল ও পার্কের মতো নাগরিক সুবিধা রেখে পরিকল্পনার অনুমোদন নিলেও পরে সংশোধিত পরিকল্পনায় সেগুলো বাদ দিয়ে শুধু প্লট রাখার প্রবণতা দেখা গেছে। এ ধরনের বিচ্যুতি ঠেকাতে ভবিষ্যতে অনুমোদিত মূল পরিকল্পনা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এছাড়া অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। নকশা অনুসরণ করা হয়েছে কিনা, তা যাচাইয়ের পর ব্যবহার সনদ দেয়ার ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে। অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ করলে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে, সে বিষয়েও বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা পুরান ঢাকাকে আধুনিকায়নের পরিকল্পনা করেছি। সে লক্ষ্যে কয়েকটি বাড়ি বা প্লট একত্র করে ব্লকভিত্তিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের কাছে প্রস্তাব দেয়া হবে। কারণ স্থানীয়রা সম্মতি না দিলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। পুরান ঢাকার বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় এলাকাটির আমূল সংস্কার প্রয়োজন। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় অধিবাসীরা আধুনিক নগর ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা পাবেন।’

ব্লকভিত্তিক উন্নয়নের মূল লক্ষ্য ছোট ছোট জমি ও বিচ্ছিন্ন ভবনকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় এনে পুনর্গঠন করা। এতে নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি সড়ক প্রশস্তকরণ, অগ্নিনিরাপত্তা, পার্কিং, উন্মুক্ত স্থান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ ধরনের পুনর্গঠনে জমির মালিকানা, স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মতি, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

পুরান ঢাকার পুনর্গঠন নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) ছোট ছোট প্লট একত্র করে ব্লকভিত্তিক উন্নয়নের ধারণা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে সংকীর্ণ সড়ক, ঘনবসতি, উন্মুক্ত স্থানের স্বল্পতা, দুর্বল ড্রেনেজ এবং অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

চলতি বছর পুরান ঢাকাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘ইন্টিগ্রেটেড প্রজেক্ট ফর রিভাইটালাইজেশন অব ওল্ড ঢাকা’ শীর্ষক একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবও সামনে এসেছে। এতে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ, জরাজীর্ণ ভবনের উন্নয়ন, সড়ক ব্যবস্থার সংস্কার এবং উন্মুক্ত স্থান বাড়ানোর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, পুরান ঢাকায় ব্লকভিত্তিক উন্নয়নের পরিকল্পনা এর আগেও নেয়া হয়েছিল। কিন্তু মালিকানা-সংক্রান্ত জটিলতাসহ নানা কারণে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। এখন যে ব্লকভিত্তিক উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, সেটি বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় প্রচলিত একটি পদ্ধতি। ব্লকভিত্তিক উন্নয়নের মডেলটি কী হবে, সেটি নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কোন মডেল পুরান ঢাকার জন্য উপযোগী হবে, তা নির্ধারণ করা জরুরি।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুরান ঢাকার দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। যদি পুরো এলাকাটিকে আধুনিক নগরীতে রূপান্তর করতে চাই, সেটি সম্ভব। কিন্তু তাতে পুরান ঢাকার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পুরান ঢাকার উন্নয়নের যে মডেলই নেয়া হোক না কেন, তাতে সেখানকার কমিউনিটি বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক কাঠামো, ঐতিহ্য ও নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতিফলন থাকতে হবে। পুনরুজ্জীবন বা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে উন্নয়নটি কোন মডেলে করা হবে। চীন, মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দেশের উন্নয়ন মডেলগুলোকে এখানে অনুসরণ করলে তা বাংলাদেশের বাস্তবতায় কতটা উপযোগী, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

আরও