সিলেট গ্যাস ফিল্ড ছাড়া বাকি সব কোম্পানির উৎপাদন কমেছে এক বছরে

রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) উৎপাদনও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৫ হাজার ৩১৪ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করেছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৪৩ মিলিয়ন ঘনমিটারে। এক বছরে উৎপাদন কমেছে ৪৭১ মিলিয়ন ঘনমিটার।

দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমছে ধারাবাহিকভাবে। এরই মধ্যে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে চারটির উৎপাদন কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় এসব কোম্পানির গ্যাস উত্তোলন কমেছে মোট ১ হাজার ৯৩১ মিলিয়ন ঘনমিটার, যা প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। উৎপাদন হ্রাসের এ প্রবণতায় স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর বাড়ছে নির্ভরতা।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাসের উৎপাদন কমছে। বিশেষ করে মার্কিন কোম্পানি শেভরনের পরিচালনাধীন বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় সরবরাহ ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। নতুন কূপ খনন ও বিদ্যমান গ্যাস ক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখার উদ্যোগ নেয়া হলেও উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকানো যাচ্ছে না।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের পাঁচটি কোম্পানি মোট ১৯ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৬৬৯ মিলিয়ন ঘনমিটারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোট উৎপাদন কমেছে প্রায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ।

দেশে গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির গ্যাস উত্তোলন ছিল ১১ হাজার ৩৬৮ মিলিয়ন ঘনমিটার। পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১০ হাজার ১৫ মিলিয়ন ঘনমিটারে। এ সময়ে কোম্পানিটির উৎপাদন কমেছে ১ হাজার ৩৫৩ মিলিয়ন ঘনমিটার।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দেশের স্থানীয় গ্যাস সরবরাহের প্রায় অর্ধেক আসে শেভরনের কাছ থেকে। এর বড় অংশই সরবরাহ করা হয় বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্র থেকে। ক্ষেত্রটির উৎপাদন ক্রমাগত কমে আসায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। উৎপাদন ধরে রাখতে কোম্পানিটি বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও দীর্ঘমেয়াদে এ সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) উৎপাদনও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৫ হাজার ৩১৪ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করেছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৪৩ মিলিয়ন ঘনমিটারে। এক বছরে উৎপাদন কমেছে ৪৭১ মিলিয়ন ঘনমিটার।

রাষ্ট্রায়ত্ত আরেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) গ্যাস উত্তোলনও নিম্নমুখী। প্রতিষ্ঠানটির আওতাধীন গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ১৫৫ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৭ মিলিয়ন ঘনমিটারে।

দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ব্রিটিশ কোম্পানি তাল্লোর গ্যাস উত্তোলনও কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৩৬৯ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করেছিল। পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩৩০ মিলিয়ন ঘনমিটারে। অর্থাৎ এক বছরে উৎপাদন কমেছে ৩৯ মিলিয়ন ঘনমিটার।

তবে এ পরিস্থিতির মধ্যে ব্যতিক্রম সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (এসজিএফএল)। অন্য চারটি কোম্পানির উৎপাদন কমলেও প্রতিষ্ঠানটির উত্তোলন কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৩৯২ মিলিয়ন ঘনমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ঘনমিটারে। এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে ৩২ মিলিয়ন ঘনমিটার।

স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার এলএনজি আমদানির পাশাপাশি নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশী কোম্পানিও কাজ করছে। ২০৩১ সালের মধ্যে কূপ খননের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি বছর গ্রিড থেকে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস কমে যাচ্ছে। এ উৎপাদন হ্রাসের প্রভাব মোকাবেলায় কূপ খনন করা হচ্ছে। সরকার ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আমরা সে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছি। আশা করছি, এসব কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে বিদ্যমান সরবরাহ ধরে রাখা সম্ভব হবে।’

আরও