২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য সামনে রেখে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে শুরু হয়েছে ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’। উৎসবে অংশ নিচ্ছেন দেশী-বিদেশী নীতিনির্ধারক, গবেষক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও তরুণ প্রতিনিধিরা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেন্দ্রীয় মাঠে আজ উৎসবের প্রাক-আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। আগামীকাল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে দুদিনের মূল আয়োজন।
‘ন্যায্য, সবুজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্বালানি রূপান্তরের পথে’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এ উৎসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন প্রদর্শন, নীতিসংলাপ, বিনিয়োগ আলোচনা এবং আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে জ্বালানি খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হবে।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি), বুয়েট এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (আইইএসডি)-এর যৌথ উদ্যোগে দ্বিতীয়বারের মতো এ উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রাক-উৎসব সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকরা জানান, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৯৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক। বিপরীতে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের সম্মিলিত অংশ মাত্র ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
এ পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, সহজ অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন আয়োজকরা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ এবং ২০২৬-৩০ মেয়াদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এ লক্ষ্য অর্জনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এ খাতের সম্প্রসারণে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, জমির প্রাপ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন আয়োজকরা। একইসঙ্গে পরিবার, ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষকদের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
আয়োজকদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার শুধু প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত সামাজিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশগত সুরক্ষার প্রশ্নও। তাই জ্বালানি রূপান্তরের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নারী, তরুণ, শ্রমিক, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।
তাদের প্রত্যাশা, নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী, গবেষক, উদ্যোক্তা ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
গত বছর অনুষ্ঠিত প্রথম রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্টে সাত শতাধিক নিবন্ধিত অংশগ্রহণকারী যুক্ত হয়েছিলেন। ওই আয়োজনে ছয়টি নীতিসংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি ২২টি উদ্ভাবন ও ৩১টি প্রযুক্তি প্রদর্শিত হয়। এবার সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উদ্ভাবনকে বিনিয়োগ ও বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
উৎসবের প্রাক-আয়োজনের অংশ হিসেবে ‘পাওয়ার টু দ্য পিপল: ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের আহ্বান’ শীর্ষক র্যালিতে অংশ নেন তরুণ নেটওয়ার্ক, নাগরিক সংগঠন ও জলবায়ু ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রায় ২০০ প্রতিনিধি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকা থেকে শুরু হওয়া র্যালিটি বুয়েটের কেন্দ্রীয় মাঠে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে তরুণ সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণে ফ্ল্যাশ মব পরিবেশিত হয়। কর্মসূচির মাধ্যমে ন্যায্য, বিকেন্দ্রীভূত ও জনসম্পৃক্ত জ্বালানি ব্যবস্থার দাবি তুলে ধরা হয়।
আগামীকাল সকাল ১০টায় উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। উদ্বোধনের পর প্রদর্শনী পরিদর্শন এবং অস্ট্রেলীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
দিনের অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বুয়েটের ‘এনার্জি টকস’, শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানো ও শ্রমিকের অধিকারবিষয়ক আলোচনা এবং গবেষণাভিত্তিক পোস্টার উপস্থাপনা।
বিকাল ৪টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে ‘ইনোভেশন টু ইমপ্যাক্ট মার্কেটপ্লেস’। এ পর্বে নির্বাচিত উদ্ভাবকরা বিনিয়োগকারী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সম্ভাব্য অংশীদারদের সামনে তাঁদের নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক উদ্ভাবন ও সমাধান উপস্থাপন করবেন। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে মতামত ও পরামর্শ নেয়ার সুযোগ পাবেন তারা।
২৮ অক্টোবর উৎসবের শেষ দিনে চারটি নীতিসংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। এতে জ্বালানি নীতি ও সুশাসন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থায়ন ও বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো এবং জ্বালানি রূপান্তরের সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা হবে। এসব অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পাশাপাশি আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ থাকবে।
এদিন দুপুর আড়াইটায় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনটি উদ্ভাবন পুরস্কার ও তিনটি পোস্টার পুরস্কার দেয়া হবে। সমাপনী আয়োজনে পুতুলনাট্যের মাধ্যমে ন্যায্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ তুলে ধরা হবে।
উৎসবের দুই দিনজুড়ে চালু থাকবে ইনোভেশন ফেয়ার, টেকনোলজি ফেয়ার, পিপল অ্যান্ড পাওয়ার হাব এবং ইয়ুথ হাব। এসব আয়োজনের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, নিয়োগকর্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও তরুণদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে বাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
উৎসবের সহ-আয়োজক ও অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিল (বিইপিআরসি), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস), বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ), সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সি৩ইআর), অক্সফাম ইন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন গবেষণা, উন্নয়ন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নীতি প্রণয়ন, বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি স্থানীয় উদ্ভাবনের প্রসার, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতেও উৎসবটি সহায়ক হবে।