অনেক হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ শুরুই হয়নি, শঙ্কা নিয়ে বোরো রোপণ করছেন কৃষক

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্লাবিত নিম্নভূমিকে বলা হয় হাওর অঞ্চল, যা বর্ষাকালে গভীর জলাশয় এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে পরিণত হয়। দেশের মোট উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৩০ শতাংশ জোগান আসে হাওর অঞ্চল থেকে।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্লাবিত নিম্নভূমিকে বলা হয় হাওর অঞ্চল, যা বর্ষাকালে গভীর জলাশয় এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে পরিণত হয়। দেশের মোট উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৩০ শতাংশ জোগান আসে হাওর অঞ্চল থেকে। বর্ষায় হাওরের বিস্তৃত জলরাশি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে শুকিয়ে যেতে থাকে। সেখানে কৃষক ভূমির বৈশিষ্ট্যভেদে বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ করেন। হাওর অঞ্চলে বছরে মূলত একবারই ধান আবাদ হয়। প্রধানত বোরো ধান চাষ হয়, যা বছরের প্রধান ফসল। তবে প্রতি বছরই পাহাড়ি ঢলে এসব ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা সার্বিক খাদ্য জোগানও ব্যাহত করে। ফসল রক্ষায় প্রতি বছরই হাওরে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী, ১৫ ডিসেম্বর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা। যদিও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের বেশির ভাগ বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময়সীমার তিন সপ্তাহ পার হলেও এখনো শুরু হয়নি। যেসব হাওরে কাজ শুরু হয়েছে তার গতি নিয়েও হতাশ হাওরপাড়ের কৃষকরা। আগাম বন্যায় ফসলহানির শঙ্কা নিয়েই বোরো আবাদ শুরু করেছেন তারা।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, তাহিরপুর, দিরাই, শাল্লাসহ বিভিন্ন উপজেলার কিছু হাওরে সময়মতো কাজ শুরু করা যায়নি। হাওরের পানি অপসারণে বিলম্ব ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন প্রক্রিয়ায় দেরি হওয়া এর অন্যতম কারণ। যেসব হাওরের পানি দ্রুত কমেছে সেসব হাওরে নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা যুক্ত। সুতরাং এক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি কাম্য নয়। অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পিআইসি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করে তাও নিশ্চিত করতে হবে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবারের বাঁধের কাজ নিয়ে আমরা শঙ্কিত। কাজের অগ্রগতি খুবই হতাশাজনক। নীতিমালা অনুযায়ী ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ ১৫ ডিসেম্বর শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনো বেশির ভাগ উপজেলায় কাজ শুরু হয়নি। যেসব বাঁধে কাজ শুরু হয়েছে তাতেও রয়েছে ধীরগতি। তাছাড়া পিআইসি গঠনে অনিয়ম, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পসহ রয়েছে অতিরিক্ত বরাদ্দ। নির্বাচনের দোহাই দিয়ে বাঁধের কাজে গাফিলতি করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’

সুনামগঞ্জ পাউবোর তথ্য বলছে, জেলার ৯৫টি হাওরের মধ্যে বাঁধের কাজ হওয়ার কথা ৫৩টিতে। সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার ও মেরামতে এ বছর ৬৬৬টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে। চলতি বছর প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার বাঁধ এলাকায় সংস্কার ও মেরামতের কাজ হওয়ার কথা রয়েছে।

এ ব্যাপারে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ৭০৫টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য ১৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ১৫ ডিসেম্বর বাঁধের কাজ ১২ উপজেলায় উদ্বোধন করা হলেও হাওরে পানি নিষ্কাশনে বিলম্ব ও পিআইসি গঠনে দেরি হওয়ায় সব হাওরে কাজ শুরু করা যায়নি। ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৪০০টি প্রকল্পের আওতায় বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে অবশিষ্ট প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু হয়ে যাবে। বাঁধের কাজের সার্বিক অগ্রগতি ১৫ শতাংশ হয়েছে।’

হাওর অঞ্চলের কৃষকরা বলছেন, ২০১৭ সালের বন্যার পর বড় ধরনের কোনো দুর্যোগ আসেনি। এ কারণে বাঁধ হওয়া না হওয়া নিয়ে তেমন প্রভাব পড়েনি। যদি অকালবন্যা পেয়ে বসে, তাহলে কৃষকের সর্বনাশ হবে। বাঁধ নির্মাণকাজের এ মন্থরগতি বিপদে ফেলতে পারে হাওরবাসীকে। তবে শঙ্কা নিয়েও এরই মধ্যে হাওরে বোরো আবাদ শুরু করেছেন কৃষক।

নেত্রকোনার মদন উপজেলার মাঘান গ্রামের কৃষক কালাম মিয়া বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বছরে একটি ফসল উৎপাদন করা যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আগাম বন্যায় ফসলের ক্ষতি হলে সর্বস্বান্ত হয়ে যান স্থানীয় কৃষক। এ বছর সার ও ডিজেলের দাম বেশি থাকায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। ১ হাজার ৫০ টাকার সার কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪২০ থেকে ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। আর প্রতি লিটার ডিজেল কিনতে লাগছে ১০৭ টাকায়।’

নেত্রকোনার ১০টি উপজেলার মধ্যে শতভাগ হাওর উপজেলা খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দাসহ সাত উপজেলায় ১৩৪টি হাওরে শুরু হয়েছে প্রধান ফসল বোরো আবাদ। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, জেলায় চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে। খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা ও বারহাট্টা উপজেলায় ছোট-বড় ১৩৪টি হাওরের মধ্যে ৮৯টিই খালিয়াজুরীতে। হাওরাঞ্চলে ৩১০ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে এ উপজেলায় রয়েছে ১৪৯ কিলোমিটার। এ বছর ফসল রক্ষায় দুই শতাধিক প্রকল্প নেয়া হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে হাওর এলাকায় ৪৮ হাজার ৩১৩ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে। সমতলে রোপণ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ১২৬ হেক্টর জমিতে।’

পাউবোর তথ্য বলছে, ফসল রক্ষায় ১৫ ডিসেম্বর শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ শেষ করার কথা রয়েছে। এ বছর জেলায় দুই শতাধিক পিআইসির মাধ্যমে ১৪৯ কিলোমিটার বাঁধ মেরামতে ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা প্রাথমিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়েই বাঁধের কাজ শেষ হবে জানিয়েছে পাউবো কর্তৃপক্ষ।

বাঁধ নির্মাণ বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘গতকাল পর্যন্ত সাড়ে ৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বাকি কাজ শেষ হবে।’

আরও